অর্থনৈতিক টানাপড়েন ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ পড়ে এ বছর কোরবানিতে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কমেছে। ফলে ঈদ উপলক্ষে কোরবানিযোগ্য ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি গবাদি পশু প্রস্তুত থাকলেও বিক্রি হয়নি ৩০ লাখ। এতে লোকসানে পড়েন মৌসুমি ব্যবসায়ী ও খামারিরা। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র এ তথ্য জানা গেছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় পশু কোরবানির পরিমাণও কমেছে বলে জানান বিশ্লেষকরা।
জানা গেছে, এ বছর কোরবানিযোগ্য পশু ছিল ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি। বিপরীতে চাহিদা নির্ধারণ করা হয় ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি পশুর। তবে পশু কোরবানি হয়েছে ৯৩ লাখের কিছু বেশি, যা গত বছর ছিল ৯১ লাখ। গত বছরের চেয়ে কিছুটা কোরবানি বেশি হলেও এতে মানুষের আর্থিক চাপের বিষয়টি উঠে এসেছে।
ঢাকা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বাসনা আখতার জানান, সদ্য শেষ হওয়া কোরবানির ঈদে ঢাকায় প্রায় ৯ লাখ ৬২ হাজার পশু কোরবানি করা হয়েছে, যা গত বছর ছিল ৯ লাখ ৮০ হাজার। গত বছরের তুলনায় ১৮ হাজার কম কোরবানি হয়েছে। একইভাবে ময়মনসিংহ বিভাগে কোরবানিযোগ্য পশু ছিল ৫ লাখ ৬০ হাজার। ময়মনসিংহ বিভাগীয় পশুপালন দপ্তরের পরিচালক ডা. মনোরঞ্জন ধর জানান, এ বছর আনুমানিক কোরবানি হয়েছে ৩ লাখ ৭০ হাজারটি পশু। তবে এটি এখনও চূড়ান্ত তথ্য নয়।
ময়মনসিংহ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ ওয়াহেদুল আলম জানিয়েছেন, এবার জেলায় কোরবানির পশুর চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ লাখ ৮০ হাজার। প্রাথমিক হিসাবে কোরবানি হয়েছে ১ লাখ ৩৫ হাজারটি পশু। একইভাবে জানা গেছে, খুলনা বিভাগে পশু কোরবানি হয়েছে ৮ লাখ ৪৬ হাজার পাঁচটি পশু, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৪২ হাজার বেশি। তবে তা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। একইভাবে চট্টগ্রাম, বগুড়াসহ বিভিন্ন জেলার তথ্যগুলো থেকে জানা গেছে, সব স্থানেই চাহিদার চেয়ে কম পশু কোরবানি হয়েছে।
এ বিষয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. শাহজামান খান জানান, মাঠপর্যায় থেকে এখনো তথ্য সংগ্রহ চলছে। দুয়েক দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ তালিকা হয়ে যাবে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। অন্যদিকে পশুখাদ্যসহ উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় কোরবানির পশুর দামও বেড়েছে। ফলে অনেক মানুষ কোরবানি করতে পারেননি। আবার অনেকেই একা ও বড় পশু কোরবানির চেয়ে শরিক বা ভাগে কোরবানি করেছেন। এতে কোরবানি কমেছে।
ঢাকার ভাটারার ছোলমাইদ এলাকার নর্থ বেঙ্গল ডেইরি ফার্মের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মকবুল হোসেন বলেন, এবার ভাগে কোরবানি বেড়েছে। গতবার আমাদের খামার থেকে যে পরিমাণ ভাগে কোরবানি হয়েছিল, তার তুলনায় এবার হয়েছে দ্বিগুণের বেশি। এ ছাড়া অনেকে কোরবানিও করেননি। খামার থেকে প্রতিবার গরু নেন কিংবা ভাগে কোরবানি করতেন এমন অনেক ক্রেতাকে পেয়েছি, যারা এবার কোরবানি করেননি।
একদিকে সাধারণ মানুষের সক্ষমতা কমে যাওয়ায় কোরবানি কমেছে। এতে খামারিরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অন্যদিকে ঈদের আগ মুহূর্তে বৃষ্টি এবং ক্রেতা কম থাকায় কোরবানির পশুর দামও কমে যায়। এতে খামারিরা লোকসানে পশু বিক্রি করতে বাধ্য হন। কারণ, ঢাকায় আসা-যাওয়া এবং থাকার যে খরচ, তার চেয়ে লোকসানে বিক্রি করে যাওয়াটাকেই ভালো মনে করেছেন তারা। খামারি ও ব্যাপারীরা বলছেন, ঈদের আগের বৃষ্টি ও কাদার কারণে হাটে গরু রাখলে সেগুলো অসুস্থ হয়ে পড়ার ঝুঁকি ছিল। তাই অনেকেই লোকসান মেনে নিয়ে গরু বিক্রি করেছেন। কেউ কেউ দাবি করেছেন, কোনো কোনো গরুতে লাখ টাকাও লোকসান গুনতে হয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ থেকে ২১টি গরু নিয়ে ঢাকার শাহজাহানপুর হাটে এসেছিলেন পয়স্বিনী অ্যাগ্রোর স্বত্বাধিকারী কাজী আলাউদ্দিন তারেক। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, গরুগুলো বিক্রি হয়ে গেছে। তবে এ বছর ভালো দাম পাইনি। যে পরিমাণ খাবার খাইয়েছি, ওই হিসাব ধরলে লোকসান হয়েছে। হাট থেকে গরু ফেরত নিলে বেশি লোকসান হয়, তাই কিছু কমেই বিক্রি করেছি।
বাংলাদেশ ডেইরি অ্যান্ড ফ্যাটেনিং ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, খামারিরা এবার কোরবানিতে যে পরিমাণ পশু বিক্রির জন্য বাজারে তুলেছেন, তার মধ্যে বড় একটি অংশ অবিক্রীত রয়েছে। ২০২৫ সালের শেষ দিক থেকে কোরবানির আগ পর্যন্ত গো খাদ্যের দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ছিল। কিন্তু খামারিরা গত বছরের দামে গরু বিক্রি করেছেন। ঈদের দুয়েক দিন আগে দাম আরও কমে যায়।