দুই সপ্তাহে কমে আসতে পারে হামের রোগী

হামের উপসর্গে একদিনে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে দেশে হামজনিত মৃত্যু হয়েছে ৫৮৮ শিশুর। এর মধ্যে ৯০ জন হামে মারা গেছে বলে নিশ্চিত হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বাকি ৪৯৮ জন হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে হামের প্রকোপ দেখা দেয়। কিন্তু এটি আলোচনায় আসে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর মার্চে, রাজশাহীতে কয়েকজন শিশুর মৃত্যুর খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলে। এর মধ্যে হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। কারণ হাম-ভাইরাস অতি সংক্রমণী ভাইরাস। সরকার হাম প্রতিরোধে তড়িঘড়ি করে টিকা দেওয়া শুরু করে। অল্প কয়েক দিনের মধ্যে প্রায় ২ কোটি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আগামী দুই সপ্তাহে হামের সংক্রমণ কমতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামে মানুষের মৃত্যু হয় না। কিন্তু এবার ইতিমধ্যে হামে প্রায় ছয়শ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বেশির ভাগেরই হাম থেকে নিউমোনিয়া হয়ে মৃত্যু হয়েছে। এ জন্য রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকা এবং পুষ্টিহীনতার কথা বলেছেন বিশেষজ্ঞরা।

হাম নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার ৫ এপ্রিল ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় টিকা দেওয়া শুরু করে। ১২ এপ্রিল শুরু করে চারটি সিটি করপোরেশন এলাকায়। ২০ এপ্রিল সারা দেশে টিকা দেওয়া শুরু হয়। ১৯ মে পর্যন্ত ১ কোটি ৯৭ লাখ ৮ হাজার ২৪৮ জনকে টিকা দেওয়া হয়। সব জায়গায় শতভাগের ওপরে কাভারেজ হলেও রংপুরে কাভারেজ হয়েছে ৯৮ শতাংশ।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘টিকা দেওয়ার পর প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে তিন সপ্তাহ সময় লাগে। আশা করা যায়, এরপর আক্রান্তের সংখ্যা কমে আসবে।’

জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জীবাণুবিদ (লিড ভাইরোলজিস্টএনপিএমএল ল্যাব) ডা. খন্দকার মাহবুবা জামিল বলেন, ‘এখন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। তবে ইতিমধ্যে যারা আক্রান্ত হয়েছে, তাদের রোগলক্ষণ প্রকাশ পেতে ১০ থেকে ১৪ দিন সময় লাগে। ওইটা এখন বাড়ছে। আরও দুই সপ্তাহ পরে দেখবেন, ইনশাআল্লাহ কমে যাবে। ইতিমধ্যে সংক্রমণের হার অনেকটাই কমেছে।’

এত শিশুর মৃত্যু নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন নানা কারণের কথা। তারা মোটা দাগে ছয়টি কারণ উল্লেখ করেছেন। এক, শিশুদের ভ্যাকসিন না পাওয়া; দুই, ঠিকমতো পুষ্টিকর খাবার খাচ্ছে, কি খাচ্ছে না তা নিশ্চিত নয়; তিন, ভিটামিন এ ক্যাপসুল খেয়েছে কিনা তাও নিশ্চিত নয়; চার, মা শক্তিশালী কিনা কিংবা পুষ্টিহীনতায় ভুগছে কি-না সে বিষয়ক তথ্যের অভাব; পাঁচ, সবকিছু মিলিয়ে যে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক কম, তার হাসপাতালের পরিবেশে টিকে থাকাও কঠিন। কেননা এনভায়রনমেন্ট ভালো না। সারাক্ষণ হসপিটালের ওয়ার্ডে থাকছে, ওই ভাইরাস সেখানে সার্কুলেট হচ্ছে। ফ্রেশ বাতাস নেই। যেটা হয়তো গ্রামের বাড়িতে আছে। এ সব কারণে হাসপাতালে ভর্তিকৃত বাচ্চাগুলো মারা যাচ্ছে; ছয়, অনেক সময় হাসপাতালে ভর্তিকৃত শিশুরা যথেষ্ট পরিমাণে অক্সিজেন পাচ্ছে না। এ সব কারণে এই মৃত্যুগুলা ঘটছে।

