দেশের কুঁচিয়া যাচ্ছে চীনে

আপডেট : ২১ জুলাই ২০২৬, ০১:৩১ এএম

অভয়নগর উপজেলার কচুয়া গ্রামের বাসিন্দা কুমার বৈরাগী কুঁচিয়া শিকার করে হাটবাজারে বিক্রি করে সংসার চালাতেন। তিন ছেলেমেয়ে ও স্ত্রী নিয়ে কঠিন দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটত। ১০ হাজার টাকা পুঁজি বিনিয়োগ করে সাত বছর আগে কুঁচিয়া কেনাবেচার ব্যবসা শুরু করেন। এখন বাড়িতেই কুঁচিয়া সংরক্ষণ হাউজ গড়ে তুলেছেন। ওই কুঁচিয়া খুলনার রূপসা ও ঢাকার কাঁকড়া-কুঁচিয়ার আড়তে বিক্রি করেন তিনি। একই সঙ্গে কুঁচিয়া প্রক্রিয়াজাত করে রান্নার উপযোগী করেও বিক্রি করেন তিনি।

গত অর্থবছরে ১০০টি চালানের মাধ্যমে অন্তত ১০ হাজার কেজি কুঁচিয়া পাইকারি বিক্রি করেছেন তিনি। খরচ বাদে তিন লাখ টাকার বেশি মুনাফা করেছেন। প্রথম দুই বছর ভালো ব্যবসা না হলেও গত ৫ বছরে তিনি এই ব্যবসায় লাভবান হচ্ছেন। ওই লাভের টাকা থেকে বসতবাড়ির সাত শতক জমির সঙ্গে আরও সাত শতক জমি কিনে ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে আধা পাকা বাড়ি নির্মাণ করছেন তিনি।

৪৫ বছর বয়সী কুমার বৈরাগী বলেন, সাত বছর আগে ১০ হাজার টাকা দিয়ে কুঁচিয়া ব্যবসা শুরু করি। এখন প্রতি বছর খরচ বাদে তিন থেকে চার লাখ টাকা লাভ থাকে। আমার বড় ছেলেকেও ব্যবসায় নামিয়েছি। বাপ-বেটা মিলে মোটরসাইকেলে করে অন্তত ৩০টি গ্রাম ঘুরে ঘুরে কুঁচিয়া সংগ্রহ করি। প্রতিটি গ্রামের কুঁচিয়া শিকারিরা আমার কাছে বিক্রি করে। জীবিত অবস্থায় ওই কুঁচিয়া বাড়িতে স্থাপিত হাউজে সংরক্ষণ করা হয়। পরে সুবিধাজনক সময়ে খুলনা শহরের রূপসা এলাকার মৃণাল কান্তি দের আড়তে পাঠানো হয়।

কুমার বৈরাগীর টিন দিয়ে ঘেরা কাঁচা বাড়ির আঙিনায় কুঁচিয়া সংরক্ষণের একটি হাউজ করা হয়েছে। ওই হাউজে কুঁচিয়া সংরক্ষণ করা হয়। একই সঙ্গে বাড়ির উঠানে একটি টেবিল ও ওজন মিটার স্থাপন করেছেন কুমার বৈরাগী। কেউ কুঁচিয়া কেটে রান্নার উপযোগী করে নিতে চাইলে সেটাও তারা করে দিচ্ছেন। বাড়ির পাশে জমি কিনে সেখানে নতুন আধা পাকা বাড়ি নির্মাণ করছেন।

কুমার বৈরাগী বলেন, ব্যবসা বাড়ানোর জন্য গত বছর বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা নবলোক পরিষদ থেকে বাড়ির আঙিনায় বিনামূল্যে একটি হাউজ নির্মাণ করে দিয়েছে। একই সঙ্গে কুঁচিয়া কেটে বিক্রির জন্য কিছু উপকরণ ও প্রশিক্ষণ দিয়েছে। এখন ব্যবসা আরও ভালো হচ্ছে।

যশোর-খুলনা অঞ্চলের জীবন্ত কুঁচিয়া চায়না ও তাইওয়ানসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। এই কুঁচিয়া শিকার ও ব্যবসার সঙ্গে যশোর সদর, অভয়নগর, মনিরামপুর ও চৌগাছা উপজেলার এক হাজারের বেশি মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত। প্রাকৃতিক উৎস খালবিল থেকেই কুঁচিয়া শিকার করছেন মৎস্যজীবীরা। শিকার ও ব্যবসায় দিন ফিরেছে অনেকের।

নবলোক পরিষদের মৎস্য কর্মকর্তা তরুণ কুমার মোস্তফী বলেন, ‘নবলোক পরিষদের মাইক্রো এন্টারপ্রাইজ ডেভেলপমেন্ট কর্মসূচির আওতায় পিকেএসএফের আর্থিক সহায়তায় কুমার বৈরাগীকে বিনামূল্যে ব্যবসার উপকরণ সরবরাহ করা হয়েছে। ধীরে ধীরে অন্যদেরকেও আমরা এই সহায়তা করব।

তিনি বলেন, স্বাস্থ্যসম্মতভাবে ব্যবসা পরিচালনার জন্য কুমার বৈরাগীসহ অন্যদের সচেতন করা হচ্ছে। মাছ সংরক্ষণ হাউজ থেকে পানি পরিবর্তনের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। পানি পরিবর্তন না করলে দুর্গন্ধ ছড়ায়। মাছের রঙ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে দাম কমে যায়। এ বিষয়ে সচেতন করার পর কুমার বৈরাগীর ব্যবসা আরও ভালো হচ্ছে। মুনাফাও ভালো করছেন তিনি। সাত বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবসা করেছেন গত অর্থবছরে। 

এই অঞ্চলের কুঁচিয়া খুলনা ও ঢাকার আড়তের মাধ্যমে চায়না ও তাইওয়ানে পাঠানো হচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে যশোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনিরুল মামুন বলেন, গত বছর যশোর জেলায় প্রায় ২৮ মেট্রিক টনের বেশি আরোহণ করা হয়েছে। এই কাজের সঙ্গে যশোর সদর, মনিরামপুর, অভয়নগর ও চৌগাছাসহ বিভিন্ন এলাকার প্রায় এক হাজার মৎস্যজীবী জড়িত। একটি প্রকল্পের আওতায় মনিরামপুর, অভয়নগরসহ বিভিন্ন মাছের বাজারে একটি করে বিক্রয় কেন্দ্র তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। যাতে মৎস্যজীবীরা ওই কেন্দ্রের হাউজে রেখে কেনাবেচা করতে পারেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত