ঘটনার ১৫ দিনের মধ্যে বিচার শুরু

রাজধানীর পল্লবীতে ৭ বছর বয়সী শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্নার আক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগ (চার্জ) গঠন করেছে আদালত। গতকাল সোমবার ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন অভিযোগ গঠন করে তাদের বিচার শুরুর আদেশ দেন। আজ মঙ্গলবার আসামিদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হবে। এর মধ্য দিয়ে ঘটনার ১৫ দিনের মধ্যে এবং অভিযোগপত্র দাখিলের ৯ দিন পর চাঞ্চল্যকর এ মামলার বিচারকাজ শুরু হলো।

এদিকে মামলার প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা এই হত্যাকা-ের দায় চাপাচ্ছেন ডলার নামে এক ব্যক্তির ওপর। গতকাল বিচার শুরুর আদেশের পর এজলাস থেকে তাকে হাজতখানায় নিয়ে যাওয়ার সময় সোহেল বলেন ‘আমি শুধু রামিসাকে দুই টুকরো করেছি। ধর্ষণ ও হত্যা করেছে ডলার নামে মিরপুর ১১ নম্বর এলাকার এক ধনাঢ্য ব্যক্তি।’ ওই ব্যক্তি তাকে দুই লাখ টাকাও দিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। তার স্ত্রী স্বপ্না নির্দোষ বলেও এ সময় দাবি করেন আসামি সোহেল।

তার এমন বক্তব্যে এই মামলায় নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে কি না এমন প্রশ্নে রাষ্ট্রপক্ষে নিযুক্ত বিশেষ কৌঁসুলি আজিজুর রহমান দুলু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অবশ্যই না’। তিনি বলেন, আসামি সোহেল এরই মধ্যে আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। তিনি সাক্ষ্যগ্রহণের পর আত্মপক্ষ সমর্থন করে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পাবেন। এর বাইরে গণমাধ্যমের সামনে আসামি যেভাবে কথা বলেছেন, সেটা অবৈধ। এর কোনো গুরুত্ব নেই। আজিজুর রহমান বলেন, ‘নৃশংস অপরাধীরা ঘটনার পর অপরাধের চিহ্ন মুছে ফেলার চেষ্টা করে এবং তদন্ত কার্যক্রমকে ভিন্ন দিকে নিতে তৃতীয় কোনো পক্ষকে দায়ী করার চেষ্টা করে। আসামি সোহেল সেই চেষ্টাই করেছেন।’

গত ১৯ মে দুপুরে পল্লবীর একটি ফ্ল্যাট থেকে রামিসার গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নৃশংস এই ঘটনায় সারা দেশে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়। দোষীদের কঠোর বিচারের দাবিতে দেশজুড়ে আন্দোলন হয়। সরকারের তরফে তখন এ মামলার বিচার দ্রুত শেষ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

পুলিশের ভাষ্য, ঘটনার দিন সকালে পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা সোহেল শিশুটিকে গলা কেটে হত্যার পর মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এরপর বাসার গ্রিল কেটে পালিয়ে যান। তবে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার ঘরেই ছিলেন। তখন পুলিশ স্বপ্নাকে গ্রেপ্তার করে এবং ওই দিন সন্ধ্যায় সোহেলকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করে। সোহেল ও স্বপ্নাকে আসামি করে পল্লবী থানায় মামলা করেন নিহত রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা। সোহেল আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দেন। মাত্র পাঁচ দিনে তদন্ত শেষ করে গত ২৪ মে সোহেল ও স্বপ্নার বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান। দ্রুত বিচার করতে ওই দিনই মামলাটি বিচারের জন্য প্রস্তুত হয়।

