আল্লাহর কুদরতের অনন্য নিদর্শন মাকামে ইবরাহিম

কাবাঘরের চারপাশে ছড়িয়ে আছে আল্লাহর নানা নিদর্শন। এসব নিদর্শনের মধ্যে অন্যতম হলো মাকামে ইবরাহিম। এটি নবী ইবরাহিম (আ.)-এর ত্যাগ ও মহান আল্লাহর অসীম কুদরতের জীবন্ত সাক্ষী। এই পাথরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কাবা নির্মাণের ইতিহাস, হজের ঘোষণা এবং কোটি কোটি মুমিনের হৃদয়ের আবেগ। যুগের পর যুগ ধরে মাকামে ইবরাহিম মুসলমানদের মনে নবী ইবরাহিম (আ.)-এর স্মৃতিকে জাগ্রত রেখেছে এবং তাদের ইমানকে করেছে আরও দৃঢ়।

হজরত ইবরাহিম (আ.) এই পাথরে দাঁড়িয়ে কাবাঘর পুনর্নির্মাণ করেছিলেন। নির্মাণের উচ্চতার প্রয়োজন অনুপাতে পাথরটিও উঁচু-নিচু হতো। পাথরটিতে রয়েছে ইবরাহিম (আ.)-এর মোবারক পায়ের ছাপ। (মাআরিফুল কোরআন ২/১০৩)

একটি শক্ত জড়বস্তুর প্রয়োজনানুসারে উঁচু-নিচু হওয়া ও কাদামাটির মতো নরম হয়ে নিজের মধ্যে পদচিহ্ন গ্রহণ করা, এগুলো নিঃসন্দেহে মহান আল্লাহর কুদরতের অনন্য নিদর্শন। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘এতে (কাবাগৃহে) রয়েছে সুস্পষ্ট নিদর্শনাদি, এরমধ্যে একটি হলো মাকামে ইবরাহিম।’ (সুরা আলে ইমরান ৯৭)

জান্নাতি পাথর : মাকামে ইবরাহিম জান্নাতি পাথর। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই হাজরে আসওয়াদ ও মাকামে ইবরাহিম জান্নাতের ইয়াকুত (দীপ্তিশীল মূল্যবান) পাথরসমূহের অন্তর্ভুক্ত। মহান আল্লাহ এ দুটির জ্যোতি নিস্তেজ করে দিয়েছেন। তিনি যদি এগুলোর আলো মøান না করতেন, তবে এ দুটো পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত সমগ্র পৃথিবীকে আলোকিত করে দিত।’ (জামে তিরমিজি ৮৭৮)

ইবরাহিম (আ.)-এর আহ্বান : বাইতুল্লাহর নির্মাণকাজ সমাপ্ত করার পর মহান আল্লাহ ইবরাহিম (আ.)-কে আদেশ করেন, যেন তিনি পৃথিবীবাসীকে হজের জন্য আহ্বান করেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আপনি মানুষের মাঝে হজের ঘোষণা দিন, তারা আপনার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং ক্ষীণকায় উটে চড়ে দূর-দূরান্ত থেকে।’ (সুরা হজ ২৭)

এই পাথরের ওপর দাঁড়িয়েই ইবরাহিম (আ.) হজের ঘোষণা দেন। তার এই আহ্বান মহান আল্লাহ কুদরতিভাবে পৃথিবীর আনাচে-কানাচে, এমনকি কেয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ পৃথিবীতে আসবে, সবার কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন। যাদের হজ পালনের সৌভাগ্য হয়েছে বা হবে, এমন প্রত্যেক ব্যক্তি সেদিন এই আহ্বানের জবাবে ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ বলেছিলেন। (ইবনে কাছির ৫/৪৪১)

মাকামে ইবরাহিমের বর্তমান অবস্থান : প্রথমে এই বরকতময় পাথরটি কাবাঘরের ভেতরে রাখা ছিল। ইসলামপূর্ব সময়ে এটিকে কাবার বাইরে দরজার কাছে এনে রাখা হয়। ইসলাম আগমনের পর মহান আল্লাহ মাকামে ইবরাহিমকে নামাজের স্থান বানানোর আদেশ দেন, তখন পাথরটিকে দরজা থেকে সরিয়ে কাবাগৃহের সামান্য দূরে স্থাপন করা হয়। বর্তমানে এটি কাবা শরিফের প্রায় ১০ মিটার দূরে একটি কাচের গম্বুজে সংরক্ষিত আছে।

মাকামে ইবরাহিমে নবীজির নামাজ : বিদায় হজের তওয়াফের পর নবীজি (সা.) কাবার দিকে মুখ করে এভাবে নামাজ পড়েছেন যে, তার এবং কাবাঘরের মাঝে মাকামে ইবরাহিম ছিল। (সহিহ বুখারি)

হজ ও ওমরাহর তাওয়াফ শেষে দুই রাকাত নামাজ পড়া ওয়াজিব। এ দুই রাকাত মাকামে ইবরাহিমের পেছনে আদায় করা সুন্নত। যদি কোনো কারণে এটা সম্ভব না হয়, হারামের সীমানার ভেতরে অন্য কোথাও আদায় করে নেবে। হারামের সীমানার বাইরে এ নামাজ পড়া অনুত্তম। (মানাসিকে মোল্লা আলি কারি ১৫৫-১৫৭)

মাকামে ইবরাহিম ইসলামের ইতিহাসে এক অনন্য স্মারক, যা নবী ইবরাহিম (আ.)-এর মহান অবদান ও আল্লাহর অসীম ক্ষমতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কাবাঘরের কাছে সংরক্ষিত এই বরকতময় পাথর মুসলমানদের ইমান, আনুগত্য ও আত্মত্যাগের প্রতীক।

লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া ইসলামিয়া ইমদাদুল উলুম, পলাশ, নরসিংদী