সাদ্দামের গল্প শুনুন

বর্তমান সময়ে উচ্চশিক্ষা শেষ করে অধিকাংশ যুবক যখন চাকরির পেছনে ছুটছেন, তখন ব্যতিক্রমী এক পথ বেছে নিয়েছেন ময়মনসিংহ নগরীর কাচিঝুলি এলাকার যুবক সাদ্দাম কবির আহমেদ। হিসাববিজ্ঞান বিষয়ে মাস্টার্স সম্পন্ন করার পর কিছুদিন একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কোচিং সেন্টারে চাকরি করেছেন। পরে ছোটখাটো ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তবে চাকরি কিংবা ব্যবসায় কোথাও যেন নিজের স্বপ্নকে খুঁজে পাচ্ছিলেন না তিনি।

ছোটবেলা থেকেই কৃষিকাজ ও গবাদিপশুর প্রতি ছিল তার গভীর আগ্রহ। সেই আগ্রহই একসময় স্বপ্নে রূপ নেয়। আর আজ সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন একটি সম্ভাবনাময় গরুর খামার। তখনো জানতেন না তার সফলতা নিহিত রয়েছে ছোটবেলার স্বপ্নতেই।

ছোটবেলার স্বপ্ন

ছোটবেলা থেকেই সাদ্দামের পড়াশোনা ও বেড়ে ওঠা ময়মনসিংহ শহরেই। শহুরে জীবনে অভ্যস্ত হলেও তার মন পড়ে থাকত গ্রামের প্রকৃতি, কৃষিকাজ ও গবাদিপশুর প্রতি। তিনি বুঝতে পারেন, ময়মনসিংহ নগরী কিংবা আশপাশের এলাকায় জায়গা ক্রয় অথবা ভাড়া নিয়ে বড় পরিসরে খামার গড়ে তোলা অনেক ব্যয়বহুল। তাই খরচ কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদে পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেন নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার মেঘশিমুল এলাকায় নিজ গ্রামের বাড়ির জায়গাতেই খামার গড়ে তুলবেন।

ছোট থেকে শুরু

শুরুটা ছিল একেবারেই ছোট পরিসরে। প্রথমদিকে প্রতি বছর দুই থেকে তিনটি গরু লালন-পালন করতেন সাদ্দাম। তখন মূলত কর্মচারীদের মাধ্যমেই গরুগুলোর পরিচর্যা হতো। মাঝেমধ্যে তিনি গ্রামে গিয়ে খামারের খোঁজখবর নিতেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গবাদিপশুর প্রতি তার ভালোবাসা আরও বেড়ে যায়। তিনি বুঝতে পারেন, পরিকল্পিতভাবে এগোতে পারলে খামার হতে পারে লাভজনক ও সম্ভাবনাময় একটি উদ্যোগ। সেই ভাবনা থেকেই ২০২৩ সালের নভেম্বরে বড় পরিসরে গরুর খামার গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন সাদ্দাম।

নিজের জমানো টাকা ও বাবার কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা নিয়ে গ্রামের বাড়িতেই শুরু করেন স্বপ্নের খামার। বর্তমানে খামারের পরিধি বাড়ায় সাদ্দাম নিজেও অধিকাংশ সময় খামারেই কাটান। গরুর খাবার, পরিচর্যা, চিকিৎসা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা থেকে শুরু করে খামারের প্রতিটি কাজ নিজেই তদারকি করেন।

বর্তমানে তার খামারে মোট ২৩টি গরু রয়েছে। এর মধ্যে ২০টি ষাঁড় এবং ৩টি গাভী। প্রতিটি গরুর জন্য নিশ্চিত করা হয় আলাদা যতœ। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, পুষ্টিকর খাবার, নিয়মিত গোসল ও স্বাস্থ্যপরীক্ষার মাধ্যমে গরুগুলোকে লালন-পালন করা হচ্ছে।

সৃষ্টি হলো কর্মসংস্থানও

সাদ্দামের খামার শুধু তার স্বপ্নকেই বাস্তবায়ন করছে না। কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও বেকারত্ব দূরীকরণে ভূমিকা রাখছে। খামারে বর্তমানে স্থায়ীভাবে তিনজন শ্রমিক কাজ করছেন। এ ছাড়াও প্রয়োজন অনুযায়ী আরও দুই থেকে তিনজন অতিরিক্ত শ্রমিক কাজ করেন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত গরুর খাবার প্রস্তুত করা, ঘাস সংগ্রহ, গোয়াল পরিষ্কার ও পরিচর্যার কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয় তাদের।

