শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। গতকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বরাবর পাঠানো এক চিঠিতে তিনি পদত্যাগের আবেদন করেন। তার আবেদন প্রধানমন্ত্রী গ্রহণ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের এক সদস্য বিষয়টি দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছেন।
দীপেন দেওয়ান চিঠিতে লিখেছেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তিনি নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন। এর ফলে মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত কাজ ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে সমস্যা হচ্ছে।
চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান শারীরিক অবস্থার কারণে দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখা তার পক্ষে কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। তাই তিনি পদ থেকে অব্যাহতি চান। তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগপত্র গ্রহণের জন্য বিনীত অনুরোধ জানান।
মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, ‘অসুস্থতার কারণে মন্ত্রী ঈদের আগে এক সপ্তাহ অফিস করতে পারেননি। অসুস্থতা বেড়ে যাওয়ায় তিনি প্রধানমন্ত্রী বরাবরে পদত্যাগের আবেদন করেছেন।
পদত্যাগপত্রে অসুস্থতার কথা উল্লেখ করা হলেও দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্থানীয় বিভিন্ন ইস্যুতে প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে দীপেন দেওয়ানের দ্বন্দ্বের কারণে পদত্যাগপত্র দিয়ে থাকতে পারে বলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে। এ বিষয়ে জানতে প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের মোবাইল ফোনে কল করলে তিনি সাড়া দেননি। খুদেবার্তা পাঠালেও তার উত্তর দেননি। এদিকে চট্টগ্রাম বিভাগের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, চট্টগ্রামের বিভিন্ন ইস্যুতে প্রতিমন্ত্রী তার প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। বিষয়টি অনেকেই ভালো চোখে দেখছেন না।
রাঙ্গামাটি বিএনপির নেতারা বিস্মিত : রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি জানান, রাঙ্গামাটি আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করায় বিস্মিত স্থানীয় বিএনপির নেতারা। মন্ত্রী পদত্যাগপত্রে শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করলেও নেতারা তা বিশ্বাস করতে পারছেন না। তিনি কেন পদত্যাগ করলেন এ নিয়ে চলছে জল্পনা-কল্পনা।
মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত জেলা বিএনপি সহসভাপতি অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম পনির বলেছেন, ‘আমরা খবরটা শুনে অবাক হয়ে গেছি। আমাদের কল্পনাতেও নেই যে, এমন সিদ্ধান্ত উনি নিতে পারেন। আমাদের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি, পরামর্শও করেননি। আর উনার শারীরিক অবস্থাও এমন নয় যে, পদত্যাগ করতে হবে, উনি সব কাজই করছিলেন।’
পদত্যাগের কারণ কী হতে পারে সে সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের কিছু বিষয় নিয়ে সম্ভবত তার মধ্যে অস্বস্তি ছিল, জেলা পরিষদ পুনর্গঠন নিয়েও কিছু থাকতে পারে। এ ছাড়া ছাত্রদলের কমিটি গঠন কিংবা অন্যান্য আরও বিষয়ও থাকতে পারে, আমি নিশ্চিত কিছু জানি না। কথা বলতে পারলে বুঝতে পারতাম। কিন্তু এ সিদ্ধান্ত নেওয়াটা সম্ভবত ঠিক হয়নি।’
রাঙ্গামাটি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মামুনুর রশীদ মামুন বলেছেন, ‘আমি শুনে বিশ্বাসই করতে পারিনি প্রথমে। কেন তিনি এমনটি করলেন, বুঝতেই পারছি না। উনার শারীরিক অবস্থা যতটুকু জানি, এমন নয় যে পদত্যাগ করতে হবে। আর যদি কোনো মান-অভিমান বা অন্য কোনো কারণ থাকে, তিনি জেলা বিএনপি ও নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে পারতেন, সেটিও করেননি। আমি বুঝতে পারছি না, কি থেকে কি হলো।’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নে রাঙ্গামাটি আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন দীপেন দেওয়ান। নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে সর্বাধিক ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন তিনি। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান দুই লাখ এক হাজার ৫৪৪ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী পহেল চাকমা ফুটবল প্রতীকে পান ৩১ হাজার ২২২ ভোট। নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় তিনি পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান। একই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে চট্টগ্রাম-৫ আসনের সংসদ সদস্য মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে।
দীপেন দেওয়ানের বাবা সুবিমল দেওয়ান ছিলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদায়)। সুবিমল দেওয়ান রাঙ্গামাটি জেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদক ও পরে জেলা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
দীপেন দেওয়ান ছাত্রাবস্থায় ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। সপ্তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়ে জুডিশিয়াল সার্ভিসে যোগ দেন। নির্বাচন সামনে রেখে ২০০৬ সালে যুগ্ম জেলা জজের চাকরি ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেন। কিন্তু আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে নির্বাচন করতে পারেননি। ২০১০ সালে রাঙ্গামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি হন। ২০১৬ সাল থেকে তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ধর্মবিষয়ক সহসম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
২০২৪ সালের আগস্ট অভ্যুত্থানে দীপেন দেওয়ান সক্রিয় ছিলেন। দীর্ঘ এক যুগ পর রাঙ্গামাটি থেকে পূর্ণ মন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ায় বিএনপির নেতাকর্মী ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখা দেয়। এর আগে ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত এ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন রাঙ্গামাটি জেলার সাবেক সংসদ সদস্য দীপংকর তালুকদার।