তাওহিদের বাস্তবায়নই হজের বড় অর্জন

সব প্রশংসা আল্লাহর। তিনি হাজিদের জন্য হজ সহজ করে দিয়েছেন এবং তাদের জন্য ইবাদতের নিয়মগুলো সাবলীল করেছেন। আমরা কেবল সেই মহান সত্তারই প্রশংসা করি এবং তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি, যিনি তাদেরকে নিজ রহমতে আবৃত করেছেন এবং তাদের যাবতীয় বিষয়ের দায়িত্ব নিয়েছেন।

হে লোকসকল! আমি নিজেকে এবং আপনাদের সবাইকে আল্লাহভীতির উপদেশ দিচ্ছি। আপনারা মহান আল্লাহকে ভয় করুন, তিনি আপনাদের প্রতি দয়া করবেন। তার ইবাদত করুন এবং তার কৃতজ্ঞতা আদায় করুন। তার কাছেই আপনাদের প্রত্যাবর্তন করতে হবে। সারা জীবন একনিষ্ঠভাবে তার ইবাদত করুন। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘তোমার প্রতিপালকের ইবাদত করতে থাকো, যতক্ষণ না তোমার কাছে নিশ্চিত বিষয় (মৃত্যু) এসে যায়।’ (সুরা হিজর ৯৯)

হে মুসলিম সম্প্রদায়! হে আল্লাহর ঘরের হাজিরা! হজের আনুষ্ঠানিকতাগুলো প্রায় শেষের দিকে এসে পৌঁছেছে। অনেকেই এখন নিজ নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন পবিত্র স্থানগুলোতে অশ্রু বিসর্জন ও দোয়া- মোনাজাত করার পর। সুতরাং ধন্য সেই ব্যক্তি, যে এই পবিত্র ভূমিতে, এই মহিমান্বিত সময়গুলোতে তাকবির, জিকির ও দোয়ার মাধ্যমে এসব বরকতময় দিনকে কাজে লাগিয়েছে।

আপনারা মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করুন। তিনি আপনাদের সর্বোত্তমভাবে হজের বিধান পালন করার  তৌফিক দিয়েছেন। তিনি আপনাদের মনোনীত করেছেন, আপনাদের মর্যাদা দিয়েছেন এবং তার বহু সৃষ্টির ওপর আপনাদের শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। কত আকাক্সিক্ষত মানুষ ছিল, যারা গভীর আগ্রহে এই স্থানগুলোতে আসতে চেয়েছিল, কিন্তু তাদের পা এখানে পৌঁছানোর সৌভাগ্য লাভ করেনি। আবার কত গাফেল মানুষকে আল্লাহ তার প্রজ্ঞা ও ইচ্ছানুযায়ী এসব পবিত্র স্থানে পৌঁছানো থেকে বিরত রেখেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যদি তারা বের হওয়ার ইচ্ছা করত, তবে তারা তার জন্য সরঞ্জাম প্রস্তুত করত। কিন্তু আল্লাহ তাদের বের হওয়াকে অপছন্দ করলেন, ফলে তিনি তাদেরকে পিছিয়ে দিলেন। আর বলা হলো, তোমরা বসে পড়া লোকদের সঙ্গে বসে থাকো।’ (সুরা তওবা ৪৬)

হে মুসলমানরা! হজ শিক্ষা ও উপদেশে ভরপুর। এটি ঘটনাবহুল, মূল্যবান রতেœ সমৃদ্ধ। এটি এক ইমানি সফর এবং এক আল্লাহ প্রদত্ত শিক্ষালয়, যেখানে মুমিন ব্যক্তি উচ্চতর মূল্যবোধ ও মহান চরিত্র শিক্ষা লাভ করে। যেমন ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ব, আত্মত্যাগ, মানুষের উপকার করা, ক্রোধ সংবরণ, মানুষকে ক্ষমা করা, দানশীলতা, বিনয় এবং কষ্টের ওপর ধৈর্য ধারণ।

