চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার গ্রামাঞ্চলের প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিয়োজিত কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো এখন নিজেই নানা রোগে আক্রান্ত। ওষুধ এবং জনবলের তীব্র সংকটের কারণে উপজেলার প্রায় ৪ লাখ মানুষ তাদের কাক্সিক্ষত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সাধারণ মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসার চাহিদা মেটাতে প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিকে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ৩২ ধরনের প্রয়োজনীয় ও জীবন রক্ষাকারী ওষুধ মজুদ থাকার কথা। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। মতলব উত্তরের অধিকাংশ ক্লিনিকে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে প্যারাসিটামল, মেট্রোনিডাজল (মেট্রিল) এবং ওরস্যালাইন ছাড়া আর কোনো ওষুধ নেই। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, গ্যাস্ট্রিক কিংবা শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় সিরাপের মতো জরুরি ওষুধ মাসের পর মাস থাকে না। ফলে বাধ্য হয়ে দরিদ্র রোগীদের শূন্য হাতে ফিরে যেতে হয়। বাধ্য হয়ে বাইরের ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনতে হচ্ছে।
১৯৯৮ সালে গ্রামের সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে কমিউনিটি ক্লিনিক কার্যক্রম চালু করা হয়। পরে ২০০৯ সালের পর দেশজুড়ে এ কার্যক্রমের ব্যাপক সম্প্রসারণ হলেও বর্তমানে মতলব উত্তরের অধিকাংশ কমিউনিটি ক্লিনিক নানা সংকটে কার্যকারিতা হারাতে বসেছে।
মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্র জানায়, মতলব উত্তর উপজেলায় মোট ৪২টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি ক্লিনিকে সপ্তাহে ছয় দিন কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) দায়িত্ব পালন করবেন। এ ছাড়া সপ্তাহে তিন দিন স্বাস্থ্য সহকারী এবং তিন দিন পরিবার কল্যাণ সহকারী সেবা দেওয়ার কথা। তবে বাস্তবে অধিকাংশ ক্লিনিকে সিএইচসিপি ছাড়া অন্য কাউকে দেখা যায় না। এসব ক্লিনিকের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রায় ৪ লাখ মানুষের নিয়মিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাব, জনবল সংকট এবং অনিয়মিত কার্যক্রমের কারণে অধিকাংশ মানুষ কাক্সিক্ষত সেবা পাচ্ছেন না।
সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিকে ৩২ ধরনের জীবনরক্ষাকারী ও প্রয়োজনীয় ওষুধ মজুদ থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে বাস্তবের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্তমানে অধিকাংশ ক্লিনিকেই প্যারাসিটামল, মেট্রোনিডাজল (মেট্রিল) এবং খাবার স্যালাইন (ওরস্যালাইন) ছাড়া অন্য কোনো ওষুধ মিলছে না। এমনকি অনেক সময় এই সাধারণ ওষুধগুলোরও তীব্র সংকট দেখা দেয়।
এর ফলে প্রতিদিন প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা শত শত রোগীকে প্রয়োজনীয় ওষুধ ছাড়াই শূন্য হাতে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে। এই চরম অব্যবস্থাপনার কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী, শিশু এবং নিম্ন আয়ের সাধারণ মানুষ। বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার সামর্থ্য না থাকায় এই অবহেলিত জনগোষ্ঠী সরকারি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ওপর নির্ভরশীল, যা এখন সঙ্কটাপন্ন।
সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, দীর্ঘ দিন ধরে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে অনিয়মই যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। শুধু ওষুধের সংকটই নয়, ক্লিনিক পরিচালনার ক্ষেত্রেও রয়েছে চরম উদাসীনতা। অনেক ক্লিনিকই সকালের নির্ধারিত সময়ে খোলা হয় না, আবার দুপুরের আগেই তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। ওষুধের তীব্র অভাবের পাশাপাশি দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মীদের (সিএইচসিপি) কর্মস্থলে অনিয়মিত উপস্থিতি, দায়িত্বে অবহেলা এবং উদাসীনতা গ্রামীণ এই স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে সংকটে ফেলছে।
সম্প্রতি উপজেলার বিভিন্ন কমিউনিটি ক্লিনিক পরিদর্শনে গিয়ে দেখা গেছে উদ্বেগজনক চিত্র। মধ্য ইসলামাবাদ কমিউনিটি ক্লিনিকে দায়িত্বপ্রাপ্ত সিএইচসিপি উপস্থিত থাকলেও দুপুর পর্যন্ত কোনো রোগী আসেনি। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রয়োজনীয় ওষুধ না থাকায় মানুষ এখন আর ক্লিনিকে আসতে আগ্রহী নয়। উপজেলার পূর্ব ফতেপুর ইউনিয়নের এনায়েতনগর কমিউনিটি ক্লিনিকে গিয়ে তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক দিনই দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের অনিয়মিত উপস্থিতির কারণে ক্লিনিক বন্ধ থাকে। ঝড়-বৃষ্টির অজুহাতে টানা কয়েক দিন ক্লিনিক বন্ধ রাখা হয়। খুললেও ওষুধ না থাকার কথা বলে রোগীদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়। উপজেলার ইন্দুরিয়া, এনায়েতনগর, ফতেপুর, ফরাজিকান্দি, লুধুয়া, এখলাসপুর, মোহনপুর ও বাগানবাড়ি এলাকার কমিউনিটি ক্লিনিকেও অনুরূপ চিত্র দেখা গেছে।
উপজেলার ফরাজিকান্দি গ্রামের সেবা গ্রহীতা সাবিনা আক্তার বলেন, ‘আগে নিয়মিত এখান থেকে চিকিৎসা ও ওষুধ পেতাম। গত এক বছর ধরে প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়া যায় না । কোনো অ্যান্টিবায়োটিকও নেই। তাই অনেকেই এখন আর কমিউনিটি ক্লিনিকে আসে না। সুজাতপুর গ্রামের বাসিন্দা ফাতিহা বেগম বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন ধরে আলসারের রোগী। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে নিয়মিত ওষুধ কিনতে পারি না। চার মাস ধরে ক্লিনিকে এসেও কোনো ওষুধ পাইনি। সরকারি ক্লিনিক থেকেও যদি না পাই, তাহলে আমরা কোথায় যাব?’ স্থানীয় মসজিদের ইমাম মেহেদী হাসান বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে এখানে ওষুধের সংকট চলছে। আশপাশের অন্তত ১০টি গ্রামের মানুষ এই ক্লিনিকের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ওষুধ না পেয়ে সবাই ফিরে যাচ্ছে।
উপজেলার মধ্য ইসলামাবাদের কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি লাভলী আক্তার বলেন, ‘প্রয়োজনীয় ওষুধ থাকলে রোগীরা উপকৃত হতেন এবং সদর হাসপাতালের ওপর চাপও কমত। কিন্তু ওষুধের অভাবে রোগীরা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন, অনেক সময় আমাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারও করেন।
মতলব উত্তর সিএইচসিপি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হারুনুর রশিদ বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে ওষুধের সংকট চলছে। গত চার মাসে শুধু এক কার্টুন ওষুধ পেয়েছি। যেখানে আগে ৩২ ধরনের ওষুধ থাকত সেখানে আমরা বর্তমানে পাচ্ছি ২২ ধরনের ওষুধ। বিষয়টি বারবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আমাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে, শিগগিরই পরিস্থিতির উন্নতি হবে।’
মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রাজন কুমার দাস বলেন, ‘প্রায় এক বছর ধরে কমিউনিটি ক্লিনিকে ওষুধের সংকট চলছে। তবে তিনি আশ্বস্ত করে বলেন এখন থেকে প্রত্যেক মাসে এক কার্টুন করে ওষুধ সরবরাহ করা হবে। চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ হলে রোগীরা বঞ্চিত হবে না।