খামারের কর্মচারী কামাল ম-ল বলেন, আগে গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে ধান তোলার মৌসুমে শ্রমিকের কাজ করতাম। বছরের বেশিরভাগ সময়ই বেকার থাকতে হতো। সাদ্দাম ভাই খামার শুরু করার পর এখন নিয়মিত আয়ের সুযোগ হয়েছে। এতে পরিবার নিয়ে স্বস্তিতে চলতে পারছি। সাদ্দাম ভাই খামারের প্রতিটি বিষয়ে খুব আন্তরিক। গরুগুলোর প্রতিও তার আলাদা মায়া রয়েছে। তিনি সবসময় আমাদের ধৈর্য ধরে কাজ শেখান এবং ভালোভাবে দায়িত্ব পালনের পরামর্শ দেন।

খামারের আরেক কর্মচারী আনোয়ার হোসেন বলেন, আগে আমাদের নিয়মিত কোনো কাজ ছিল না। এখন এই খামারে কাজ করে পরিবার-পরিজন নিয়ে স্বাভাবিকভাবে সংসার চালাতে পারছি। খামারটি হওয়ায় এলাকার কয়েকজন মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ভবিষ্যতে খামারটি আরও বড় পরিসরে সম্প্রসারণ করা গেলে এলাকার আরও অনেক বেকার মানুষের কাজের সুযোগ হবে। এতে স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

সাদ্দাম কবির আহমেদ বলেন, আমি সবসময় চাইতাম নিজের কিছু করতে। চাকরি করেছি, ব্যবসাও করেছি, কিন্তু কৃষি ও খামারের কাজের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি শান্তি পাই। শুরুতে পরিবারের কাছ থেকে অনেক সহযোগিতা পেয়েছি। তা না হলে এত দূর আসা সম্ভব হতো না।

তিনি আরও বলেন, পরিবার থেকে নেওয়া আর্থিক সহায়তা ধীরে ধীরে পরিশোধ করতে চাই। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে খামারটিকে আরও বড় পরিসরে গড়ে তোলার স্বপ্ন রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর একটি আদর্শ খামার গড়ে তুলতে চাই। গরু পালনের জন্য যে আধুনিক ঘর তৈরি করা হয়েছে সেখানে একসঙ্গে প্রায় ৩৫টি গরু পালন করা সম্ভব।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে সাদ্দামের পরিকল্পনা ছিল খামারের ১৮টি ষাঁড় গরু বিক্রির। তবে বাজারে আশানুরূপ দাম না পাওয়ায় বিক্রি করেছেন ১৩টি গরু। তিনি জানালেন, গত বছরের তুলনায় এ বছর কোরবানির পশুর বাজারে গরুর দাম কিছুটা কম ছিল। অন্যদিকে পশুখাদ্যসহ গরু মোটাতাজাকরণের বিভিন্ন উপকরণের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে প্রত্যাশিত মুনাফা অর্জন করা সম্ভব হয়নি।

পরিকল্পিত সংখ্যক গরু বিক্রি করতে না পারায় কয়েকটি গরু তুলনামূলক কম লাভে বিক্রি করতে হলেও করছি খামারটি লোকসানে পড়েনি। বর্তমানে খামারে আরও কয়েকটি গরু অবিক্রীত রয়েছে। সেগুলো আগামী দুই-এক মাসের মধ্যে বিক্রি করতে পারলে এ বছরের প্রকৃত আয়-ব্যয় ও মুনাফার হিসাব নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। অবশিষ্ট গরুগুলো সন্তোষজনক মূল্যে বিক্রি করতে পারলে আগামী ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে আরও বেশি সংখ্যক গরু লালন-পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করবেন বলে জানান তিনি।

শুধু গরুর খামার নয়

শুধু গরুর খামারেই সীমাবদ্ধ থাকেননি সাদ্দাম।

কৃষির বহুমুখী সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে খামারের পাশের নিজস্ব পুকুরে মাছ চাষও করছেন তিনি। এ ছাড়া পুকুরপাড় ও আশপাশের খালি জায়গায় বিভিন্ন ধরনের মৌসুমি সবজি চাষ করা হয়।

খামারের গরুর গোবর জৈব সার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা সবজি চাষে বেশ কার্যকর। এতে একদিকে যেমন উৎপাদন খরচ কমছে, অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব কৃষিব্যবস্থাও গড়ে উঠছে।

তরুণদের অনুপ্রেরণা

স্থানীয়দের মতে, শিক্ষিত তরুণদের জন্য সাদ্দাম কবির আহমেদের উদ্যোগ একটি ইতিবাচক উদাহরণ। চাকরির পেছনে না ছুটে কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতে পরিকল্পিতভাবে কাজ করলে যে সফল হওয়া সম্ভব, তার বাস্তব প্রমাণ হয়ে উঠেছেন তিনি।

তার এই সাফল্যে প্রতিবেশী ও অন্যান্য স্থানীয় অধিবাসীরাও খুব খুশি। তারা বলছেন, সাদ্দামের এই খামার শুধু একটি ব্যক্তিগত উদ্যোগ নয়;  এটি স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি

কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।