দাম না পেয়ে হতাশ মৌসুমি ব্যবসায়ীরা

ঈদুল আজহা শেষে ব্যস্ত সময় পার করছেন পশুর চামড়া সংরক্ষণ, পরিবহন ও ক্রয়-বিক্রয়ে সংশ্লিষ্টরা। সরকার চলতি বছর কোরবানির পশুর চামড়ার দাম বাড়ালেও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। আগের ধারাবাহিকতায় এবারও কাঁচা চামড়ার কাক্সিক্ষত দাম না পেয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন কোরবানিদাতা ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। আবার অনেকে বিনামূল্যে মসজিদ-মাদ্রাসায় চামড়া দান করলেও সংরক্ষণ দক্ষতার অভাবে সেগুলোর মান খারপ বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

ট্যানারি মালিকরা বলছেন, স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অদক্ষতা, গুজবের কারণে কোরবানিদাতারা চামড়ার সঠিক দাম পাননি। এ কারণে অনেকে চামড়া ফেলে দিয়েছেন বা মাটিতে পুঁতে ফেলেছেন। ফলে এ বছর চামড়া সংগ্রহের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ হয়েছে, তা অর্জন করা সম্ভব হবে না। তবে, ট্যানারি মালিকরা লবণযুক্ত চামড়া সরকার নির্ধারিত দামেই কিনছেন বলে জানিয়েছেন। অন্যদিকে প্রতি বছর কোরবানির চামড়ার দাম কমে যাওয়ার পেছনে সিন্ডিকেটের কারসাজি বলে দাবি করছেন খাত-সংশ্লিষ্ট অনেকে। এর প্রতিকারে কোরবানির সময় সরকারিভাবে চামড়া সংরক্ষণের দাবি জনিয়েছেন তারা।

এদিকে সরকারের তদারকি কমিটির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, চামড়ার মূল্য নিয়ে নেতিবাচক তথ্য থাকলেও ব্যবস্থাপনাতে কোনো অনিয়ম হয়নি। ঈদ উপলক্ষে সরকার ঢাকাসহ সব বিভাগে তদারকি কমিটি ও সমন্বয় সেল গঠন করেছে। এখন তথ্য পর্যালোচনা চলছে, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সার্বিক বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে। বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এ বিষয়ে সার্বিক তদারকি করেছেন এবং ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী কয়েকটি এলাকা পর্যবেক্ষণে গিয়েছেন।

এ বছর ঢাকায় লবণযুক্ত গরুর চামড়া প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়, যা গত বছর ছিল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা। অন্যদিকে ঢাকার বাইরে প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয় ৫৭ থেকে ৬২ টাকা, যা গত বছর ছিল ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। নতুন দাম অনুযায়ী, এবার প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত খাসির চামড়া ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং বকরি ২২ থেকে ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, এবার কোরবানিযোগ্য গবাদি পশুর সংখ্যা ছিল এক কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজারটি। চাহিদা ছিল এক কোটি এক লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) কর্মকর্তারা জানান, এ বছর এক কোটি কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিভিন্ন ট্যানারির মালিক ও খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা জানান, সরকার নির্ধারিত দাম ও নিয়ম মেনেই তারা চামড়া কিনছেন। এবার ৭৫ থেকে ৮০ হাজার গরু, মহিষ ও ছাগলের চামড়া সংরক্ষণ হতে পারে।

কুমিল্লার লালমাই এলাকায় মৌসুমি ব্যবসায়ীরা এবার প্রতিটি চামড়া ১০০ থেকে ৩০০ টাকায় কিনেছেন। তবে পাইকারদের কাছে বিক্রি করতে গিয়ে তারা আশানুরূপ দাম পাননি। স্থানীয় ব্যবসায়ী রবিউল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় এবার চামড়ার ব্যবসা খারাপ গেছে। আমি ৪০টি চামড়া সংগ্রহ করে হাটে নিয়েছিলাম। কিন্তু পাইকাররা প্রতি চামড়ার জন্য ২০০ টাকার বেশি দিতে রাজি হয়নি। বাধ্য হয়ে ওই দামেই বিক্রি করেছি।’ আরেক মৌসুমি ব্যবসায়ী ইয়াসিন জানান, তিনি ছোট চামড়া ২০০ টাকা এবং বড় চামড়া ৩০০ টাকায় কিনেছিলেন। কিন্তু পাইকাররা ২০০ টাকার বেশি দামে চামড়া কিনছেন না। ভবিষ্যতে আর চামড়ার ব্যবসা করবেন না জানিয়ে দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও ভালো দাম পাইনি। শেষ পর্যন্ত লোকসানেই চামড়াগুলো বিক্রি করতে হয়েছে।’