এই মহান ইবাদত থেকে একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো তাওহিদের বাস্তবায়ন। এর সর্বোচ্চ রূপ, এর মহত্তম অর্থ ও উদ্দেশ্য হলো মহান আল্লাহর দাসত্বের মাধ্যমে তার কাছে আত্মসমর্পণ করা, আনুগত্যের মাধ্যমে তার অনুসরণ করা এবং শিরক ও শিরককারীদের থেকে সম্পর্কমুক্ত থাকা।

তালবিয়ার সেøাগানই হলো, ‘হে আল্লাহ! আমি হাজির, আমি হাজির। আপনার কোনো শরিক নেই, আমি হাজির। নিশ্চয়ই সব প্রশংসা, সব নেয়ামত এবং সব রাজত্ব আপনারই। আপনার কোনো শরিক নেই।’ (সহিহ বুখারি)

আরাফার দিনের শ্রেষ্ঠ দোয়া হলো, ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তিনি একক, তার কোনো শরিক নেই। রাজত্ব তারই, প্রশংসা তারই এবং তিনি সবকিছুর ওপর সর্বশক্তিমান।’ (তিরমিজি)

অতএব, হে আল্লাহর বান্দারা! এরপরও কি একজন মুমিনের জন্য শোভা পায় যে, সে ফিরে গিয়ে কোনো ওলির মাজার বা কোনো শায়খের কবরের দোরগোড়ায় আশ্রয় নেবে, তার কাছে আরোগ্য, সন্তান বা সাহায্য প্রার্থনা করবে? এর মাধ্যমে সে নিজের গড়া ভিত্তিই ধ্বংস করবে এবং যা প্রতিষ্ঠা করেছে তা ভেঙে ফেলবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সেই নারীর মতো হয়ো না, যে মজবুতভাবে সুতা পাকানোর পর তা টুকরো টুকরো করে খুলে ফেলে।’ (সুরা নাহল ৯২)

অথচ তারা নিজেরাও নিজেদের কোনো উপকার বা ক্ষতি করতে পারে না, অন্যেরও পারে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা আল্লাহ ছাড়া এমন উপাস্য গ্রহণ করেছে, যারা কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না, বরং নিজেরাই সৃষ্ট, তারা নিজেদের কোনো ক্ষতি বা উপকারও করতে পারে না এবং তারা মৃত্যু, জীবন কিংবা পুনরুত্থান করতেও সক্ষম নয়।’ (সুরা ফুরকান ৩)

মহান আল্লাহ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আদেশ করেছেন, তিনি যেন সব মানুষকে বলেন, ‘আমি আমার নিজের কোনো উপকার ও ক্ষতির ক্ষমতা রাখি না, তবে আল্লাহ যা চান। আর আমি যদি গায়েব জানতাম তাহলে অধিক কল্যাণ লাভ করতাম এবং আমাকে কোনো ক্ষতি স্পর্শ করত না। আমি তো একজন সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা এমন কওমের জন্য, যারা বিশ্বাস করে।’ (সুরা আরাফ ১৮৮)

তাহলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পর অন্য কোনো ওলির মর্যাদা কোথায়? সুতরাং হে আল্লাহর বান্দারা! আল্লাহকে ভয় করুন। এই মহান নেয়ামতের (হজ) মর্যাদা উপলব্ধি করুন এবং এর কৃতজ্ঞতা আদায় করুন। হজের পরও সৎপথে অবিচল থাকার চেষ্টা করুন। কেননা, কবুল হজের অন্যতম লক্ষণ ও গ্রহণযোগ্যতার নিদর্শন হলো এই যে, হাজি আরও বেশি আল্লাহভীরু হৃদয় এবং আরও উন্নত চরিত্র নিয়ে ফিরে আসে।

 আমি নিজের জন্য, আপনাদের জন্য এবং সব মুসলমানের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আপনারাও তার কাছে ক্ষমা চান। নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু।

হে আল্লাহর বান্দারা! আপনারা নবীজি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর দরুদ ও সালাম পাঠ করুন, যেমনটি আপনাদের রব নির্দেশ দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তার ফেরেশতারা নবীর প্রতি দরুদ পাঠ করেন। হে ইমানদাররা! তোমরাও তার প্রতি দরুদ ও যথাযথভাবে সালাম পাঠ করো। (সুরা আহজাব ৫৬) এখানে নবীজির প্রতি মহান আল্লাহর দরুদ পাঠ করার অর্থ হলো, আল্লাহ নবীজির প্রতি অনুগ্রহ করেন।

হে আল্লাহ, আপনি আপনার বান্দা ও রাসুল মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর রহমত ও শান্তি বর্ষণ করুন। চার খলিফা আবু বকর, ওমর, ওসমান ও আলী (রা.)-এর ওপর সন্তুষ্ট হোন। উম্মুল মুমিনিনরা এবং সব সাহাবি ও তাবেয়িদের ওপর রহমত নাজিল করুন। হে আল্লাহ, ইসলাম ও মুসলিমদের মর্যাদা দান করুন। দ্বীনের সীমানাকে রক্ষা করুন। একত্ববাদী বান্দাদের সাহায্য করুন। মুসলিমদের অন্তরগুলোকে জুড়ে দিন এবং তাদের কাতারগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করুন। এ দেশসহ সব মুসলিম দেশগুলোকে নিরাপদ ও শান্তিময় করে দিন।

হে আল্লাহ! ইসলাম ও মুসলমানদের মর্যাদা দান করুন। আপনার একত্ববাদী বান্দাদের সাহায্য করুন। চিন্তাগ্রস্তদের দুশ্চিন্তা দূর করুন। বিপদগ্রস্তদের কষ্ট লাঘব করুন। ঋণগ্রস্তদের ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করুন। আমাদের রোগীদের এবং সব মুসলমান রোগীদের আরোগ্য দান করুন।

হে আল্লাহ! আমাদের দেশকে নিরাপদ রাখুন। আমাদের শাসকদের সংশোধন করুন। আমাদের দায়িত্বশীলদের সঠিক পথে পরিচালিত করুন।

হে আল্লাহ! পৃথিবীর সর্বত্র নির্যাতিত মুসলমান ভাইদের জন্য আপনি সাহায্যকারী, সমর্থনকারী ও সহযোগী হোন। হে পরাক্রমশালী, হে শক্তিধর! আপনার শত্রু ও তাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে তাদের বিজয় দান করুন।

হে আল্লাহ! আমাদের দেশের নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা, সমৃদ্ধি এবং আমাদের সৈন্যদের নিরাপদ রাখুন। ষড়যন্ত্রকারীদের ষড়যন্ত্র এবং আগ্রাসনকারীদের আগ্রাসন থেকে আমাদের দেশকে এবং সব মুসলিম দেশকে রক্ষা করুন। হে বিশ্বজগতের প্রতিপালক! হাজিদের হজ কবুল করুন। তাদের সব বৈধ চাওয়া পূরণ করুন। হে আমাদের প্রতিপালক! তাদের আশা-আকাক্সক্ষা পূর্ণ করুন এবং তাদেরকে নিরাপদে, সফলভাবে ও কবুল হওয়া হজের মর্যাদা নিয়ে নিজ পরিবারে ফিরিয়ে দিন।

হে সর্বাধিক দয়ালু! হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে দুনিয়ায় কল্যাণ দান করুন এবং আখেরাতেও কল্যাণ দান করুন। আর আমাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন। (সুরা বাকারা ২০১)

২৯ মে শুক্রবার, মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবা। শ্রুতিলিখন ও ভাষান্তর করেছেন

মুফতি আতিকুর রহমান