শিশুর অধিকার সুরক্ষার তাগিদ

শিশুদের মধ্যে নিহিত রয়েছে একটি জাতির ভবিষ্যৎ। আজকের শিশুই আগামী দিনের বিজ্ঞানী, শিক্ষক কিংবা সমাজ সংস্কারক। তাই শিশুর সুরক্ষা, সঠিক লালন-পালন এবং মানসিক-শারীরিক বিকাশ নিশ্চিত করা শুধু পারিবারিক বা সামাজিক দায়িত্ব নয়, বরং একটি জাতীয় কর্তব্য। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের সমাজে বহু শিশু এখনো শৈশবের স্বাভাবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়ছে শিশুশ্রমের মতো নিষ্ঠুর বাস্তবতার শিকার হয়ে। দারিদ্র্য, সামাজিক অবহেলা, নিরক্ষরতা ও রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা এ সমস্যাকে জটিল থেকে জটিলতর করে তুলেছে। অথচ ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে শিশুর মৌলিক অধিকার সুরক্ষায় অত্যন্ত স্পষ্ট ও শক্তিশালী অবস্থান গ্রহণ করেছে।

রাসুল (সা.) অবহেলিত শিশুদের অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, বাসস্থান, চিকিৎসা ও বিনোদনের যথেষ্ট সুযোগ-সুবিধা দিয়ে যথার্থ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। তিনি শিশুদের প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন। শিশুদের প্রতি কোমল ব্যবহার নিজে করেছেন এবং অন্যদের সে ব্যাপারে নির্দেশ দিয়েছেন।

আধুনিক যুগে এসে শিশুশ্রমিকরা কত অবহেলিত! রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি শিশুদের স্নেহ করে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (আবু দাউদ) সমাজজীবনে বাস্তবতার নিরিখে শিশুশ্রম পুরোপুরি বন্ধ করা না গেলেও কম ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় তাদের নিয়োগ করা যেতে পারে। পাশাপাশি পড়াশোনার সুযোগও রাখতে হবে। দারিদ্র্যের কারণে শ্রম বিক্রি করতে যাওয়া শিশুদের জানাতে ও বোঝাতে হবে যে, তাদের দারিদ্র্য দূর করার মোক্ষম হাতিয়ার হলো শিক্ষা। ইসলামের বিধান হলো, পিতা অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের উপার্জনের জন্য বাধ্য করতে পারবেন না। তিনি উপার্জন করতে পারলে করবেন, নতুবা ঋণ করে তাদের খরচের ব্যবস্থা করবেন। যেন তারা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত না থাকে। প্রাপ্তবয়স্ক হলেও শিক্ষা চলাকালে পিতা তাদের খরচ চালিয়ে যাবেন। (হিন্দিয়া ১/৫৬১)

শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য ইসলামে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ। অথচ সমাজে এমন কোনো ক্ষেত্রে নেই, যেখানে শিশুদের কাজ করতে দেখা যায় না। শিশুশ্রমের ফলে শিশুদের মননশীলতা ও দৈহিক ক্ষতি হয় এবং মানসিক চাপ বাড়তে থাকে। অন্যদিকে শিশুরা আয়ের লক্ষ্যে তাদের বয়স ও লিঙ্গ অনুযায়ী বিপদ, ঝুঁকি, শোষণ ও বঞ্চনার শিকার হয়ে বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে জড়িয়ে পড়ে। চরম দারিদ্র্য ও দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার সঙ্গে নৈতিক আদর্শের বৈশিষ্ট্য এর মুখ্য কারণ। হতদরিদ্র পরিবার সংসারের ব্যয় নির্বাহে অসমর্থ হয়ে বা অভিভাবকদের কর্মহীনতার কারণে মা-বাবার স্থলে শিশুরা অর্থ উপার্জনে অগ্রসর হয়।

শিশুদের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম, যেমন অঙ্গহানি করে ভিক্ষাবৃত্তি, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানি, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানসহ নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে বাধ্য করা হয়। এ ধরনের প্রতিটি কাজ ইসলামে অবৈধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সামগ্রিকভাবে শিশুদের নিপীড়নমূলক এসব কাজ থেকে মুক্তি দিতে ধর্মীয় সচেতনতা ও সামাজিক আন্দোলনের পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারিভাবে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। ইসলামে কাউকে সামর্থ্যরে বাইরে কোনো দায়িত্বের নির্দেশ প্রদান করা হয়নি। যে শিশুদের প্রতি দয়া-স্নেহ করে না, সে মুসলমানদের মধ্যে গণ্য নয়। তাই নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘তাদের সামর্থ্যরে অধিক কাজ করাতে চাইলে তাদের সহযোগিতার হাত প্রসারিত করো এবং তাদের ওপর শক্তির অধিক কাজ চাপিয়ে দিয়ো না।’ (সহিহ বুখারি)

কোরআন-সুন্নাহর দিকনির্দেশনায় এটি সুস্পষ্ট যে, প্রতিটি শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য ইসলামে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ। শিশুশ্রমের ফলে শিশুদের মানসিক ও শারীরিক ক্ষতি হয়। তাই শিশুশ্রম বন্ধে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের একান্ত কর্তব্য। শিশুশ্রমের কারণগুলো চিহ্নিত ও উদঘাটন করে তা রোধ করা সবার ইমানি দায়িত্ব। একান্তই শিশুশ্রম বন্ধ করতে না পারলে যতটা সম্ভব শিশুর কর্মস্থল ঝুঁকিমুক্ত ও নিরাপদ করা প্রয়োজন। আর শিশুশ্রম মুক্ত দেশ গড়তে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, গণমাধ্যম, সুশীল সমাজসহ সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা খুবই প্রয়োজন।

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক গবেষক