ক্ষমা করো মা...

এটি একটি মর্মান্তিক কাহিনি। নিঃসঙ্গ জীবনে অযতœ-অবহেলায় পড়ে থাকা এক বৃদ্ধ মায়ের করুণ মৃত্যুর খবর। রাজধানীর মিরপুরের বাসা থেকে গত রবিবার রাতে নুরজাহান বেগম নামের ৭৫ বছর বয়সী এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে পল্লবী থানা পুলিশ। সন্তানরা জানেন না, তাদের মা কখন মারা গেছেন। মৃত্যুর খবরেও ছুটে আসেননি তারা। বাঙালি জীবনে একজন মায়ের এমন নির্মম মৃত্যুর খবর সামাজিক মাধ্যমে রীতিমতো ঝড় তুলেছে।

মা-সন্তানের সম্পর্কের কথা উঠলেই বাঙালির মনে যে চিত্রকল্প ভেসে উঠে, তাতে মনে পড়ে ঈশ^রচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মায়ের ডাকে ছুটে আসার গল্প। নুরজাহান বেগমের কাহিনি তার ঠিক বিপরীত। অসুস্থ মায়ের ডাক শুনে কিশোর ঈশ্বরচন্দ্র বাড়ি যাওয়ার জন্য রওনা হন। অফিস থেকে ছুটি না পেয়ে তিনি চাকরিই ছেড়ে দেন। সন্ধ্যায় দামোদর নদের তীরে পৌঁছে দেখেন কোনো খেয়া নৌকা নেই! কিন্তু মায়ের কাছে পৌঁছানোর অদম্য টানে তিনি খরস্রোতা ও বিপদসংকুল নদ সাঁতরে পার হন এবং ঝড়-বাদলের রাতে বীরসিংহ গ্রামে মায়ের কাছে পৌঁছান। কিন্তু নুরজাহান বেগমের ডাক কেউ শুনেননি, ছুটেও আসেননি। অথচ নুরজাহান বেগম জীবনের সবকিছু দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন তার চার সন্তানকেই।

যেভাবে পড়ে ছিল মায়ের মরদেহ : রাজধানীর মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনের সি ব্লকের ১৩ নম্বর সড়কের ৮নং বাড়ির ৫ম তলার নোংরা ময়লাযুক্ত একটি কক্ষ থেকে গত রবিবার রাতে নুরজাহানের মরদেহ উদ্ধার করে পল্লবী থানা পুলিশ।

দুই বেডরুমের ওই ফ্ল্যাটটি তার মেয়ে ফাতেমা নাসরিন সুলতানার। ২০০৮ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে নুরজাহান মেয়ের সঙ্গে থাকেন। পাশাপাশি কক্ষে তারা বসবাস করতেন । ফাতেমার স্বামী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। মারা গেছেন প্রায় ৫ বছর আগে। ফাতেমা নিঃসন্তান। ফাতেমাই রান্না করতেন। মায়ের কক্ষে খাবার রেখে আসতেন। খাবার দেওয়া ছাড়া মায়ের কক্ষে তেমন যেতেন না তিনি। তাই মা কখন মারা গেলেন, তা বুঝতে পারেননি। রবিবার ডাকাডাকি করেও মায়ের সাড়াশব্দ না পেয়ে স্থানীয় একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নার্স তামান্নাকে ডেকে আনেন। তামান্না পরীক্ষা করে করে দেখেন, নুরজাহান বেগম আর বেঁচে নেই। পরে তারা ৯৯৯-এ কল করে পুলিশকে জানান।

ওই বাসার প্রতিবেশী লোকমান শেখ জানান, ৯৯৯-এ কল পেয়ে পুলিশ এলে তাদের সঙ্গে এলাকাবাসীও ওই বাসায় প্রবেশ করেন। কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করে মনে হয়েছে এটি কোনো বাসা নয়, যেন পুরো ময়লার স্তূপ। নুরজাহান যে কক্ষে থাকতেন, সেই কক্ষে কোনো মানুষই ২ থেকে ৩ ঘণ্টার বেশি থাকতে পারবে না। তার মরদেহ আমরা নিচে নামাতে পারছিলাম না। শরীর থেকে মাংস খুলে পড়ছিল।

মায়ের মৃত্যু এবং লাশ পচে, গলে, পোকা ধরে গেলেও এ নিয়ে কিছুই বলতে পারেন না মেয়ে ফাতেমা। এ নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে পুলিশ মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হতে নুরজাহানের মরদেহ ময়নাতদন্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়।

লাশের নির্মম বিবরণ : ময়নাতদন্তের আগে মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদেন তৈরি করে পুলিশ। প্রতিবেদনে নুরজাহান বেগমের নির্মম মৃত্যুর বিবরণ উঠে আসে। এতে উল্লেখ করা হয় তার পরনে কালো পেটিকোট, গায়ে সাদা চাদর ছিল।  দীর্ঘদিন শুয়ে থাকায় ঘাড়ে ও পিঠে পচন ধরেছে এবং পচন ধরা অংশে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। নাক ও চোখ দিয়ে পোকা ঢুকে ভিড় ভিড় করছে। শরীর থেকে পচে যাওয়া মাংস খসে পড়ছে।

তারা সবাই সুপ্রতিষ্ঠিত : নুরজাহান বেগমের চার সন্তান। সবাইকে তিনি পড়ালেখা করিয়েছেন, সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। এই মায়ের এক ছেলে সরকারের যুগ্ম সচিব; নাম ড. এ. কে. এম. আনিসুর রহমান। বর্তমানে কর্মরত মোংলা বন্দরের সদস্য (প্রকৌশল ও উন্নয়ন) হিসেবে। মেজো ছেলে আশিকুর রহমান; বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ^বিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক। ছোট ছেলে আতিকুর রহমান কানাডাপ্রবাসী। আর একমাত্র মেয়ে ফাতেমা নাসরিন সুলতানা; পল্লবীর একটি স্কুলের শিক্ষিকা।

নুরজাহানের মেজো ছেলে আশিকুর রহমান স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বুয়েট কোয়ার্টারে থাকেন। একই শহরে থাকলেও তিনি মায়ের কোনো খোঁজ নিতেন না। মায়ের মৃত্যুর খবরে অবশেষে ওই বাসায় যান। তবে মরদেহ ময়নাতদন্ত করাতে বাধা দেন আশিকুর রহমানের শ^শুরবাড়ির লোকজন।

মায়ের মৃত্যুর খবরেও আসেননি বড় ছেলে যুগ্ম সচিব ড. এ. কে. এম. আনিসুর রহমান। তার মায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিবেদন না করতে এই প্রতিবেদককে অনুরোধ করেন। তার দাবি, তার মায়ের কোনো রোগ ছিল না, বার্ধক্যজনিত কারণে মা মারা গেছেন।

গত সোমবার সন্ধ্যার পর গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর উত্তর মতলব এলাকায় নুরজাহানের মরদেহ দাফন করা হয়। মায়ের শেষ বিদায় দাফনেও উপস্থিত হননি, কবরে একমুঠো মাটি দেওয়া দিতে যাননি আনিসুর। এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার একমাত্র বোন একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে। সকালে সে অফিসে যাওয়ার সময় স্থানীয় লোকজন তার ওপর ক্ষিপ্ত হন, তাকে মারতে উদ্যত হন। তাই আমরা কেউ যেন মায়ের বিষয়ে মিডিয়ায় কথা না বলি বোন নিষেধ করেছে। আমরা চাই না, ওর (বোনের) ওপর এলাকাবাসী চাপ প্রয়োগ করুক। ও আপাতত এক আত্মীয়ের বাসায় গিয়ে থাকবে। তিনি বার বার এ বিষয়ে কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ না করার অনুরোধ করেন।

