সমাজকে টিকিয়ে রাখে পারস্পরিক আস্থা, সম্মান ও সৌহার্দ্য। কিন্তু কিছু অভ্যাস আছে, যা বাইরে থেকে তুচ্ছ মনে হলেও ধীরে ধীরে মানুষে মানুষে দূরত্ব তৈরি করে, সম্পর্ক নষ্ট করে এবং সামাজিক বন্ধনকে দুর্বল করে দেয়। গিবত ও অপবাদ তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর। যাচাইহীন কথা, মিথ্যা অভিযোগ কিংবা কারও অনুপস্থিতিতে তার দোষচর্চা কখনো কখনো এমন ক্ষতি ডেকে আনে, যা বছরের পর বছরেও পূরণ করা যায় না। তাই ইসলাম ব্যক্তি ও সমাজকে সুরক্ষিত রাখতে এসব ধ্বংসাত্মক অভ্যাস থেকে কঠোরভাবে সতর্ক করেছে।
গিবত : রাসুলুল্লাহ (সা.) গিবতের সংজ্ঞা দিয়ে বলেছেন, ‘তোমার ভাইয়ের এমন কোনো বিষয় উল্লেখ করা, যা সে অপছন্দ করে; তাই গিবত।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলে তিনি আরও ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘যদি সেই দোষ তার মধ্যে সত্যিই থাকে, তবে তা গিবত আর যদি না থাকে, তবে তা অপবাদ।’ (সহিহ মুসলিম)
এই সংজ্ঞা থেকেই বোঝা যায়, গিবত কোনো অস্পষ্ট নৈতিক অপরাধ নয়, বরং একটি সুস্পষ্ট সীমা লঙ্ঘন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, অনেকেই সত্য বলার আত্মতুষ্টির আড়ালে গিবত করে যাচ্ছে। নিজ স্বার্থ হাসিলের জন্য মুসলিম ভাইয়ের বদনাম করে বেড়াচ্ছে আর বলছে যে আমি কি মিথ্যা বলেছি? সত্যই তো বলেছি। অথচ ইসলাম সত্য বলাকেও শর্তসাপেক্ষ করেছে; সত্য হতে হবে কল্যাণকর, ন্যায়ের পক্ষে এবং প্রয়োজনীয়।
পবিত্র কোরআনে গিবতের ভয়াবহ রূপক এমন ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে, যা মানুষের বিবেককে নাড়িয়ে দেয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণ করতে পছন্দ করবে? নিশ্চয়ই তোমরা তা ঘৃণা করো।’ (সুরা হুজুরাত ১২)
এখানে গিবতকে শুধু হারাম বলা হয়নি, বরং মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণের মতো জঘন্য কাজের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। কারণ গিবতের শিকার ব্যক্তি অনুপস্থিত; সে আত্মপক্ষ সমর্থনও করতে পারে না।
অপবাদ দেওয়া : গিবতের চেয়েও ভয়াবহ অপরাধ হলো অপবাদ। কাউকে এমন দোষ আরোপ করা, যা আদৌ তার মধ্যে নেই। পবিত্র কোরআনের ভাষায় একে বলা হয়েছে ‘বুহতান’, যা মানুষকে স্তম্ভিত করে দেয় এমন মিথ্যা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের ওপর অপবাদ আরোপ করে, অথচ তারা তা করেনি; তারা তো এক গুরুতর মিথ্যা ও প্রকাশ্য গুনাহ বহন করল।’ (সুরা আহজাব ৫৮)
লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও প্রবন্ধকার