ডা. খন্দকার মাহবুবা জামিল বলেন, ‘যে শিশুগুলো মারা গেছে, তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক কম ছিল। সাধারণত হামে মানুষ মারা যায় না। কিন্তু রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি কমে গেলে মারা যায় যা খুবই দুঃখজনক।’

একেবারে কম বয়সীদের আক্রান্ত হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মেজেলস (হাম) ভাইরাস দেখবে না, কে ছোট আর কে বড়। দেখবে কার শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। সুতরাং ১২ দিনের নবজাতকের যদি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে, তাহলে সেও আক্রান্ত হবে। আমাদের এনভায়রনমেন্টে এত বেশি ভাইরাস ঘুরছে, যে স্বাভাবিকভাবে যেটা আমরা এক্সপেক্ট করি না।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘একটি বিষয় আমাদের অবশ্যই মাথায় রাখা দরকার। প্রতি বছর ৩৪ লাখ শিশু জন্মগ্রহণ করে। এবার যেটি দেখা গেছে, টিকা দেওয়ার বয়স হওয়ার আগেই শিশুরা হামে আক্রান্ত হয়েছে। সাধারণত জন্মের ৯ মাসে আগে টিকা দেওয়া হয়। কারণ ৯ মাস পর্যন্ত মায়ের গর্ভ থেকে পাওয়া ইমিউনিটিতে হামের সংক্রমণ প্রতিরোধ করা যায়। কিন্তু এখন সেটি করছে না। কারণ হয়তো মায়ের টিকা নেওয়া নেই। মায়ের যদি হামের টিকা নেওয়া না থাকে, তাহলে শিশুও হামের ম্যাটার্নাল ইমিউনিটি পাবে না। আর ম্যাটার্নাল ইমিউনিটি না পেলে সেই শিশু জন্মের পরই ঝুঁকিতে পড়বে। সেজন্য উচিত হবে বিবাহিত মেয়েদের টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করা। তাদের যদি টিকা দেওয়া যায়, তাহলে তার গর্ভের সন্তানও ৯ মাস ইমিউনিটি পাবে। তবে গর্ভ ধারণকালে টিকা দেওয়া যাবে না।’

এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে ডা. খন্দকার মাহবুবা জামিল বলেন, ‘মা যদি তার শিশুকালে কিংবা কখনো হামের ভ্যাকসিন নিয়ে থাকেন তবে, সেই মায়ের শরীরে এন্টিবডি তৈরি হবে, যেটা তার প্লাসেন্টা দিয়ে ওই বাচ্চার শরীরে যাবে। অনেক পরিমাণ এন্টিবডি যায়। আবার ওই বাচ্চাটা যখন বুকের দুধ খায় তখনো যায়। কিন্তু এই দুইটা জিনিসের যদি ঘাটতি থাকে, মায়ের শরীরেও এন্টিবডি যদি না থাকে, আর বাচ্চাটাও যদি ঠিক মতো বুকের দুধ পান না করে তখন ওই বাচ্চার ইমিউনিটি গ্যাপ হবেই। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকবে। হয়তো সে পুষ্টিকর খাবারও পাচ্ছে না। ছোট শিশুর নির্দিষ্ট পরিমাণ খাবার দরকার, দুই ঘণ্টা-তিন ঘণ্টা পর পর। সে যদি এটাও না পায় তাহলে তার শক্তিও হবে না, ভাইরাস তখন শরীরের মধ্যে ঢুকবে এবং ইনফেকশন করবে।’

