খুন ও ধর্ষণসহ ছিনতাই ও ডাকাতির মতো অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এবার আসছে পুলিশের ‘সেফ সিটি’ প্রকল্প। এর আওতায় ঢাকা মহানগর, গাজীপুর মহানগর ও নারাণগঞ্জ জেলা নিয়ে সেফ সিটি গঠনে কাজ করছে পুলিশ সদরদপ্তর। ইতিমধ্যে পুলিশের একটি দল কয়েকটি দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিকবার মিটিংও করেছে। এর সম্ভাব্য সুফল যাচাইয়ে কয়েকটি দেশও সফর করেছে প্রতিনিধিদলটি। সরকারের উচ্চমহল থেকেও দ্রুত সেফ সিটি বাস্তবায়নের তাগিদ রয়েছে। এটি বাস্তবায়ন হলে অপরাধীকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করা যাবে এবং অপরাধপ্রবণ এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে।
এই প্রকল্পে এমন কিছু প্রযুক্তি যুক্ত হতে যাচ্ছে যা রীতিমতো অপরাধীদের কলিজায় কাপন ধরিয়ে দেবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পর অপরাধী শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করতে সময়, অর্থ ও শ্রম সবই সাশ্রয় হবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। এর মধ্যে ১৫ হাজার আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স (এআই) ক্যামেরা থাকবে। কোনো অপরাধীকে একবার এই প্রযুক্তিতে যুক্ত করা গেলে, তার গতিবিধি ২৪ ঘণ্টা নজরদারির মধ্যে থাকবে। এমনকি তার সম্ভাব্য চলাফেরাও নিয়ন্ত্রণ করবে প্রযুক্তি।
প্রযুক্তিনির্ভর সেফ সিটির মূল লক্ষ্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এর আওতায় পুরো শহরকে একটি সেন্ট্রাল নেটওয়ার্কের অধীনে এনে অপরাধী শনাক্তকরণ এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার কাজ করা হয়। প্রকল্পের আওতায় শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে এআই ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। ক্যামেরাগুলোয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানুষের মুখম-ল চিহ্নিত করার প্রযুক্তি থাকবে, যার ফলে অপরাধী বা নিখোঁজ ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে। যানবাহন নিয়ন্ত্রণ স্বয়ংক্রিয় নম্বর প্লেট শনাক্তকরণ প্রযুক্তির মাধ্যমে যানবাহনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ ও ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারীদের চিহ্নিত করা হবে।
সেফ সিটির জন্য তৈরি হচ্ছে সেন্ট্রাল কন্ট্রোল রুম, যেখানে সব ক্যামেরার ডেটা একটি মূল নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র থেকে মনিটর করা হবে, যাতে যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া যায়। অপরাধীরা কোনো অপরাধ করলে তা এআই ক্যামেরায় ধরা পড়বে এবং এনআইডির ছবির মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চিহ্নিত হবে। ঢাকা, গাজীপুর ও নারাণগঞ্জের অপরাধপ্রবণ এলাকায় বসানো হচ্ছে এই ক্যামেরা। এর মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ রাখা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
এদিকে ঢাকাসহ সারা দেশে বাসাবাড়ি, অফিস ও কারখানায়সহ বিভিন্ন স্থানে মানুষ নিজেদের নিরাপত্তার জন্য যে ক্যামেরা লাগায়, সেটা আর তারা ইচ্ছামতো লাগাতে পারবে না। সবাইকে পুলিশ সদরদপ্তরের নির্দেশনা মেনেই সিসিটিভি ক্যামেরা বসাতে হবে। পুলিশ সদরদপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই প্রযুক্তিতে প্রথমে পুলিশের তালিকাভুক্ত অপরাধীদের যুক্ত করা হবে। তাদের অপরাধ অনুযায়ী ক্যাটাগরি করা হবে। ফলে সব সময় সবাইকে নজরদারি করার দরকার হবে না। তবে প্রযুক্তি তাদের চলাফেরা নজরদারি করবে নিয়মিত। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে অপরাধী হিসেবে শনাক্তের পর কারও পক্ষে নজরদারির বাইরে যাওয়ার সুযোগ থাকবে না। পুরো প্রক্রিয়াটা পুুলিশ সদরদপ্তর থেকে মনিটরিং করা হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক কর্মকর্তা বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে পুলিশ তিন সিটির জন্য ১৫ হাজার এআই ক্যামেরা কিনবে। যদিও তা যথেষ্ট নয়। তাই বিকল্প হিসেবে প্রাইভেট ক্যামেরাগুলো একটি নির্দেশনার মধ্যে নিয়ে এসে কাজে লাগানো হবে।
পুলিশ সদরদপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (অপরাধ ও অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সেফ সিটির পরিকল্পনা এখনো যাচাই-বাছাই পর্যায়ে রয়েছে। তবে এটা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বেশ সুফল পাওয়া যাবে। এর মাধ্যমে একজন অপরাধীকে একবার শনাক্ত করা গেলে তাকে মনিটারিং করতে আলাদা করে অর্থ, সময় ও শ্রম দিতে হবে না। তার গতিবিধি প্রযুক্তিই নজরদারির মধ্যে রাখবে।’
তিনি আরও বলেন, সাধারণ মানুষ বাসাবাড়ি-ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যেসব ক্যামেরা ব্যবহার করেন তা অধিকাংশই নরমাল। এসব ক্যামেরায় ঘটনার ফুটেজ অস্পষ্ট থাকায়, অনেক সময় বিপাকে পড়তে হয়। তাই জনসাধারণ এআই ক্যামেরা স্থাপন করলে তাদের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও উপকৃত হবে।