ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিব বাহিনীর অন্যতম সংগঠক, সাবেক মন্ত্রী, ডাকসুর সাবেক ভিপি প্রভৃতি নানা অভিধায় অভিষিক্ত হলেও তিনি নিজেকে ‘আওয়ামী লীগের তোফায়েল’ নামেই পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। বাংলাদেশের রাজনীতির নানা বাঁক-বদলের সাক্ষী, স্বনামখ্যাত রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদ আর নেই। গতকাল সোমবার রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মারা যান তিনি (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। ৮২ বছর বয়সী এ নেতা একমাত্র মেয়ে তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নীসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। স্ত্রী আনোয়ারা আহমেদ গত বছরের ২০ নভেম্বর মারা যান।
তোফায়েল আহমেদ দীর্ঘদিন প্যারালাইজডসহ অন্যান্য শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। গুরুতর অবস্থায় গত ২৮ সেপ্টেম্বর তাকে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তিনি দীর্ঘসময় চিকিংসাধীন ছিলেন।
গতকাল সোমবার বাদ মাগরিব ধানম-ির তাকওয়া মসজিদে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। তারপর মরদেহ স্কয়ার হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে। তোফায়েল আহমেদের পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে, আজ মঙ্গলবার বেলা ১১টায় শহীদ মিনারে তার মরদেহ নেওয়া হবে। সেখানে মুক্তিযোদ্ধাসহ সর্বস্তরের মানুষ শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাবেন। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) প্রক্টর (ভারপ্রাপ্ত) মো. ইসরাফিল প্রাং (ইসরাফিল রতন) জানান, তোফায়েল আহমেদের মরদেহ শহীদ মিনারে নেওয়ার বিষয়ে এখনো কোনো ধরনের লিখিত বা মৌখিক আবেদন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে করা হয়নি।
পারিবারিক সূত্র আরও জানিয়েছে, আজ বাদ জোহর ভোলা সরকারি জিলা স্কুল মাঠে তোফায়েল আহমেদের জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। পরে নিজ জন্মভূমি ভোলায় প্রয়াত স্ত্রীর কবরের পাশে তাকে দাফন করা হবে।
তোফায়েল আহমেদের রয়েছে বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন। সব মিলিয়ে এমপি হয়েছেন ৯ বার, দুই দফা মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করেছেন। সর্বশেষ তিনি ভোলা-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দীর্ঘদিন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিক জাতীয় সম্মেলনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যপদ থেকে তাকে বাদ দেওয়া হয়।
‘ওয়ান-ইলেভেন’ পরবর্তী সময়ে সংস্কাপন্থি নেতা হিসেবে অভিযুক্ত হয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য থেকে বাদ পড়েন তোফায়েল আহমেদ। এরপর থেকে তাকে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হয়ে দলে থাকতে হয়েছে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। তবে এ পদে পরিচয় দিতে তেমন আগ্রহ দেখাতেন না তিনি। ২০০৯ সালের পর থেকে প্রয়াত তোফায়েল আহমেদ গর্বের সঙ্গে পরিচয় দিতেন আমি ‘আওয়ামী লীগের তোফায়েল। এটাই আমার একমাত্র পরিচয়।’
তোফায়েল আহমেদের জন্ম ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে। ১৯৬০ সালে ভোলা সরকারি হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক ও ১৯৬২ সালে বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৬৪ সালে বিএসসি পাস করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকাবিজ্ঞানে এমএসসি সম্পন্ন করেন।
রাজনীতিতে তোফায়েল আহমেদের হাতেখড়ি হয় ছাত্রলীগের মাধ্যমে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন ১৯৬৬-৬৭ মেয়াদে ইকবাল হলের (বর্তমানে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) নির্বাচিত ভিপি ছিলেন।
১৯৬৮-৬৯ বর্ষে গণজাগরণ ও ছাত্র আন্দোলনে তোফায়েল আহমেদ ডাকসুর ভিপি হিসেবে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের কারণে শেখ মুজিবুর রহমানসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সব আসামিকে মুক্তি দেয় তৎকালীন পাকিস্তান সরকার।
কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সেই বছরেরই ২৩ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবের সম্মানে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক সভার আয়োজন করে। লাখো জনতার অংশগ্রহণে আয়োজিত ওই সম্মেলনে শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি ঘোষণা দেন তোফায়েল আহমেদ।
প্রথমবারের মতো ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয়লাভ করেন তিনি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে তিনি মুজিব বাহিনীর অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার প্রধানের একজন ছিলেন।
দেশ স্বাধীনের পরের বছর ১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিবের দায়িত্ব লাভ করেন।
পরবর্তীতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নিজের জেলা ভোলা থেকে ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করেন।
১৯৯৬ সালের ২৩ জুন তিনি শেখ হাসিনা সরকারের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। পরবর্তীতে ২০১৩-১৮ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন।
রাজনৈতিক কারণে ১৯৭৫ সাল থেকে টানা ৩৩ মাস-সহ অসংখ্যবার কারাভোগ করেন এই নেতা।
তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুর সংবাদ শুনে সোমবার বিকেল থেকে পরিবারের সদস্য, কয়েকজন কর্মী-সমর্থক স্কয়ার হাসপাতালে ছুটে যান। তাদের অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন। বিকেল ৫টার দিকে মরহেদ গোসল করানোর জন্য ধানমন্ডির মসজিদ-উত-তাকওয়ায় নেওয়া হয়। সেখানে গোসল শেষে করে বাদ মাগরিব প্রথম জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে পরিবারের সদস্য, গুণগ্রাহীদের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, জাতীয় পার্টির (একাংশ) চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স প্রমুখ।
শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, কিংবদন্তি রাজনীতিবিদ ছিলেন তিনি। ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ ওনার যে মহান অবস্থান ডাকসুর ভিপি হিসেবে এবং সেই সময় বাংলাদেশের রাজনীতির যে টানাপড়েন এবং রাজনীতির যে উত্থানপতন, সেখানে উনি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ছিলেন। অত্যন্ত সাহসী এবং নেতৃত্বশীল ব্যক্তি ছিলেন। অনল বর্ষী বক্তা ছিলেন, ছিলেন অসাধারণ পার্লামেন্টারিয়ান।’
তিনি আরও বলেন, ‘দলমত-নির্বিশেষে সবারই তাকে শ্রদ্ধা জানানো উচিত। জাতি এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হারাল।’
তোফায়েল আহমেদের জানাজা শেষে ‘জয় বাংলা’ সেøাগান দেওয়াকে কেন্দ্র করে পাঁচজনকে আটক করেছে পুলিশ। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, জানাজা শেষ হওয়ার পর প্রায় অর্ধশতাধিক ব্যক্তি ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে শুরু করেন। এ সময় মসজিদ ও আশপাশের এলাকায় আগে থেকেই অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ধাওয়া দিয়ে পাঁচজনকে আটক করে।
তবে আটক ব্যক্তিরা দাবি করেন, তারা কোনো রাজনৈতিক কর্মী নন; শুধু জানাজার নামাজে অংশ নিতে এসেছিলেন। ঘটনাস্থলে দায়িত্বে থাকা রমনা বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার জিসানুল হক বলেন, তারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছিলেন। যাদের আটক করা হয়েছে, তারা সবাই স্লোগান দিচ্ছিলেন। তাদের থানায় নেওয়া হচ্ছে। সেখানে যাচাই-বাছাই করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় পার্টি, জাতীয় পার্টি (একাংশ), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন।
শোক বিবৃতিতে জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামে বিএলএফের অন্যতম সংগঠক হিসেবে তোফায়েল আহমেদের ভূমিকা বাংলাদেশের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকবে। স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, বাঙালির আত্মমর্যাদা ও জনগণের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তার অবদান জাতি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। তিনি ছিলেন সংগ্রামী রাজনৈতিক চেতনার এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। তার প্রজ্ঞা, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও আপসহীন মনোভাব নতুন প্রজন্মের জন্য দীর্ঘদিন অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।