মাত্র ৩ ঘণ্টায় লাশ হয়ে গেল ৬ নবজাতক!

মগবাজারের আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর কারণ এখনো অজানা। ঘটনার পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। পাশাপাশি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান ও প্রতিকারে করণীয় নির্ধারণ করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। কিন্তু তিন দিনে প্রতিবেদন দিতে পারেনি। আগামী ৩ জুন প্রতিবেদন দাখিল করবে। হাসপাতালের তদন্ত কমিটিও গতকাল পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ জানতে পারেনি।

এদিকে গতকাল হাসপাতালটিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন যৌথ অভিযান চালিয়ে ৩ লাখ টাকা জরিমানা করেছে। গতকাল বিকেল ৩টা থেকে ৬টা পর্যন্ত অভিযান চালায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। এ সময় হাসপাতালের ক্যান্টিনের ফ্রিজে জমাটবদ্ধ অবস্থায় লেবেলবিহীন মিষ্টি, ক্যান্টিনে অস্বাস্থ্যকর রান্নাঘর, বিভিন্ন ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা না থাকা, হাসপাতালের রেফ্রিজারেটরে তাপমাত্রা পরিমাপক না থাকাসহ বিভিন্ন কারণে অভিযোগ গঠন করে। এসব অপরাধে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী ১ লাখ টাকা এবং নিরাপদ খাদ্য আইনে ২ লাখ টাকা; মোট ৩ লাখ টাকা জরিমানা দন্ড আরোপ করা হয় এবং তাৎক্ষণিকভাবে আদায় করা হয়।

অভিযানে নেতৃত্ব দেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, হাসপাতালের সামগ্রিক পরিবেশ, আলো-বাতাসের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখা, রেফ্রিজারেটরে তাপমাত্রা পরিমাপক যন্ত্র স্থাপন, কেন্টিনের পরিবেশ উন্নতকরণ, বেকারি স্থানান্তরসহ বিভিন্ন বিষয়ে সতর্কতামূলক পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে।

এই হাসপাতালে গত ২৭ মে আকস্মিক ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। এখনো সেই মৃত্যুর কারণ অজানাই রয়ে গেছে। কারণ জানতে চলছে তদন্ত। তদন্তের বিষয়ে একটি নির্ভর যোগ্য সূত্র জানিয়েছে, দুই তদন্ত কমিটির কোনোটিই এখনো মৃত্যুর সঠিক কারণ খুঁজে পায়নি। এখনো সবই অনুমাননির্ভর। এই দুই কমিটির বাইরে বুয়েটের একজন  কেমিক্যাল বিশেষজ্ঞ দিয়েও তদন্ত করাচ্ছে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান ও যুগ্মসচিব (বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা অধিশাখা) মো. মহসীন বলেন, ‘আমরা দুইজন ইঞ্জিনিয়ারের সহযোগিতা নিচ্ছি। আর একজন শিশু হাসপাতালের অধ্যাপককে প্রথম দিন নিয়েছিলাম। তিন দিন সময় দেওয়া হয়েছিল। আমরা ৩ তারিখ পর্যন্ত সময় চেয়েছি। আমরা চেষ্টা করছি, দেখা যাক। ৩ তারিখ প্রতিবেদন দাখিল করব।’

মৃত নবজাতকদের কারও বয়স এক দিন, কারও দুই বা তিন। কয়েক ঘণ্টা আগেও পরিবারগুলো ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করেছিল। কী নাম রাখবে, কবে বাসায় ফিরবে। এতদিন পর সন্তানের মুখ দেখে বাবার বুক জুড়িয়ে গেছিল। গালভর্তি ছিল স্বস্তির হাসি। কিন্তু সেই স্বস্তি মুহূর্তেই বিশাদে রূপ নিল। নবজাতক নিয়ে খুশি মনে আর ফেরা হলো না তাদের। ফিরতে হলো লাশ নিয়ে চোখের জলে আর হাহাকারে। রাজধানীর ব্যস্ত শহর তখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। মগবাজারের আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ভারী হয়ে ওঠে মা-বাবা আর সেই ছয় নবজাতকের স্বজনদের আর্তনাদে। ভোর ৬টা থেকে ৯টার মধ্যে তিন ঘণ্টায় আকস্মিকভাবে মৃত্যু হয় এই নবজাতকদের। অভিভাবকদের অনুরোধে ময়নাতদন্ত ছাড়াই ওই রাতে ছয় নবজাতকের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ঘটনার পর এখনো কেউ নিশ্চিত নয়, মৃত্যুর কারণ কী। ঈদের ঠিক আগের দিনে এমন একটি ঘটনায় সারা দেশে হইচই পড়ে যায়। ধারণা করা হয় এসির গ্যাস লিকেজে মৃত্যু হতে পারে কিংবা ওই পোস্ট অপারেটিভ রুমে ত্রুটি ছিল। তবে এই ঘটনাকে ‘দুর্ঘটনা’ বলে উল্লেখ করেছে আদ্ব্্-দ্বীন কর্তৃপক্ষ দুঃখ প্রকাশ করেছে।

