প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, দেশের জনগণের সব প্রত্যাশা পূরণ করতে সরকার বদ্ধপরিকর। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের দর্শনে অনুপ্রাণিত হয়ে বর্তমান সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করছে এবং নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা পূরণ করাই সরকারের মূল লক্ষ্য।
গতকাল রবিবার বিকেলে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এই আলোচনা সভার আয়োজন করে।
তারেক রহমান বলেন, সরকারের ইশতেহার এখন শুধু বিএনপির নয়, এটি এখন জনগণের ইশতেহার। যারা এর পক্ষে রায় দিয়েছেন, তাদের সেই আশা-আকাক্সক্ষা আমাদের পূরণ করতে হবে। জিয়াউর রহমান যে পথনির্দেশনা দিয়েছিলেন, তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করেই আমরা কর্মসূচি হাতে নিয়েছি এবং দেশ পরিচালনা করছি।
বিচার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পর দেশের মানুষের আকাক্সক্ষা পূরণ হয়নি। গত ১৭ বছরে বিচার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতসহ গণতন্ত্রকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, জাতি তার সাক্ষী। বিএনপি সরকার এক কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। তাই এমন সময়ে হেসেখেলে চললে দেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অপূরণীয় ক্ষতি হবে।
সামাজিক অবক্ষয় রোধে পারিবারিক শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, দেশে ফেরার পর মনে হয়েছে পারিবারিক শিক্ষার কিছুটা ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধ বাড়াতে কাজ করার সরকারি নির্দেশনা সংশ্লিষ্টদের দেওয়া হয়েছে।
বাবার স্মৃতিচারণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে দিয়েই বিশ্ব বাংলাদেশকে চিনত। বাংলাদেশ মানেই তাকে বুঝত অনেকে। একজন সন্তান হিসেবে এটি আমাকে গর্বিত করে। এ সময় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, সরকার তখনই সফল হবে, যখন দলের লোকজন সরকারকে সহযোগিতা করবে। শুধু মন্ত্রীরা পরিশ্রম করলেই সফলতা আসবে না। যেভাবে নির্বাচনে সহযোগিতা করে বিজয় নিশ্চিত করেছেন, ঠিক সেভাবেই ইশতেহার বাস্তবায়নেও সব অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সভায় সভাপতিত্ব করেন। অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, কেন্দ্রীয় নেতা, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের প্রতিনিধিসহ বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।
বিএনপির প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সেলিমা রহমান ও অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, ঢাকা উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হক, ঢাকা দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এসএম জিলানী, যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম মনি এবং ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব।
এ ছাড়া অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. লুৎফর রহমান এবং বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন জিয়াউর রহমানের জীবন ও অবদান নিয়ে আলোচনা করেন।
বিকেলে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। পরে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের রুহের মাগফিরাত কামনায় বিশেষ মোনাজাত করা হয়। অনুষ্ঠানে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতার স্মরণে ১ মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
জিয়ার সমাধিতে প্রধানমন্ত্রী : জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে গত শনিবার দিনব্যাপী কর্মসূচিতে বেলা ১১টায় তার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরে বিএনপির পক্ষ থেকে শীর্ষ নেতাদের নিয়ে দ্বিতীয়বার শ্রদ্ধা জানান তিনি। এ সময় প্রধানমন্ত্রী ১ মিনিট নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন ও ফাতেহা পাঠ করে সবাইকে নিয়ে দোয়া করেন। তিনি চলে যাওয়ার পরপরই ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে সেখানে যান হাজার হাজার নেতাকর্মী।
