শিউলির মাকে জয় উৎসর্গ

মালদ্বীপ ও ভারতের সঙ্গে খেলায় মন ভরাতে পারেননি মারিয়া মান্দা, ঋতুপর্ণারা। জিতলেও মালের মেয়েদের দেওয়া দুই গোলই তার প্রমাণ। ৭ বছর পর ভারতের কাছে হারও মানতে হয়েছে তাদের। ওই দুই খেলায় ঋতুপর্ণা-সাগরিকাদের পারফরম্যান্স দেখে হা-হুতাশ করেন দর্শকরা। তবে এক ম্যাচেই যেন সবার আকাক্সক্ষা দূর করে দিলেন এই দুই ফরোয়ার্ড। উবে গেল সব দুর্ভাবনা। নেপালের কাছে হারতে বসা ম্যাচকে ঋতুপর্ণা ও সাগরিকা অসাধারণ দুই গোল করে জয়ে পরিণত করলেন এবং দলকে তৃতীয়বারের মতো বাংলদেশকে সাফের ফাইনাল মঞ্চে তুলে দিলেন তারা।

ম্যাচ দেখে বলতেই হবে খেলেছে নেপাল, জিতেছে বাংলাদেশ। তবে বাংলাদেশের জয়কে জাদু বলতে নারাজ কোচ পিটার বাটলার। খেলা শেষে হাসিমাখা মুখ নিয়ে হাজির তিনি। বললেন, ‘সেমিফাইনাল কিংবা ফাইনালে কেমন খেললেন, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জয় নিয়ে মাঠ ছাড়া। সুন্দর ফুটবল নয়, জয়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’ কোচ বাটলার জানান, তিনি জানতেন এটি একটি কঠিন লড়াই হতে যাচ্ছে। গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া, চোট সমস্যা এবং দলের ভেতরে-বাইরের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই মাঠে নামতে হয়েছে বাংলাদেশকে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনা ছিল ফুটবলার শিউলি আজিমের মায়ের মৃত্যু। এ ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘দলের এই জয় আজিম পরিবারকে উৎসর্গ করা হচ্ছে।’

বাংলাদেশের এই জয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া। বিশেষ করে খেলোয়াড় পরিবর্তনের কৌশলকে ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে উল্লেখ করেন বাটলার। তিনি জানান, চোটের কারণে মনিকা পুরো ম্যাচ খেলার অবস্থায় ছিলেন না। তাই তাকে শুরুর একাদশে রাখা হয়নি। যদিও খেলোয়াড় নিজে মাঠে নামার জন্য আগ্রহী ছিলেন, তবু দলের স্বার্থেই সতর্ক সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।

দলের অধিনায়ক মারিয়া মান্দার প্রশংসা করে বাটলার বলেন, ‘মারিয়া একজন প্রকৃত যোদ্ধা। মাঝমাঠে তার নেতৃত্ব এবং লড়াইয়ের মানসিকতা দলকে এগিয়ে নিয়েছে। তবে মনিকার চোট বেশি। প্রাথমিকভাবে তার করছি, এই চোট গুরুতর হতে পারে এবং সামনে তার খেলা অনিশ্চিত হয়ে যেতে পারে। আফঈদা খন্দকারের পারফরম্যান্স নিয়েও সন্তুষ্ট বাংলাদেশের কোচ। তিনি বলেন, ‘কাউকে বেঞ্চে বসিয়ে রাখার পেছনে সবসময় একটি পরিকল্পনা থাকে। আফঈদা ধীরে ধীরে নিজের সেরা ছন্দে ফিরছে এবং দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।’ পাশাপাশি ১৮ বছর বয়সী কয়েকজন তরুণ খেলোয়াড়ের বিকাশেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

ম্যাচে গোল হজম করার পর দলের প্রতি কোচের নাকি বার্তা ছিল ধৈর্য ধরে খেলার। বাটলারের মতে, এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দ্রুত আরেকটি গোল না খাওয়া। তাই তিনি খেলোয়াড়দের ম্যাচে টিকে থাকতে এবং চাপের সময়টুকু সামাল দিতে বলেছেন। পরে সেই ধৈর্যই দলের সাফল্যে ভূমিকা রেখেছে।

নেপালের কোচ ম্যাচ শেষে বাংলাদেশকে ‘ভাগ্যবান’ বলে মন্তব্য করলেও তা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন বাটলার। তিনি বলেন, ‘আপনি যত বেশি কঠোর পরিশ্রম করবেন, ভাগ্য আপনার তত বেশি সহায় হবে।’ তার মতে, এটি ভাগ্যের জয় নয়; বরং সঠিক পরিকল্পনা, কঠোর পরিশ্রম এবং দলের চরিত্রের জয়।

ভারতের বিপক্ষে ফাইনাল প্রসঙ্গে বাটলার বলেন, ‘ভারত খুবই শক্তিশালী প্রতিপক্ষ। তাই কাউকেই হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।’ ফাইনালের আগে দল বিশ্রাম, পুনরুদ্ধার এবং ভিডিও বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিজেদের প্রস্তুত করবে। সংবাদ সম্মেলনের শেষদিকে বাটলার আবারও তার দর্শনের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তার ভাষায়, ‘কখনো কখনো আপনি কেমন খেললেন, সেটি বড় বিষয় নয়। বড় বিষয় হলো আপনি কীভাবে কাজটি সম্পন্ন করলেন।’ বাংলাদেশের সেমিফাইনাল জয়ে সেই দর্শনেরই প্রতিফলন দেখা গেছে।