হিংসার কুফল

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২৬, ০৭:৪২ এএম

মানুষের নানা ধরনের মানবিক গুণাবলি রয়েছে। রয়েছে কুপ্রবৃত্তি ও মানসিক ব্যাধিও। আত্মিক ব্যাধির মধ্যে সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক হলো হিংসা। আরবিতে একে ‘হাসাদ’ বলা হয়। সাধারণ অর্থে হিংসা হলো অন্যের সুখ, সমৃদ্ধি, সম্মান বা কোনো নেয়ামত দেখে ধ্বংস কামনা করা। মানব চরিত্রের এই নিকৃষ্টতম দোষটি সমাজ ও ব্যক্তির শান্তি সম্পূর্ণরূপে নষ্ট করে দেয়। ইসলাম একে একটি মারাত্মক গুনাহ ও আত্মিক ব্যাধি হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং তা থেকে বেঁচে থাকার জন্য কঠোর নির্দেশ দিয়েছে।

প্রথম পাপের সূচনা হয়েছিল হিংসার কারণে। ইবলিস হজরত আদম (আ.)-এর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব দেখে হিংসার বশবর্তী হয়ে আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করেছিল, যার ফলে সে চিরতরে অভিশপ্ত হয়ে যায়। একইভাবে পৃথিবীর বুকে প্রথম হত্যাকাণ্ড অর্থাৎ আদম (আ.)-এর পুত্র কাবিল কর্র্তৃক হাবিলকে হত্যার মূল কারণও ছিল এই হিংসা।

কোনো মানুষকে কোনো নেয়ামত বা সম্মান দান করা সম্পূর্ণ আল্লাহর নিজস্ব ফয়সালা ও অনুগ্রহ। তাই কোনো ব্যক্তির ওপর হিংসা করার অর্থ হলো পরোক্ষভাবে আল্লাহর সেই বণ্টন ও ফয়সালার ওপর অসন্তুষ্টি প্রকাশ করা, যা একজন মুমিনের ইমানের পরিপন্থী। মুমিন বান্দার বৈশিষ্ট্য হলো সে আল্লাহর প্রতিটি সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকবে। পবিত্র কোরআনের একেবারে শেষের দিকে সুরা ফালাকে মহান আল্লাহ আমাদের একটি বিশেষ দোয়া শিখিয়েছেন, যেখানে হিংসুকের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ওই আয়াত থেকে প্রমাণিত হয়, হিংসা কতটা বিপজ্জনক হতে পারে। হিংসুক ব্যক্তি যখন তার ক্ষোভ ও হিংসা প্রকাশ করে, তখন সে অন্যের ক্ষতি করার জন্য যেকোনো সীমা লঙ্ঘন করতে পারে। তাই হিংসুকের কুদৃষ্টি, যাদু বা যেকোনো ধরনের ক্ষতি থেকে বাঁচতে আল্লাহর দরবারে আশ্রয় প্রার্থনা করা অত্যন্ত জরুরি।

পবিত্র কোরআনের পাশাপাশি অনেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) হিংসার ক্ষতিকর দিকগুলো উম্মতের সামনে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা অবশ্যই হিংসা পরিহার করবে। কারণ আগুন যেভাবে কাঠকে বা ঘাসকে খেয়ে ফেলে, তেমনি হিংসাও মানুষের নেক আমলকে খেয়ে ফেলে।’ (সুনানে আবু দাউদ ৪৯০৩)

একজন মানুষ অত্যন্ত কষ্ট করে নামাজ, রোজা, সদকা বা অন্যান্য ইবাদতের মাধ্যমে যে পুণ্য অর্জন করে, অন্তরের সামান্য হিংসার কারণে সেই বিশাল পুণ্যভাণ্ডার নিমেষেই হারিয়ে যেতে পারে। হিংসা মানুষের অন্তরকে এমনভাবে কলুষিত করে যে, সেখানে ইবাদতের স্বাদ বা আল্লাহর ভয় অবশিষ্ট থাকে না। হিংসা ব্যক্তির আমলই নষ্ট করে না, পাশাপাশি পারস্পরিক সামাজিক বন্ধন ও ভ্রাতৃত্ববোধকে চিরতরে ভেঙে চুরমার করে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য কঠোর তাগিদ দিয়ে বলেছেন, ‘তোমরা খারাপ ধারণা করা থেকে বেঁচে থাকো। কেননা, খারাপ ধারণা প্রসূত বিষয় সর্বাপেক্ষা মিথ্যা। আর তোমরা ছিদ্রান্বেষণ করো না, গোয়েন্দাগিরি করো না, সুপ্তদোষ অনুসন্ধান করো না, তোমরা পরস্পর লিপ্সা করো না, পরস্পর পরস্পরের প্রতি শত্রুতা করো না, হিংসা করো না, একে অন্যের পেছনে লেগে থেকো না। তোমরা সবাই আল্লাহর বান্দা হিসেবে ভাই ভাই হয়ে যাও।’ (সহিহ মুসলিম ২৫৬৩)

ইসলামে হিংসাকে সম্পূর্ণ হারাম করা হলেও একটি বিশেষ ক্ষেত্রে পরশ্রীকাতরতাহীন ঈর্ষা বা প্রতিযোগিতা করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যাকে ইসলামে ‘গিবতাহ’ বলা হয়। গিবতাহ হলো অন্যের কোনো বিশেষ গুণ বা নেয়ামত দেখে নিজের মনেও তেমনটি পাওয়ার আকাক্সক্ষা করা, তবে ওই ব্যক্তির নেয়ামত ধ্বংস হোক, এমন কামনা না করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কেবল দুটি বিষয়ে ঈর্ষা করা বৈধ। এক. সেই ব্যক্তির উপর, যাকে আল্লাহ সম্পদ দিয়েছেন, অতঃপর তাকে বৈধ পন্থায় অকাতরে ব্যয় করার ক্ষমতা দিয়েছেন। দুই. সেই ব্যক্তির ওপর, যাকে আল্লাহ প্রজ্ঞা দান করেছেন, অতঃপর সে তার মাধ্যমে বিচার ফায়সালা করে এবং তা অন্যকে শিক্ষা দেয়।’ (সহিহ বুখারি ৭৩)

এ ধরনের ঈর্ষা মানুষকে ভালো কাজের দিকে ধাবিত করে এবং সমাজে কল্যাণের পথ সুগম করে। কিন্তু এর বাইরে জাগতিক ধন-সম্পদ, বাড়ি-গাড়ি, পদমর্যাদা বা সৌন্দর্যের কারণে অন্যের প্রতি হিংসা পোষণ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। হিংসা মূলত মানুষের অন্তরে অহংকার ও ক্ষোভের জন্ম দেয়, যা একজন মানুষকে ক্রমশ আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়।

লেখক : শিক্ষক ও ধর্মীয় নিবন্ধকার, আসাম, ভারত

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত