ট্রেনের ধাক্কায় মা-ছেলে নিহত

নতুন জামা কিনে বাড়ি ফেরা হলো না তাদের

সুজন প্রথমে মৃতপ্রায় স্ত্রীকে ডান কাঁধে তুললেন। পেছনে স্ত্রীর মাথা আর হাত ঝুলছে। এরপর নিচে পড়ে থাকা দেড় বছর বয়সী ছেলেকে তার বুকে তুলে দিলেন এক তরুণ। সুজন ছেলেকে ডান হাত দিয়ে বুকে জড়িয়ে রাখলেন। শিশুটির মাথা পেছন দিকে হেলে পড়ে আছে। আবার সেই হাতে ওই তরুণ দুটি শপিং ব্যাগ গুঁজে দিলেন। কেমন করে যেন এসবের মধ্যে বাম হাত দিয়ে আরেক শিশুকন্যার হাত ধরলেন সুজন। তারপর ছুটলেন হাসপাতালের দিকে। একসময় নরসিংদী জেলা হাসপাতালে পৌঁছে জানলেন স্ত্রী ও সন্তান দুজনই মারা গেছেন। ঈদের আগের দিন গত বুধবার রাতে নরসিংদী রেলস্টেশনে দুর্ঘটনার পর সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা যায়।

নিহতরা হলেন শিবপুর উপজেলার কারারচর এলাকার সুজন মিয়ার স্ত্রী সাথী বেগম (২৭) ও তাদের ১৮ মাস বয়সী ছেলে সাফওয়ান ওরফে হাছেন। স্বজনরা জানান, সুজন মিয়া দিনমজুর। কখনো ইজিবাইক চালিয়ে, আবার কখনো রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করে সংসার চালান। ঈদের কেনাকাটার জন্য স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে গত বুধবার নরসিংদী শহরে আসেন সুজন মিয়া। কেনাকাটা শেষে বাড়ি ফেরার জন্য রাত সাড়ে ৮টার দিকে নরসিংদী রেলস্টেশনে আসেন তারা। রেললাইন পার হয়ে হাজেরা টাওয়ারের সামনে থেকে বাড়ির উদ্দেশে অটোরিকশায় ওঠার কথা ছিল তাদের। স্টেশনে এসে তারা দেখেন, ঢাকাগামী আন্তঃনগর-মহানগর এক্সপ্রেস ট্রেন দীর্ঘক্ষণ ধরে স্টেশনের এক নম্বর প্ল্যাটফরমে থেমে আছে। অন্য অনেকের মতো তারাও মহানগরের একটি বগির দরজা দিয়ে উঠে অন্য দরজা দিয়ে নামেন।

সুজনের স্ত্রী সাথী বেগমের কোলে দেড় বছরের ছেলে হাছেন। এ সময় হাছেনকে নিয়ে প্রথমে নামেন সাথী। পাঁচ বছর বয়সী মেয়ের হাত ধরে পেছনে পেছনে যাচ্ছেন বাবা সুজন মিয়া। ওই সময়  দ্রুতগতিতে ঢাকার দিকে যাচ্ছিল আন্তঃনগর কক্সবাজার এক্সপ্রেস ট্রেনটি। ট্রেনের ধাক্কায় কোলে থাকা হাছেনসহ সাথী বেগম ছিটকে পড়ে মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাত পান। এ সময় স্ত্রীকে কাঁধে ও সন্তানকে বুকে জড়িয়ে সুজন ছোটেন হাসপাতালে। ১০০ শয্যাবিশিষ্ট নরসিংদী জেলা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন। চিকিৎসক জানান, হাসপাতালে আসার আগেই তাদের মৃত্যু হয়েছে।

স্ত্রী-ছেলেকে হারিয়ে হাসপাতাল চত্বরেই কান্নায় ভেঙে পড়েন সুজন মিয়া। বলেন, ‘চোখের সামনেই আমার অবুঝ শিশুসন্তান আর স্ত্রীকে হারালাম। ট্রেন আসতে দেখে চিৎকার করছিলাম, আটকানোরও চেষ্টা করেছি, কিন্তু কিছুই করতে পারিনি। এবার ঈদ আমি কী নিয়ে করব?’

নরসিংদী রেলওয়ে পুলিশের উপ-পরিদর্শক দিলীপ চন্দ্র সরকার জানান, স্টেশনের এক নম্বর লাইনে একটি ট্রেন দাঁড়িয়ে ছিল। এ সময় কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী কক্সবাজার এক্সপ্রেস স্টেশন অতিক্রম করছিল। ওই পরিবারটি রেললাইন পার হওয়ার সময় ট্রেনের ধাক্কায় ছিটকে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই মা ও ছেলের মৃত্যু হয়। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।