প্রচীনকাল থেকেই চাঁদ নিয়ে মানুষের নানা কৌতূহল। রাতের আকাশে চাঁদের আলো মানুষকে যেমন মুগ্ধ করেছে, তেমনি জাগিয়েছে অসংখ্য প্রশ্ন। চাঁদে কী আছে? সেখানে কি মানুষ যেতে পারবে? এমন নানা ভাবনা হাজার বছর ধরে মানুষের মনে ঘুরপাক খেয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞান সেই কৌতূহলকে বাস্তবে রূপ দেয় ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই। সেদিন মার্কিন মহাকাশচারী নীল আর্মস্ট্রং প্রথম মানুষ হিসেবে চাঁদের বুকে পা রাখেন। এরপর থেকে চাঁদ নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা আরও বিস্তৃত হয়েছে। তবে চাঁদ সম্পর্কে মানুষের জ্ঞানচর্চা শুরু হয়েছে তারও বহু আগে। পবিত্র কোরআন চৌদ্দশ বছরেরও বেশি আগে চাঁদকে মহান আল্লাহর অসীম ক্ষমতার নিদর্শন হিসেবে তুলে ধরেছে। কোরআন ও হাদিসে চাঁদ নিয়ে রয়েছে বহু তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা, যা একদিকে ইমানকে দৃঢ় করে, অন্যদিকে মানুষকে সৃষ্টি জগৎ নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে শেখায়।
কোরআন চাঁদকে আল্লাহর সৃষ্টির এক বিস্ময়কর নিদর্শন হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়। মহান আল্লাহ আকাশ, পৃথিবী, সূর্য ও চাঁদ সৃষ্টি করেছেন নির্ধারিত নিয়মে। এদের প্রত্যেকটি তার আদেশের অনুগত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সূর্য ও চাঁদ নির্ধারিত হিসাব অনুযায়ী চলছে।’ (সুরা রহমান/৫) অন্য আয়াতে তিনি জানিয়েছেন, সূর্য ও চাঁদকে মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করা হয়েছে। (সুরা ইবরাহিম/৩৩)
চাঁদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো, এর ছোট হওয়া বা বড় হওয়া। এক মাসে এটি বিভিন্ন রূপ ধারণ করে। কখনো পূর্ণিমা, কখনো অর্ধচন্দ্র, আবার কখনো সরু বাঁকা রেখার মতো দেখা যায়। কোরআন এই পরিবর্তনের উদ্দেশ্যও জানিয়ে দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা আপনাকে নতুন চাঁদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলুন, এগুলো মানুষের জন্য সময় নির্ধারণ এবং হজের সময় নির্ধারণের মাধ্যম।’ (সুরা বাকারা/১৮৯)
ইসলামে সময় গণনার ভিত্তি সৌরবর্ষ নয়, বরং চন্দ্রমাস। রমজান, ঈদ, হজ, আশুরাসহ গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও ধর্মীয় দিবস নির্ধারিত হয় চাঁদের মাধ্যমে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখো এবং চাঁদ দেখে রোজা ভঙ্গ করো। যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে, তাহলে মাসের ত্রিশ দিন পূর্ণ করো।’ (সহিহ বুখারি)
কোরআন আরও জানায়, চাঁদ নিজস্ব কক্ষপথে নির্ধারিত নিয়মে চলমান। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি চাঁদের জন্য বিভিন্ন মনজিল নির্ধারণ করেছি। অবশেষে তা পুরনো খেজুরের শুকনো ডালের মতো হয়ে যায়। সূর্যের পক্ষে চাঁদকে ধরে ফেলা সম্ভব নয় এবং রাতও দিনের আগে আসতে পারে না। প্রত্যেকেই নিজ নিজ কক্ষপথে ভেসে চলছে।’ (সুরা ইয়াসিন/৩৯-৪০) এই আয়াতগুলো মহাবিশ্বের সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার কথা বলে।
চন্দ্রগ্রহণ সম্পর্কেও ইসলাম মানুষের ভুল ধারণা দূর করেছে। এক সময় মানুষ মনে করত, কোনো বড় ব্যক্তির জন্ম বা মৃত্যুর কারণে সূর্য বা চন্দ্রগ্রহণ হয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ধারণা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘সূর্য ও চাঁদ আল্লাহর নিদর্শনসমূহের দুটি নিদর্শন। কারও মৃত্যু বা জন্মের কারণে এগুলো গ্রহণ হয় না। যখন তোমরা গ্রহণ দেখবে, তখন আল্লাহকে স্মরণ করবে এবং নামাজ আদায় করবে।’ (সহিহ বুখারি)
কোরআনে চাঁদ বিদীর্ণ হওয়ার ঘটনাও উল্লেখ রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘কেয়ামত নিকটবর্তী হয়েছে এবং চাঁদ বিদীর্ণ হয়েছে।’ (সুরা কামা/১)
মক্কার কাফেররা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে তার নবুয়তের পক্ষে কোনো নিদর্শন চাইলে মহান আল্লাহ সেটার সত্যতার প্রমাণ হিসেবে চাঁদ বিদীর্ণ হওয়ার মুজিজা প্রকাশ করেন। চাঁদ দুই টুকরো হয়ে গিয়েছিল। এমনকি লোকেরা দুই খণ্ড চাঁদের মদ্য দিয়ে জাবালে নুরকে (হেরা পাহাড়) দেখতে পায়। অর্থাৎ চাঁদের এক টুকরো পাহাড়ের একদিকে এবং দ্বিতীয় টুকরো পাহাড়ের অপর দিকে চলে যায়। (সহিহ বুখারি, তাফসিরে আহসানুল বায়ান)
হাদিসে চাঁদকে সৌন্দর্য ও স্বচ্ছতার উপমা হিসেবেও ব্যবহার করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, জান্নাতবাসীরা পূর্ণিমার চাঁদের মতো উজ্জ্বল হবে। আবার মুমিনরা কেয়ামতের দিন তাদের রবকে এমন স্পষ্টভাবে দেখতে পাবে, যেমন পূর্ণিমার চাঁদকে দেখতে কোনো কষ্ট হয় না। (সহিহ বুখারি) সাহাবায়ে কেরামও নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারার সৌন্দর্য বর্ণনা করতে পূর্ণিমার চাঁদের উপমা দিয়েছেন। (সহিহ বুখারি)