চামড়ার দাম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কোরবানিদাতারাও। বেসরকারি চাকরিজীবী এমদাদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শুনেছিলাম সরকার চামড়ার দাম বাড়িয়েছে। কিন্তু বাস্তবে ব্যবসায়ীরা আগের চেয়েও কম দাম বলছেন। লাখ টাকার গরুর চামড়ার দাম ১৫০ টাকা চাওয়া হয়েছে। প্রথমে দিতে রাজি হইনি, পরে বিকেলের দিকে বাধ্য হয়ে ওই দামেই বিক্রি করেছি।’

একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান নাছির উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘প্রতি বছর কোরবানি শেষ হওয়ার আগেই কয়েকজন চামড়া কিনতে চলে আসেন। কিন্তু এবার বিকেলের আগে কেউ আসেনি। একজন এসে দেড় লাখ টাকার গরুর চামড়ার দাম মাত্র ২০০ টাকা বলেন। শেষ পর্যন্ত ওই দামে চামড়া বিক্রি করেছি।’ এমন তথ্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাওয়া যাচ্ছে।

সরকারের তদারকি কমিটির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, চামড়ার মূল্য নিয়ে নেতিবাচক তথ্য থাকলেও ব্যবস্থাপনাতে তেমন কোনো অনিয়ম হয়নি। কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারের পক্ষ থেকে বিনামূল্যে লবণ বিতরণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও চামড়া ক্রয়-বিক্রয়ে বড় কোনো অনিয়ম বা অব্যবস্থাপনা হয়নি। তবে কিছু মাদ্রাসা চামড়া সংরক্ষণ না করে বিতরণ করা লবণ মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন বলে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। 

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মো. শাহীন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, অনেকে চামড়ার দাম নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য চড়াচ্ছে। সরকার লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধরণ করেছে। কাঁচা চামড়ার দাম স্থানীয় বা মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ঠিক করেন। আমরা সরকার নির্ধারিত দামে লবণযুক্ত চামড়া কিনছি। এখনো লবণযুক্ত চামড়ার কেনাবেচা শুরু হয়নি। এবার ৭৫ থেকে ৮০ লাখ চামড়া সংগ্রহ হতে পারে। 

কোরবানির তুলনায় কম চামড়া সংগ্রহের বিষয়ে শাহীন আহমেদ জানান, মাঠ পর্যায়ে চামড়ার সঠিক মূল্য ও সংরক্ষণ প্রক্রিয়ার অভাবে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। অনেকে নষ্ট চামড়া ফেলে দেন বা মাটিতে পুঁতে ফেলেন। তাই লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় সংগ্রহ কম হয়ে থাকে। তবে বাকি যেসব চামড়া ট্যানারি পর্যায়ে আসবে। সেসব চামড়া যথাযথ প্রক্রিয়াজাত করা গেলে দেশের অর্থনীতিতে অনেক বড় অবদান রাখবে।

কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ, পরিবহন, ক্রয় বা বিক্রয় সংক্রান্ত সাপ্লাই চেইন কন্ট্রোল রুমের দায়িত্বে থাকা অন্যদের মধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মোছা. নারগিস মুরশিদা দেশ রূপান্তরকে জানান, ঈদের দিন থেকে কন্ট্রোল রুম থেকে যথাযথভাবে মাঠ পর্যায়ের তদারকি কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এখন চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণ কার্যক্রম চলছে। এক কোটি পশুরু চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিভাগীয় পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ শেষ পর্যায়ে রয়েছ। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে পরিপূর্ণ প্রতিবেদন তৈরি হবে। এর মধ্যে চামড়া সংরক্ষণ, পরিবহন, ক্রয় ও বিক্রিয়ের বিষয়ে বড় ধরনের কোনো সমস্যা হয়নি।

