সুন্দরবনে থামছে না হরিণ শিকার

সুন্দরবনে হরিণ শিকার ও পাচারচক্রের দৌরাত্ম্য দিন দিন বাড়ছে। বনসংলগ্ন খুলনার দাকোপ, কয়রা ও শ্যামনগর এলাকায় দুই শতাধিক চিহ্নিত চোরা শিকারি ও বন্যপ্রাণী পাচারকারী সক্রিয় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অসাধু বন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে শিকারিরা সুন্দরবনে নির্বিচারে হরিণ শিকার করে মাংস বিক্রি করছেন। গত এক মাসে একাধিক অভিযানেও হরিণের মাংস জব্দ, জীবিত হরিণ উদ্ধার এবং শিকারি আটক হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তবে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া এবং টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগে বন বিভাগের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এদিকে গহিন সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, বন্যপ্রাণী ও মৎস্য সম্পদের প্রজনন সুরক্ষায় আজ থেকে টানা তিন মাসের জন্য সুন্দরবনে সব ধরনের প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে বন বিভাগ। নিষেধাজ্ঞা আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। এ সময় জেলে, বাওয়ালি, মৌয়াল এবং পর্যটক কেউই সুন্দরবনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারবেন না।

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত ১১ মে পূর্ব সুন্দরবনসংলগ্ন বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার চরদোয়ানী গ্রামে অভিযান চালিয়ে বনরক্ষরীরা সংঘবদ্ধ চোরা শিকারিদের কবল থেকে দুটি জীবিত হরিণ উদ্ধার করেন। এর পরের দিন গত ১২ মে খুলনার ডুমুরিয়ায় হরিণের মাংসসহ এক ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশ। পরে সেই মাংস ভাগ করে নেওয়া এবং ঘুষ নিয়ে অভিযুক্তকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠে দুই পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে। প্রাথমিকভাবে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় গত ১৭ মে দুপুরে পুলিশের ওই দুই সদস্যকে খুলনা পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়। প্রত্যাহার হওয়া দুই পুলিশ সদস্য হলেন কনস্টেবল মাইনুল ইসলাম ও মুছাব্বির হোসেন। তারা ডুমুরিয়া থানার শোভনা পুলিশ ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন।

ডুমুরিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আছের আলি জানান, ডুমুরিয়ার মাদারতলা এলাকা থেকে ১৫ কেজি হরিণের মাংসসহ সুফল ম-ল নামে এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। শোভনা পুলিশ ক্যাম্পের ওই দুই সদস্য পরে মামলার ভয় দেখিয়ে সুফল ম-লের কাছ থেকে বড় অঙ্গের টাকা নেন এবং মাংস ভাগাভাগি করে নেন।

এ ছাড়া গত ২৭ মে রাত সাড়ে ১০টায় পশ্চিম সুন্দরবনের কালাবগির কালসার খালপাড় এলাকায় বন বিভাগের একটি টহলদল সাদ্দাম, শফিকুল, রুবেল মোল্লা, আমজাদ মোল্লা ও শরিফুল সরদারকে আটক করে। পরে বড় অঙ্কের টাকা নিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে।

কয়রার সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা অনিমেষ ম-ল বলেন, একশ্রেণির চোরা শিকারির দৌরাত্ম্যে হুমকির মুখে সুন্দরবনের হরিণ। গত দুই বছর ধরে সুন্দরবনে হরিণ শিকারের মহোৎসব চলছে। খুলনার দাকোপ, কয়রা, শ্যামনগরে দুই শতাধিক চিহ্নিত চোরা শিকারিচক্র সক্রিয় রয়েছে। তাদের কেউ কেউ চলেন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পেশাদার শিকারিরা জেলের ছদ্মবেশে মাছ, কাঁকড়া ধরার জালের সঙ্গে দড়ি নিয়ে বনে যান। বনের ভেতরেই সেই দড়ি দিয়ে হরিণ ধরার ফাঁদ তৈরি করেন। এরপর হরিণের যাতায়াতের পথে ফাঁদ পেতে রাখেন। চলাচলের সময় হরিণ সেই ফাঁদে আটকা পড়ে। পরে বনের ভেতরে মাংস কেটে লোকালয়ে এনে বিক্রি এবং স্থানীয় পদ্ধতিতে চামড়া, মাথাসহ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংরক্ষণ করে পাচার করা হয়। শিকার শেষে ফিরে যাওয়ার সময় ফাঁদগুলো বস্তায় ভরে জঙ্গলের ভেতর মাটি খুঁড়ে পুঁতে রাখা হয়। এসব শিকারির সঙ্গে যোগাযোগ থাকে এজেন্ট-ব্যবসায়ীদের। এই এজেন্টদের মাধ্যমে অগ্রিম অর্ডার নেওয়া হয়। এই চক্রের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে যায় হরিণের মাংস। সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় প্রতি কেজি হরিণের মাংস ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় পাওয়া যায়। তবে জেলা শহরে প্রতি কেজি হরিণের মাংসের দাম ১০০০ টাকা থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত। আর একটি জীবিত হরিণের দাম চাওয়া হয় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা।

বন বিভাগের তথ্যমতে, সুন্দরবনের পূর্ব বন বিভাগের আওতাধীন শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে গত বছরের মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত হরিণ শিকারের জন্য ৬৯ জনকে আসামি করে ২২টি মামলা করেছে পূর্ব বন বিভাগ। এসব মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৬২ জনকে। অন্যদিকে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগে মামলা করেছে ৫০টি। আসামি করা হয়েছে ১৩০ জনকে। তাদের মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন ১৯ জন।

সুন্দরবন ও বাংলাদেশ উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক শুভ্র শচীন বলেন, ‘সুন্দরবনে হরিণ শিকার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। যে পরিমাণ হরিণের মাংস ও চামড়া আটক হয়, তার থেকে কয়েকগুণ বেশি হরিণ শিকার করা হয়।’

সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, ‘আমরা সুন্দরবনে হরিণ শিকার অনেক কমিয়ে ফেলেছি। বর্তমানে সুন্দরবনে সার্বক্ষণিক টহলসহ নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। যারা বৈধ পাস নিয়ে বনে যায়, তাদের নজরদারিতে রাখা হয়।’

খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, ‘সুন্দরবনকেন্দ্রিক সব ধরনের অপরাধ দমনে সচেষ্ট রয়েছেন বন কর্মকর্তা-প্রহরীরা। সম্প্রতি হরিণ শিকার রোধে বন বিভাগ নানা ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। আশা করি, আগামীতে হরিণ শিকার আরও কমে আসবে।’