সরেজমিন যা দেখা গেল : সরেজমিন গিয়ে যা দেখা যায়, পাঁচতলা ভবনের ওই বাসায় প্রতি তলায় দুটি করে ইউনিট রয়েছে। সিঁড়ি বেয়ে উঠতেই ৫ম তলার ডান হাতের ওই ফ্ল্যাটে থাকতেন তারা মা-মেয়ে। দরজা খুলতেই বিকট দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। পুরো বাসাজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায় ময়লা-আবর্জনা। ছত্রাকে ভরা। পোকা-মাকড়ের বসবাস। দেখেই বোঝা যায় দীর্ঘদিন ওই বাসায় কোনো ঝাড়মুছ দেওয়া হয়নি। যেই কক্ষের বেডের ওপর ওই বৃদ্ধার লাশ পড়ে ছিল, সেটা একটা ছোটখাটো ময়লা কাপড়-চোপড়ের ভাগাড়। ওই পরিবেশে কোনো সুস্থ মানুষ থাকতে পারেন না বলে দাবি স্থানীয়দের।

খাটের ওপর একটি গামলার মধ্যে তিনটি মগ, প্লাস্টিক শৌচাগার, কাগজপত্র, ময়লা দুর্গন্ধযুক্ত কাপড়-চোপড়। মাথার পাশে একটি ছোট টেবিলের ওপর কিছু বইপত্র পড়ে রয়েছে। এ ছাড়া খাটের পাশেই পড়ে আছে ওষুধের খোলা, ব্যবহৃত রঙের বোতল, ছেঁড়াফাটা কার্টন, পানির বোতল প্রভৃতি।

ভবনের বাসিন্দারা জানান, তারা কখনও বৃদ্ধাকে দেখেননি। শিক্ষিকা ফাতেমা নাসরিন সুলতানাকে মাঝেমধ্যে দেখতেন। নুরজাহান বেগমের কোনো ছেলেকেও ওই বাসায় আসতে দেখেননি। ফাতেমার বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, তিনি তার মাকে শনিবার রাতেও খাওয়ানোর পর ঘুমিয়েছে। ওই রাতেই তার মৃত্যু হতে পারে বলে মেয়ের ধারণা।

জানা গেছে, বয়সের ভারে ন্যুয়ে পড়া নুরজাহান শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। গত দুই দিন তিনি পুরো বেড ধরা হয়ে পড়েন। এতে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে পচন ধরে।

এ ঘটনায় পল্লবী থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই শামসুর রহমান বলেন, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন আসতে সময় লাগবে। তবে নুরজাহান বেগমের মৃত্যু যে অবহেলাজনিত কারণে হয়েছে, এটা তো এমনেই বলা যায়। না খাইয়ে রাখা হতো ওনাকে। মাঝেমধ্যে হয়তো খাবার দেওয়া হতো। ওনার সন্তানদের জিজ্ঞাসা করেছি, তবে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

ওই ভবনের কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই চাকচিক্য ভবনের মধ্যে এই ঘুনে ধরা দৃশ্য সত্যিই অবাক করেছে তাদের। এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। স্থানীয় বাসিন্দা আকবর আলী জানান, সকালে ওই বৃদ্ধার মেয়ে স্কুলে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে বের হলে তিনি এলাকাবাসীর তোপের মুখে পড়েন। পরে আশপাশে গা-ঢাকা  দেন তিনি।

জীবনের প্রথম কান্না থেকে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দিয়ে সন্তানের পাশে থাকেন একমাত্র মা। অথচ সে মায়ের এমন করুণ মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না এলাকাবাসী। সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে ছেয়ে গেছে নিন্দার ঝড়। সন্তানদের অবস্থান তুলে ধরে এমন ন্যক্কারজনক ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন অসংখ্য ফেসবুক ব্যবহারকারী। কেউ কেউ বলছেন এমন প্রতিষ্ঠিত সন্তান কি কাজে আসে, যদি মায়ের সেবাই না করে। কেউ লিখেছেন এদের (সন্তানদের) আইনের আওতায় আনা হোক। আবার কেউ লিখেছেন ‘ক্ষমা করো মা’।