দেশের চিকিৎসাব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল যাত্রা শুরু করেছিল। অত্যাধুনিক চিকিৎসাপ্রযুক্তি, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও গবেষণাভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবার সমন্বয়ে হাসপাতালটিকে দেশের সর্বোচ্চ চিকিৎসাকেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনা ছিল সরকারের।
যাত্রার কয়েক বছর পরেও ওই হাসপাতাল পুরো মাত্রায় চিকিৎসাসেবা দিতে অক্ষম। হাসপাতালের প্রশাসনিক কাঠামো, জনবল ব্যবস্থাপনা ও সেবা কার্যক্রম নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। এ অবস্থায় হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম আরও কার্যকরী, জবাবদিহিমূলক ও গতিশীল করতে চুক্তিভিত্তিক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এবং দক্ষ সার্জন নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ জন্য সাত সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি করা হয়েছে।
বিএমইউর তথ্যমতে, বিএমইউ সুপার স্পোশালাইজড হাসপাতালের বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামোকে আরও কার্যকরী করতে এবং সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করতে একজন চুক্তিভিত্তিক সিইও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। তাই গত ১১ মে অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্তে সাত সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে। গত ১৬ মে কমিটির অফিস আদেশে বলা হয়েছে, সুপার স্পোশালাইজড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্থায়ীভাবে নিযুক্তদের কী করণীয় সেসব বিষয় পর্যালোচনা করে একটি প্রতিবেদন দাখিল করবে।
ওই কমিটির সভাপতি করা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদকে। কমিটির সদস্যরা হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি (একাডেমিক) অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম, প্রো-ভিসি (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মজিবুর রহমান হাওলাদার, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আক্তার, রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. মোস্তফা কামাল, প্রক্টর অধ্যাপক ডা. শেখ ফরহাদ। সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুনশী কমিটির সদস্যসচিবের দায়িত্ব পালন করবেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক হাসপাতালে ও মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসাসেবার জন্য পেশাদার হাসপাতালের ব্যবস্থাপকদের নেতৃত্বে পরিচালনা ব্যবস্থা রয়েছে। বিএমইউ ওই মডেলের দিকেই এগোতে চায়। এমন মডেলের দিকে যেতে হলে স্পেশালাইজড হাসপাতালটিতে শুরু থেকে এখন পর্যন্ত নিযুক্ত জনবলের বিষয়ে কী করণীয় তা ঠিক করতে হবে। আজ সোমবার কমিটির গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হবে।
সিইও নিয়োগের কারণ : বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত শুধু নয়, বরং সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালনা কাঠামো নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। সরকারি হাসপাতাল সাধারণত পরিচালক বা প্রশাসনিক কর্মকর্তার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসা কার্যক্রমের পাশাপাশি আর্থিক ব্যবস্থাপনা, মানবসম্পদ ও প্রযুক্তি পরিচালনা, ক্রয় কার্যক্রম, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং রোগীসেবার মান নিশ্চিত করতে পেশাদার ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন রয়েছে।
কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘বিএমইউ সুপার হাসপাতালে একজন সিইও নিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছে বেশ কয়েকটি কারণে। আজ সোমবার কমিটির বৈঠক হবে। আমাদের লক্ষ্য সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালকে প্রচলিত কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত না করে সত্যিকারের বিশেষায়িত ও স্বতন্ত্র হাসপাতাল হিসেবে গড়ে তোলা। আমরা যদি সাধারণ প্রশাসনিক ও পরিচালন পদ্ধতিতেই এগোই, তাহলে এটি আরেকটি বিএমইউ হাসপাতাল হয়ে যাবে, যা আমাদের উদ্দেশ্য নয়।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের পরিকল্পনা হলো, হাসপাতালটিকে দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি হাসপাতালগুলোর মতো উন্নত করা। বর্তমানে ঢাকার কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালে একটি বাইপাস সার্জারির জন্য প্রায় ৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়। আমরা একই মানের চিকিৎসাসেবা প্রায় ৩ লাখ টাকায় দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছি। এর জন্য আমাদের খুবই দক্ষ ও অভিজ্ঞ সার্জন এবং চিকিৎসকের দরকার হবে।’
অধ্যাপক আজাদ বলেন, ‘শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি হাসপাতালে একজন বিশেষজ্ঞ সার্জনের মাসিক আয় সরকারি বেতনের তুলনায় অনেক বেশি। সরকারি বেতন-কাঠামোর মধ্যে তাদের নিয়ে আসা কঠিন। তাই বেতন-ভাতা ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাসহ সার্বিক কাঠামো নতুনভাবে সাজাতে হবে।
এ জন্য আইনগত ও প্রশাসনিক অনুমোদন নিতে হবে। সরকার যদি অনুমতি দেয়, তাহলে আমরা হাসপাতালটিকে নতুন কাঠামোয় পরিচালনা করতে পারব।’
তিনি বলেন, ‘শুধু একজন সিইও নিয়োগ করলেই হবে না, হাসপাতালের সামগ্রিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের জনবল ও ব্যবস্থাপনা-কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। আমরা আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করছি এবং আশা করছি প্রক্রিয়াগুলো দ্রুত সম্পন্ন হবে।’
কমিটির সদস্য প্রক্টর অধ্যাপক ডা. শেখ ফরহাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে একজন চুক্তিভিত্তিক সিইও নিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছে। সিইও নিয়োগ হলে যেসব স্থায়ী জনবল রয়েছে তারা কীভাবে কাজ করবে সেটি ঠিক করতে একটি কমিটি করা হয়েছে। কমিটি এ বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করে একটি প্রতিবেদন দাখিল করবে।’
কমিটি কী দেখবে : কমিটির আলোচনায় কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পাবে প্রথমত, হাসপাতালের সৃষ্টিলংগ্ন থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে স্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রয়োজনীয়তা, বেতন-ভাতা এবং ভবিষ্যৎ অবস্থান। দ্বিতীয়ত, আর্থিক দায় ও ব্যয়, হাসপাতালের পরিচালন ব্যয়, রাজস্ব আয় এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সক্ষমতা। তৃতীয়ত, বর্তমান ব্যবস্থাপনা কতটা কার্যকর এবং সিইওভিত্তিক মডেল বাস্তবায়ন সম্ভব কি না। চতুর্থত, সেবার বিস্তার, বর্তমান সেবা, রোগীর সংখ্যা, চিকিৎসা সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ পরিকল্পনা। পঞ্চমত, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট ও প্রশাসনিক জনবলের ঘাটতি নিরূপণ।
আলোচনায় সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল : বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার রোগী উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারত, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে যান। বিদেশে চিকিৎসার ব্যয় অনেক। দেশের অর্থই সেখানে ব্যয় করা হয়। এ প্রবণতা কমাতে এবং দেশের ভেতরেই আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে বিএমইউ সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয়। হাসপাতালটিতে আধুনিক অপারেশন থিয়েটার, রোবোটিক সার্জারি সুবিধা, উন্নত আইসিইউ, উচ্চ প্রযুক্তির ডায়াগনস্টিক সিস্টেম এবং বিশেষায়িত চিকিৎসা বিভাগ স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু অবকাঠামোগত সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও হাসপাতালটি এখনো পূর্ণ সক্ষমতায় চিকিৎসাসেবা চালু করতে পারেনি। তাই বর্তমান বিশ্বিবদ্যালয় প্রশাসন হাসপাতালটির সেবা কার্যক্রম বাড়াতে প্রশাসনিক সংস্কারের নতুন পরিকল্পনা করেছে, যার আওতায় একজন বিদেশি সিইও বসানোর চিন্তা করা হচ্ছে।
জনবল সংকট : স্বাস্থ্য খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, হাসপাতালটির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ জনবল ব্যবস্থাপনা। অনেক আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকলেও সেসবের পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক প্রশিক্ষিত টেকনোলজিস্ট, নার্স ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই। প্রশাসনিক কাজের চাপও বেড়েছে। ফলে পেশাদার ব্যবস্থাপনার দাবি দীর্ঘদিন ধরেই উঠছিল।
সিইওর সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ : চুক্তিভিত্তিক সিইওর সামনে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ থাকবে যেমন প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ জনবল নিয়োগ ও পুনর্বিন্যাস করা; সেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে সব বিভাগকে পূর্ণ সক্ষমতায় চালু করা; রোগীবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে রোগীর ভোগান্তি কমানো এবং সেবার গুণগত মান বাড়ানো; প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্যয়বহুল চিকিৎসা সরঞ্জামের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং আর্থিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের কোটি কোটি টাকার অবকাঠামো, অত্যাধুনিক প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার এবং এ প্রতিষ্ঠানকে কার্যকরীভাবে পরিচালনা করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। চুক্তিভিত্তিক সিইও নিয়োগ এবং এ বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলারই নতুন উদ্যোগ। এ উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে কমিটির সুপারিশ, নিয়োগ-প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং হাসপাতালের দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন-পরিকল্পনার ওপর।
জানা গেছে, ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে একনেকে বিএমইউ সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল প্রকল্পে অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার হাসপাতালটিতে বাংলাদেশ সরকার, দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থায়ন রয়েছে। প্রকল্প-পরিচালক অধ্যাপক ডা. জুলফিকার রহমান খান নির্মাণকাজ শেষে ২০২২ সালের ২২ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে হাসপাতালটি বুঝিয়ে দেন। ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হাসপাতালের উদ্বোধন করেন এবং ২৭ ডিসেম্বর হাসপাতালে আউটডোর চিকিৎসাসেবা শুরু হয়।