অভিযোগ গঠন শুনানির জন্য গতকাল সকালে আসামি সোহেলকে কেরানীগঞ্জে অবস্থিত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার এবং স্বপ্নাকে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষে বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আজিজুর রহমান দুলু অভিযোগ গঠনের পক্ষে শুনানি করেন। রামিসাকে নৃশংসভাবে হত্যার বিবরণ দিয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আরজি জানান তিনি। অন্যদিকে আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মুসা কালিমূল্যাহ আসামিদের অব্যাহতি চেয়ে শুনানিতে বলেন তড়িঘড়ি করে এ মামলার তদন্ত শেষ করা হয়েছে। পুলিশ কোনো প্রত্যক্ষদর্শী উপস্থাপন করতে পারেনি।

উভয়পক্ষের আইনজীবীদের শুনানি শেষে বিচারক মাসরুর সালেকীন আসামি সোহেলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ পড়ে শোনান। এ সময় কথা বলতে আদালতের অনুমতি চান সোহেল। তবে আদালত তাতে সায় দেয়নি। একপর্যায়ে অপর আসামি স্বপ্নার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ পড়ে শোনান বিচারক। তাতে বলা হয় স্বপ্না হত্যাকা-ে জড়িত ছিলেন এবং রামিসাকে হত্যায় বাধা না দিয়ে আলামত নষ্টে সহযোগিতা করেছেন, যা হত্যার অপরাধের সহায়তা হিসেবে গণ্য হয়। একপর্যায়ে বিচারক স্বপ্নার কাছে জানতে চান, তিনি (স্বপ্না) দোষী না নির্দোষ। এ সময় স্বপ্না কাঁদতে থাকেন। তিনি স্বামীর উদ্দেশে বলেন, ‘আমি দোষী কি না, তুমি বলো।’ এ সময় সোহেল আদালতের উদ্দেশে বলেন, ‘স্বপ্না নির্দোষ’। শুনানি শেষে আদালত দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে মঙ্গলবার সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করেন।

‘সব দোষ ডলারের’ : বেলা সাড়ে ১১টার কিছু পর স্বপ্নাকে হাজতখানায় নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় পুলিশ পরিবেষ্টিত আসামি সোহেল বলতে থাকে ‘আমি ধর্ষণ করি নাই, শুধু লাশ কাটছি। ধর্ষণ করেছে ডলার। আমি পাপ করছি, আমাকে সেই পাপের শাস্তি দেন।’ আদালত থেকে কারাগারে নেওয়ার সময় সোহেল সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলতে থাকেন ‘মিরপুর-১১ নম্বর লাইনে ডলারের বাড়ি। রামিসাকে ধর্ষণ-হত্যার মূল হোতা এই ডলার। ধর্ষণ ডলার করেছে, মারছেও ডলার। ওরে ধরেন আপনারা, সব পাবেন।’ তিনি বলেন, ‘আমার ওয়াইফ আমাকে সহযোগিতা করেনি। তার কোনো দোষ নেই। আমি শুধু বাচ্চারে দুই টুকরা করছি।’ সোহেল আরও বলেন, ‘আমার কোনো ডিএনএ টেস্ট নেয়নি। অটোমেটিক নিয়ে নিছে। ডলার আমাকে দুই লাখ টাকা দিছে। ডলার অনেক ধনী লোক।’

জবানবন্দিতে যা বলেছিলেন সোহেল : গত ২০ মে রামিসা হত্যা মামলায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন সোহেল। তিনি বলেন, ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রামিসা ঘর থেকে বের হলে তার স্ত্রী স্বপ্না তাকে (রামিসা) রুমের ভেতরে নিয়ে যায়। এরপর বাথরুমে নিয়ে রামিসাকে ধর্ষণ করেন সোহেল। এর মধ্যে রামিসার মা দরজায় কড়া নাড়তে থাকেন। তখন সোহেল তাকে গলা কেটে হত্যা করেন। পরে মরদেহ গুমের জন্য তার মাথা আলাদা করেন। এরপর দুই হাত কাঁধ থেকে আংশিক বিচ্ছিন্ন করে মরদেহ বাথরুম থেকে শয়নকক্ষে এনে খাটের নিচে রাখেন। ঘটনার সময় তার স্ত্রী একই রুমে ছিলেন। পরে জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যান তিনি।