সরকারের বিভাগওয়ারি সমন্বয় কমিটির চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (যুগ্মসচিব) মোস্তাফা জামাল হায়দার। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৮ লাখ চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছে। বিস্তারিত তথ্য পেতে আরও দু-একদিন লাগবে। চামড়ার দাম নিয়ে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কিছু আপত্তি থাকলেও সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় প্রশাসন যথাযথ পদক্ষেপ নিয়েছে। একই তথ্য জানিয়েছেন, সিলেট বিভাগের দায়িত্বে থাকা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (পরিকল্পনা) মোহাম্মদ বদরুল হক ও খুলনা বিভাগের দায়িত্বে থাকা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দ্রব্যমূল্য পর্যালোচনা পূর্বাভাস সেলের বাণিজ্য পরামর্শক আবু সালেহ্ মোহাম্মদ ইমরান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, এবার কোরবানির পশুর চামড়া ব্যবস্থাপনায় মাঠ পর্যায়ে অনিয়ম পরিলক্ষিত হয়েছে, যা স্থানীয় রজনৈতিক দল ও মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অনীহার কারণে হয়েছে বলে তারা মনে করেন। অনেক ক্ষেত্রে ট্যানারি মালিকদের সঙ্গে অঞ্চলভিত্তিক কিছু ব্যক্তির যোগাযোগ রয়েছে, যারা সমাজে চামড়ার দাম নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণা চালিয়ে বিনামূল্য বা নামমাত্র মূল্যে চামড়া সংগ্রহ করে পরবর্তী সময়ে  প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে বেশি দামে বিক্রি করছে। এতে ট্যানারি মালিকরা উপকৃত হচ্ছেন।

চামড়া শিল্পের বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষক ও ক্রাফটসম্যান ফুটওয়্যার অ্যান্ড এক্সেসোরিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাদাত হোসেন সেলিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ১০-১৫ বছর আগে দেশের ট্যানারি শিল্পে এমন কোনো জাদু ছিল না যে, তখন চামড়ার দাম বেশি ছিল। আর এখন এত আধুনিক যন্ত্রপাতি, হিমাগার থাকার পরেও চামড়া সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না। দাম পাওয়া যাচ্ছে না। সরকার বিনামূল্যে লবণ দিচ্ছে। তারপরও মানুষ মূল্যবান চামড়াটি পুঁতে ফেলছে। সমস্যা মৌসুমি ব্যবসায়ীদের নয়। সমস্যাটা তৈরি হয়েছে রাজধানীতে। নির্দিষ্ট কিছু ট্যানারি ব্যবসায়ীর কবলে থাকা দেশের চামড়া শিল্প দিন দিন অকেজ হয়ে পড়েছে। ঈদ মৌসুম এলেই ট্যানারি মালিকরা সেন্ট্রাল ইফ্লুুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (সিইটিপি) অজুহাত তুলে। এটা ট্যানারির একটা সমস্যা। এ ছাড়া অনেক সমস্যা রয়েছে। এর সমাধান করতে হলে, সরকারকে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নিতে হবে। ব্যবসায়ীদের অজুহাতগুলোকে গুজব হিসেবে চিহ্নিত করে, কাঁচা চামড়া সরকারের উদ্যোগে সংরক্ষণের ব্যবস্থাগ্রহণ করতে হবে। যেমনভাবে খদ্যশস্য সংরক্ষণ করা হয়। আগামী দুই তিন বছর এটি করা গেলে ট্যানারির অনেক সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে। ব্যবসায়ীদের সরকারের কাছ থেকে চামড়া কিনে ব্যবসা করতে হবে। এতে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবে এবং চামড়াশিল্প প্রতিযোগী হয়ে উঠবে।