গত ৩০ মে সাংবাদিকদের ওপর হামলা পর আদ্ব্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাহিদ ইয়াসমিন এক ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ‘দুর্ঘটনাজনিত’ কারণে গত ২৭ মে ছয়জন নবজাতকের অনাকাক্সিক্ষত এবং অত্যন্ত দুঃখজনক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত শোকাহত ও মর্মাহত।’

তিনি বলেন, ‘ঘটনার পর পর মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি আদ্ব্-দীন কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটিকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করছে এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গঠিত তদন্ত কমিটিও বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করছেন। এই বিষয়ে তদন্ত কমিটির কোনো অগ্রগতি থাকলে টাইম টু টাইম জানানো হবে।’

একটি সূত্র জানিয়েছে, ওই রুমে রাত ২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত একজন মায়ের অনুরোধে এক ঘণ্টা এসি বন্ধ ছিল। এরপর আবার এসি চালু করে দেওয়া হয়। তিন ঘণ্টা এসি চলার পর ভোর ৬টার দিকে নবজাতকদের অসুবিধা শুরু হয়। তিন ঘণ্টার মধ্যে ছয় শিশুই মারা যায়। বয়স্ক যারা ছিলেন, মা বা অন্য স্বজনরা, তাদের জটিলতা দেখা দেয়নি।

ছয় নবজাতকের মধ্যে দুইজন ছিল যমজ। তাদের বাবা হাসান জানান, ওই দিন ওই রুমে বয়স্ক যারা ছিলেন তারাও অস্বস্তি বোধ করছিলেন। তাদের একজনের বমিও হয়েছিল।

ঘটনার পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ পুলিশ, র‌্যাব ও অন্যান্য কর্তৃপক্ষ হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। দুপুরের দিকে পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডের ওই কক্ষটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক ইউনিটের সদস্যরা সিলগালা করে দেন। তারা সেখান থেকে আলামত সংগ্রহ করেন। এর কিছুক্ষণ পর ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলের সদস্যরাও সেখানে আসেন। কক্ষটিতে ক্ষতিকর কোনো গ্যাস আছে কি না, সেটির নমুনা সংগ্রহ করে দলটি। গত ৩০ মে হাসপাতাল পরিদর্শনে যান স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল। তিনি প্রশাসনিক ভবনের ৭ তলায় বেকারির কারখানা দেখে ক্ষুব্ধ হন। এ সময় মন্ত্রী বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তদন্তকারীরা হাসপাতালের সব বিষয় নিয়ে তদন্ত করছে, সবকিছুই বের হয়ে আসবে বলেও আশ্বস্ত করেন তিনি।

মন্ত্রী চলে যাওয়ার পর ওই হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা সাংবাদিকদের ধাওয়া করে। পরে বিকেলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের পরিচালক (এইচ আর অ্যান্ড কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স) তারিকুল ইসলাম মুকুল।

ওই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘ঘটনার পর থেকে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের হাসপাতালে অনবরত আসা-যাওয়ার সঙ্গে বিপুল সংখ্যক সাংবাদিকের চলাচলে হাসপাতালে কর্মরত সেবা প্রদানকারীরা কয়েকদিন ধরে মানসিক চাপের মধ্যে সময় কাটাচ্ছেন। এতে করে হাসপাতালে ভর্তিকৃত ও হাসপাতালে বিভিন্ন সেবা গ্রহণ করতে আগত ব্যক্তিদেরও যথেষ্ট অসুবিধা হচ্ছে। এ অবস্থায় (৩০ মে) স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। মন্ত্রীর হাসপাতাল ত্যাগের পর বিপুলসংখ্যক সাংবাদিক হাসপাতালে প্রবেশের চেষ্টা করেন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের স্বার্থে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সাংবাদিকদের হাসপাতালে প্রবেশ নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন। হাসপাতালের কর্মীদের সঙ্গে সাংবাদিকদের কথার একপর্যায়ে জনৈক সাংবাদিক হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের ঝাড়ুদার সম্বোধন করলে কর্মীরা অপমানিত বোধ করে উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং সাংবাদিকদের হাসপাতাল পরিত্যাগে অনুরোধ করেন। উপস্থিত হাসপাতালের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ হাসপাতালের কর্মীদের নিবৃত্ত করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করেন।’

বিজ্ঞপ্তিতে তিনি বলেন, ‘আদ্-দ্বীন হাসপাতাল সব সময়ই গণমাধ্যমকর্মীদের সহযোগিতা করে থাকেন। তারপরেও ৩০ মে’র অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার জন্য আদ্-দ্বীন হাসপাতাল আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছে এবং প্রত্যাশা করছে যে, গণমাধ্যমকর্মীরা হাসপাতাল কর্মীদের অনিচ্ছাকৃত ব্যবহারের জন্য মনে কষ্ট পেলে সেটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।’

হত্যা মামলা দায়ের : ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় অবহেলার অভিযোগে মৃত এক নবজাতকের পরিবারের পক্ষ থেকে রমনা থানায় গত ২৭ মে রাতে একটি মামলা দায়ের করা হয়। তবে এ ঘটনায় এখনো কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এখনো কাউকে আটক করেনি পুলিশ।

ডিএমপির রমনা বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) শেখ জাহিদুল ইসলাম বলেন, মামলায় অবহেলাজনিত কারণে মৃত্যুর অভিযোগ আনা হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।