মাংস কাটতে গিয়ে

কোরবানির ঈদে অনেকেই শখ বা প্রয়োজনে অনভ্যস্ত হাতে মাংস কাটতে গিয়ে প্রায়শই দুর্ঘটনায় শিকার হন। যেভাবেই ক্ষত তৈরি হোক না কেন, শরীরের কোথাও কেটে যাওয়ার পর প্রাথমিকভাবে করণীয় হলো রক্তপাত বন্ধ করা। এরপর সংক্রমণ যাতে না হয়, ব্যবস্থা নেওয়া। তবে রক্তপাত বন্ধ না হলে আক্রান্ত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। এর পাশাপাশি আরও যা করবেন জানালেন ডা. দিলারা আফরোজ

শুরুতেই একটা পরিষ্কার কাপড় বা গজ দিয়ে কাটা স্থানটি চেপে রাখুন। কাপড় বা গজ না পেলে হাতের তালু কিংবা দুই আঙুল ব্যবহার করে ধরে রাখতে পারেন। টানা ৭ থেকে ১০ মিনিট চাপ দিয়ে ধরে রাখলে রক্ত জমাট বেঁধে রক্তপাত বন্ধ হয়ে যাবে। পাশাপাশি কাটা স্থানটি একটু উঁচু করে রাখতে হবে। রক্ত বন্ধ হয়েছে কি না, বারবার খুলে দেখা যাবে না।

রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে গেলে ক্ষতস্থানটি পরিষ্কার পানিতে ভালো করে ধুয়ে অ্যান্টিসেপটিক মলম ব্যবহার করুন। কাটা স্থান পরিষ্কার করার পর ওই জায়গায় পাতলা স্তরে অ্যান্টিবায়োটিক মলম দিয়ে ঢেকে দিন। মিউপিরোসিন, নিওমাইসিন বা এ-জাতীয় মলম সব সময় বাড়িতে প্রাথমিক চিকিৎসার ওষুধ হিসেবে রাখা উচিত। হাতের কাছে এসব না থাকলে চিনি বা ফিটকারি ব্যবহার করতে পারেন। সবশেষে একটি পাতলা গজ বা ব্যান্ডেজ দিয়ে সম্পূর্ণ স্থানটি হালকাভাবে আটকে দিতে হবে। গজ ব্যান্ডেজ বা স্টিকারযুক্ত ব্যান্ডেজটি দুদিন পর পর পরিবর্তন করতে হবে। যদি কাটা জায়গাটা ফুলে যায় কিংবা লাল দেখায়, ব্যথা বেড়ে যায় কিংবা ব্যান্ডেজ ভিজে যেতে থাকে বা জ্বর চলে আসে, তাহলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। এগুলো কাটা জায়গায় সংক্রমণের লক্ষণ।

কখন যাবেন হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে

কেটে-ছিঁড়ে গেলে রক্তপাত হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটলে বুঝতে হবে, রক্তনালি কেটে গেছে। যা সহজে বন্ধ না-ও হতে পারে। এ ক্ষেত্রে জরুরিভাবে হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে যোগাযোগ করতে হবে। আবার রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়ায় কোনো সমস্যা থাকলে, যেমন যকৃতের রোগ, হিমোফিলিয়া, ডেঙ্গু কিংবা দীর্ঘদিন ধরে অ্যাসপিরিন সেবনকারী, এমন রোগীর রক্তপাত সহজে বন্ধ না-ও হতে পারে।

অসাবধনতায় কাজ করতে গিয়ে যদি আঙুল বা হাত শরীর থেকে পুরোপুরিভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া অংশটি যদি ধারালো কিছু দিয়ে কাটে তাহলে নিয়ম মেনে ৬ ঘণ্টার মধ্যে যদি প্লাস্টিক সার্জনের কাছে নিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে কখনো কখনো তা আবার শরীরে লাগানো বা প্রতিস্থাপন করা যায়। যা অত্যন্ত জটিল, সূক্ষ্ম এবং দীর্ঘমেয়াদি কাজ। এটির জন্য বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া অংশটুকুকে যতেœর সঙ্গে সংরক্ষণ করতে হবে। নরমাল স্যালাইন বা পরিষ্কার পানি দিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া অংশটি পরিষ্কার করে একটা ভেজা নরম কাপড় বা গজ দিয়ে পেঁচিয়ে একটা পরিষ্কার পলিথিনে নিন। এরপর আরেকটা পরিষ্কার পলিথিনে বরফকুচি নিয়ে তার মধ্যে ব্যাগটি রেখে দিন। বিচ্ছিন্ন অংশটি কোনোভাবেই সরাসরি বরফে বা ঠান্ডা পানিতে করে আনবেন না।

কোনো ধাতব নোংরা বস্তুর কারণে ক্ষত তৈরি হলে এক ডোজ টিটেনাস ইনজেকশন নেওয়া প্রয়োজন। তবে ১০ বছরের মধ্যে টিটেনাস টিকা না দেওয়া থাকলে পরিষ্কার ক্ষত হলেও একটি বুস্টার ডোজ নেওয়া ভালো। সেই সঙ্গে টিটেনাসের ইমিউনোগ্লোবিউলিন। রড বা টেঁটাজাতীয় কোনো বস্তু ঢুকে রক্তপাত হলে এবং ক্ষতস্থানে ওই বস্তু থেকে গেলে ক্ষতস্থানের দুই পাশ চেপে ধরতে হবে। কোনোভাবেই ক্ষতস্থানের ওপর চাপ দেওয়া যাবে না। এমনকি ক্ষতস্থান থেকে বস্তুটি তুলে ফেলারও চেষ্টা করবেন না। ক্ষতস্থান ও বস্তুটির ওপর আলতো করে গজ বা পরিষ্কার কাপড় দিয়ে মুড়িয়ে দিন। আহত ব্যক্তিকে যত দ্রুত সম্ভব কাছাকাছি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।

ড্রেসিং করা

ক্ষতস্থান পরিষ্কার করার পর ড্রেসিং করে ক্ষতস্থান মুড়ে দিলে ধুলাবালি ও রোগজীবাণু থেকে ইনফেকশন প্রতিরোধে সাহায্য করবে। ড্রেসিংয়ের আগে ক্ষতস্থানটি পরিষ্কার কাপড় দিয়ে আলতো করে চেপে চেপে শুকিয়ে নিতে হবে। এর পর ‘অ্যাডহেসিভ ব্যান্ডেজ’, অর্থাৎ ক্ষতস্থানকে পুরোপুরি ঢেকে দিয়ে তার চারদিকে আপনাআপনি লেগে থাকে এমন ব্যান্ডেজ লাগাতে হবে। এগুলো ফার্মেসিতে

সার্জিন প্যাড ও সার্জিন পোর-সহ বিভিন্ন নামে কিনতে পাওয়া যায়। এ ধরনের ব্যান্ডেজ হাতের কাছে পাওয়া না গেলে জীবাণুমুক্ত (স্টেরাইল) গজ ব্যান্ডেজ দিয়ে ক্ষতটি ব্যান্ডেজ করে নিতে হবে। উভয় ধরনের ব্যান্ডেজের আকার ক্ষতের আকারের চেয়ে সামান্য বড় হতে হবে।