গত ১৫ মার্চ থেকে ১ জুন পর্যন্ত ৭৮ দিনে ৫৮৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ দিনে গড়ে সাড়ে সাতজনের বেশি মারা গেছে। এ পর্যন্ত হামের উপসর্গের রোগী পাওয়া গেছে ৭২ হাজার ৭০ জন। দিনে গড়ে ৯২৪ জন হামের উপসর্গের রোগী পাওয়া গেছে। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৫৭ হাজার ৯০২ জন। দিনে গড়ে ৭৪২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। হাম শনাক্ত হয়েছে ৯ হাজার ৯৪ জনের অর্থাৎ দিনে গড়ে ১১৬ শিশু শনাক্ত হয়েছে। গতকাল পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি ছিল ৪ হাজার ১৮০ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রথম ১৯ দিনে শতাধিক মৃত্যু হয়েছে, ৩২ দিনে মৃত্যু ২০০ ছাড়ায়, ৫০ দিনে ছাড়ায় ৩০০, ৫৬ দিনে চার শতাধিক এবং ৬৯ দিনে পাঁচ শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ৭৮তম দিনে পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ৫৮৮ জনের।

গত ১৫ মার্চ থেকে হামের তথ্য সংগ্রহ শুরু করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ৩ এপ্রিল পর্যন্ত ১৯ দিনে মৃত্যু হয়েছে ১০৩ জনের। এর মধ্যে ৯ জন হামে এবং ৯৪ জন হামের উপসর্গে মারা গেছে। ওই পর্যন্ত উপসর্গের রোগী পাওয়া যায়, ৫ হাজার ৭৯২ জন। হাম শনাক্ত হয় ৭৭১ জনের। হাসপাতালে ভর্তি হয় ৩ হাজার ৭৭৬ জন।

১৬ এপ্রিল পর্যন্ত ৩২ দিনে ২০৮ জনের মৃত্যু হয়। এদের মধ্যে ৩৪ জন হামে এবং ১৭২ জন হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্তি মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হানের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ১৫ মার্চ সকাল ৮টা থেকে ১৬ এপ্রিল সকাল ৮টা পর্যন্ত হাম-সন্দেহজনক রোগী ২০ হাজার ৩৫২ জনে দাঁড়ায়। নিশ্চিত হাম রোগী ৩ হাজার ৬৫ জন। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১৩ হাজার ১২৯ জন এবং ছাড়পত্র পেয়েছে ১০ হাজার ৪৯৬ জন।

৪ মে পর্যন্ত ৫০ দিনে হামজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৩১১ জন। এরমধ্যে হামে ৫২ ও হামের উপসর্গ নিয়ে ২৫৯ শিশুর মৃত্যু হয়। হামের উপসর্গের রোগী পাওয়া গেছে ৪১ হাজার ৭৯৩ জন। সন্দেহজনক হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২৮ হাজার ৮৪২ জন। হাম শনাক্ত হয়েছে ৫ হাজার ৪৬৭ জনের। সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে ২৫ হাজার ১৫১ জন।

১০ মে পর্যন্ত ৫৬ দিনে ৪০৯ জনের মৃত্যু হয়। উপসর্গের রোগী পাওয়া যায় ৪৯ হাজার ১৫৯ জন, হাম শনাক্ত হয় ৬ হাজার ৮১৯ জনের, হাসপাতালে ভর্তি হয় ৩৪ হাজার ৯০৯ জন।

২৩ মে পর্যন্ত ৬৯ দিনে ৫১২ জনের মৃত্যু হয়। উপসর্গের রোগী পাওয়া যায়, ৬২ হাজার ৫০৭ জন। হাম শনাক্ত হয়েছে ৮ হাজার ৪৯৪ জনের। হাসপাতালে ভর্তি হয় ৪৯ হাজার ৩৮৯ জন। হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে ৪৫ হাজার ১১ জন। ওই দিন পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি ছিল ৪ হাজার ৩৭৮ জন।