ঈদুল আজহা উপলক্ষে বগুড়া জেলায় ছোট-বড় অর্ধশতাধিক পশুর হাট জমে উঠেছে। তবে হাটগুলোতে চলছে অতিরিক্ত হাসিল আদায়ের প্রতিযোগিতা। ক্রেতাদের অনেকে একে ‘হাসিল সন্ত্রাস’ বলে অভিহিত করছেন। হাটে হাসিলে সরকার নির্ধারিত মূল্য জনসম্মুখে টাঙানোর নিয়ম থাকলেও কোনো হাটে তা চোখে পড়েনি। এছাড়াও হাটে অবিক্রীত পশু রাত না হওয়া পর্যন্ত বাড়িতে ফেরত নিতে দেওয়া হচ্ছে না বলে ক্রেতা-বিক্রেতারা অভিযোগ করেছেন। এদিকে প্রশাসন বলছে, অতিরিক্ত হাসিল আদায় করলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। হাটে হাটে মনিটরিং টিম কাজ করছে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, সরকারি নির্দেশনামতে প্রতিটি হাটে জনসম্মুখে মূল্য তালিকা টাঙিয়ে গরুর দাম ১ লাখ টাকার ওপরে হলে ৮০০ টাকা, ১ লাখ টাকার নিচে হলে ৬০০ টাকা, মহিষপ্রতি ১০০০ টাকা এবং খাসি, ছাগল, ভেড়াপ্রতি ২৫০ টাকা ক্রেতাদের কাছ থেকে টোল আদায় করতে পারবেন ইজারাদার ও খাস নিয়োজিত ব্যক্তিরা। কিন্তু বিক্রেতার কাছ থেকে কোনো টাকা আদায় করতে পারবে না।
গত কয়েকদিন সরেজমিনে জেলার বেশ কয়েকটি পশুর হাট ঘুরে প্রশাসনের কোনো টিম চোখে পড়েনি। শুক্রবার শহরের বনানী সুলতানগঞ্জ হাটে দেখা যায়, খাস নিয়োজিত ব্যক্তিরা গরুর ক্রেতার কাছ থেকে ১ হাজার টাকা ও বিক্রেতার কাছ থেকে ২০০ টাকা আদায় করছেন। খাসি, ছাগলের ক্রেতাদের কাছ থেকে ৫০০ টাকা ও বিক্রেতার কাছ থেকে ১০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। হাসিল আদায়ের কাগজে কোনো টাকার অঙ্ক লিখতেও দেখা যায়নি। তবে কেন লেখা হচ্ছে না তা আদায়কারীদের জিজ্ঞেস করা হলেও তারা কোনো উত্তর দেননি। শনিবার সদরের সাবগ্রাম, ঘোড়াধাপ, শিবগঞ্জের মহাস্থান হাট ও রবিবার শহরের কালীতলা হাটেও একই চিত্র চোখে পড়ে।
জেলার শিবগঞ্জ, কাহালু, আদমদীঘি, সারিয়াকান্দিসহ কয়েকটি উপজেলায়ও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাটগুলোতে হাসিলের কোনো তালিকা টাঙানো হয়নি এবং নির্ধারিত মূল্যের অতিরিক্ত আদায় করা হচ্ছে।
ঘোড়াধাপ হাটে গরু নিয়ে আসা রামশহর এলাকার নাহিদ বলেন, ‘তিনটি গুরু এনেছি। বিক্রির পর গরুপ্রতি ২০০ টাকা হাসিল দিয়েছি। কিন্তু আগে হাটে গরু বিক্রি করলে টাকা নিত না।’ ক্রেতা তাসিন ও সাজিদ নামের দুই ভাই জানান, তারা ১ লাখ ২০ হাজার টাকা দিয়ে গরু কিনেছেন। হাসিল দিতে হয়েছে ১ হাজার টাকা। হাটের কোথাও হাসিল আদায়ের ব্যানার বা লেখা টাঙানো দেখতে পাননি। হাটের হাসিল আদায়কারীরা জানান, ইজারাদার যেভাবে বলেছেন, সেভাবে হচ্ছে। ইজারাদার রমজান আলী অতিরিক্ত হাসিল আদায়ের বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
নামুজা হাটে কয়েকজন ক্রেতা জানান, হাটে হাসিলের কোনো মূল্য তালিকা নেই। তবে গরুর দাম যাই হোক ইজারাদাররা ১ হাজার টাকা করে আদায় করছে।
শহরের বনানী হাটে ২ লাখ ৫ হাজার টাকা দিয়ে গরু কেনেন শাজাহানপুর উপজেলার সহিদুল। তিনি বলেন, ‘হাটে হাসিল ১ হাজার টাকা নিল কিন্তু সিøপে কোনো টাকা উল্লেখ করেনি।’ সোমবার একই চিত্র চোখে পড়েছে শহরের বনানী সুলতানগঞ্জ হাটে। সেখানে দেখা যায়, হাসিলের সিøপে শুধু ক্রেতা-বিক্রেতার নাম ও পশুর দাম উল্লেখ করা হলেও আদায় কত করা হয়েছে তার উল্লেখ নেই।
সাবগ্রাম পশুর হাটের চিত্র একই। হাটে হাসিল আদায় করছেন ইমরান। তিনি বলেন, ‘ইজারাদার যেভাবে নিতে বলেছেন সেভাবেই নিতে হবে। কম বেশি জানি না।’ এই হাট ১ কোটি ৫ লাখ টাকা দিয়ে ইজারা নিয়েছেন আবদুল কাইয়ুম। তিনি বলেন, ‘অনেক টাকা দিয়ে হাট নেওয়া, আবার ভ্যাট ট্যাক্স আয়কর দিতে হয়। বাজার পরিস্থিতি ভালো না। তাই সরকারি রেটে হাসিল আদায় করা সম্ভব না।’ হাসিল আদায় রসিদে টাকার অঙ্ক না লেখার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কেউ চাইলে লিখে দেওয়া হয়। না চাইলে দেওয়া হয় না।’
মহাস্থান হাটের ইজারাদার আশরাফুল ইসলাম একটু বেশি হারে হাসিল আদায় হচ্ছে জানিয়ে বলেন, ‘আমি একা নই, সব হাটেই একটু বেশি আদায় করা হচ্ছে।’
হাটে অতিরিক্ত হাসিল আদায়ের বিষয়ে বগুড়া সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল ওয়াজেদ জানান, সব হাটে চিঠি দেওয়া হয়েছে। সরকার নির্ধারিত মূল্যের বাইরে হাসিল আদায় করার সুযোগ নেই। যদি কেউ নেয় তবে অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।