‘কথা কম কাজ বেশি’ নীতিতে এগোতে চান প্রধানমন্ত্রী : জিয়াউর রহমানের ‘কথা কম কাজ বেশি’ নীতিতে চলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে দিনভর কর্মসূচিতে সশরীরে অংশগ্রহণ করে তিনি বলেন, ‘শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের রাজনীতি ছিল মানুষের পাশে দাঁড়ানো, মানুষকে সহযোগিতা করা এবং দেশ গঠন করা। শহীদ জিয়ার সেই আদর্শে দীক্ষিত হয়ে দেশ গঠনের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করার শপথ নিতে হবে।’
সেনানিবাসে গিয়ে আবেগতাড়িত : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেনাসদস্যদের সঙ্গে পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দ ভাগাভাগি করেছেন। গত বৃহস্পতিবার ঢাকা সেনানিবাসে অফিসার, জেসিও ও সৈনিকদের সঙ্গে ঈদ প্রীতিভোজে অংশ নেন তিনি। অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ শাহীনুল হক।
ঈদ প্রীতিভোজে সেনা সদস্যদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বহু বছর পর নিজের পুরনো ও স্মৃতিবিজড়িত সেনানিবাস এলাকায় এসে তিনি আনন্দিত ও আবেগতাড়িত। সেনানিবাসের শৃঙ্খলা, সহযোদ্ধা সুলভ বন্ধন এবং সেনাসদস্যদের আন্তরিকতা তার কাছে বিশেষভাবে স্মরণীয়।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উন্নত পেশাদার মান, দায়িত্ববোধ এবং দুর্যোগ মোকাবিলাসহ দেশের যেকোনো প্রয়োজনে জনগণের পাশে দাঁড়ানোর ঐতিহ্য আমাকে গর্বিত করে। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের নিরাপত্তা রক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সবসময় রাষ্ট্রের আস্থার প্রতীক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছে। দুর্যোগ মোকাবিলা থেকে শুরু করে জাতীয় যেকোনো প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর অবদান দেশের মানুষের কাছে গভীরভাবে মূল্যায়িত।
প্রীতিভোজ শেষে তিনি সেনাসদস্যদের জন্য নির্ধারিত ইউনিট পরিদর্শন করেন। পরে ইউনিট প্রাঙ্গণে একটি গাছের চারা রোপণ করেন এবং পরিদর্শন বইয়ে স্বাক্ষর করেন। পরবর্তীতে অফিসার, জেসিও ও অন্যান্য পদবির সেনাসদস্যদের সঙ্গে ফটোসেশনে অংশ নেন তিনি। কর্মসূচির শেষাংশে সেনাসদস্যদের সঙ্গে জোহরের নামাজও আদায় করেন প্রধানমন্ত্রী।
ঈদুল আজহা উদযাপন : প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর দ্বিতীয়বারের মতো দেশে ঈদ উদযাপন করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গত বুধবার ঈদুল আজহার সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রধান জামাতে অংশ নিতে উপস্থিত হন জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে। সেখানে সাধারণ মুসল্লিদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঈদের নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনসহ উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা ও কুশল বিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী।
তবে প্রটোকলের গ-ি ভেঙে তার চেনা রূপটি দেখা যায় নামাজের পরপরই। ঈদগাহে উপস্থিত সাধারণ মানুষের দিকে হাত বাড়িয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী। প্রটোকল ভেঙে সাধারণ জনতার সঙ্গে হাত মেলান এবং ঈদের শুভেচ্ছা ভাগাভাগি করেন। এরপর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানকে পাশে বসিয়ে নিজে গাড়ি চালিয়ে যান মা-বাবার স্মৃতিবিজড়িত শেরেবাংলা নগরে। সেখানে বাবা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ফাতেহা পাঠ ও জিয়ারত করেন তিনি। সেখানেও তিনি উপস্থিত সাধারণ মানুষের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
সেখান থেকে প্রধানমন্ত্রী যান বনানী কবরস্থানে। সেখানে ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকো এবং শ্বশুরের কবরে শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহে শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন ও রুহের মাগফিরাত কামনা করেন তারেক রহমান। সেখান থেকে গুলশানের বাসভবনে ফেরেন সরকারপ্রধান। পরে তার কার্যালয়ের প্রেস উইংয়ের সদস্য এবং ব্যক্তিগত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে একান্তে কিছুটা সময় কাটান তিনি।