অযতœ-অবহেলায় বৃদ্ধ মায়ের করুণ মৃত্যুতেও অনুতপ্ত নন নুরজাহান বেগমের সন্তানরা। মায়ের প্রতি এমন নিষ্ঠুর, অমানবিক কৃতকর্মের জন্য বিন্দুমাত্র অনুশোচনা হচ্ছে না তাদের। মায়ের বিষয়ে অনুভূতি কী, কতটা অনুতপ্ত তারা এমনটি জানতে কল করলে নুরজাহানের এক সন্তান উচ্চৈঃস্বরে কথা শুনিয়ে কল কেটে দেন, আরেকজন পরিচয় শোনার পরই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। দেশবাসী এই মায়ের জন্য চোখের জল ফেললেও সন্তানদের নেই বিন্দুমাত্র অনুভূতি। তাদের কল্পনাশক্তি যেন একেবারে হারিয়ে গেছে।
তবে এ ঘটনায় বড় ছেলে যুগ্মসচিব ড. এ কে এম আনিসুর রহমানকে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রকৌশল ও উন্নয়ন) পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছে সরকার। নুরজাহান বেগমের মৃত্যুর কারণ জানতে মরদেহের ময়নাতদন্ত করেছে পুলিশ। তবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন গতকালও হাতে পায়নি পুলিশ। পুলিশ ও প্রতিবেশীরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে অযত্ন-অবহেলাজনিত কারণে নুরজাহানের মৃত্যু হয়েছে। তবে তার মৃত্যুর কারণ নির্ণয়ে একজন বিচারিক কর্মকর্তার নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশনা চেয়ে রিট করেছেন ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের এক আইনজীবী।
চার সন্তানের পরিচয় : নুরজাহান বেগমের বড় ছেলে ড. এ কে এম আনিসুর রহমান। তিনি সরকারের যুগ্মসচিব, মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (গতকাল পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে)। তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার কেডিআই স্কুল অব পাবলিক পলিসি অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট থেকে এমপিপি ও পিএইচডি সম্পন্ন করেন। সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর পরিকল্পনা কমিশন, ভূমি মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। বুয়েট থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে প্রথম শ্রেণিতে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।
দ্বিতীয় ছেলে ড. এ কে এম আশিকুর রহমান। তিনি বুয়েটের সিএসই বিভাগের একজন অধ্যাপক ও বেসরকারি প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির অ্যাডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি। তিনি বুয়েট থেকে স্নাতক শেষ করার পর কানাডার ইউনিভার্সিটি অব আলবার্টা থেকে কম্পিউটিং সায়েন্সে পিএইচডি ডিগ্রিধারী। বর্তমানে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকেন বুয়েট কোয়ার্টারে।
ছোট ছেলে এ কে এম আতিকুর রহমান কানাডাপ্রবাসী। আর একমাত্র মেয়ে ফাতিমা নাসরিন সুলতানা মিরপুরের ইম্পেরিয়াল স্কুলের শিক্ষিকা। ফাতেমার স্বামীও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। প্রায় পাঁচ বছর আগে তিনি মারা যান। নিঃসন্তান ফাতেমা মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনের সি ব্লকে শ^শুরবাড়িতে থাকতেন। তার বাবা ২০০৮ সালে মারা যান। এরপর মা নুরজাহান বেগম তার সঙ্গেই থাকতেন। নুরজাহান বেগমও পেশায় শিক্ষক ছিলেন। জীবনের শেষ সম্বল দিয়ে সন্তানদের পড়ালেখা করিয়েছেন। স্বপ্ন ছিল শেষ বয়সে সন্তানরা দেখবে, সেবা করবে। কিন্তু এর কিছুই জুটল না হতভাগা এই মায়ের কপালে।
এ বিষয়ে জানতে মেজো ছেলে বুয়েটশিক্ষক আশিকুর রহমানকে কল দিলে রিসিভ করে পরিচয় শুনেই কেটে দেন। এরপর একাধিকবার কল করলেও তিনি কল ধরেননি। মেয়ে ফাতেমা নাসরিন কল রিসিভ করে উচ্চৈঃস্বরে বলেন, ‘কি সমস্যা আপনাদের। আপনাদের মা, নাকি আমাদের মা, বলে কলটি কেটে দেন।’
আর বড় ছেলে যুগ্মসচিব আনিসুর রহমানকে একাধিকবার কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে গতকাল তাকে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রকৌশল ও উন্নয়ন) পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়েছে, তাকে পদ থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। এর আগে দুপুরে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী জানান, পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে নুরজাহান বেগমের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় তদন্তের নির্দেশনা উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করা হয়েছে। এতে নুরজাহান বেগমের ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে কিনা, সে বিষয়ে মানবাধিকার কমিশনের মাধ্যমে তদন্তের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি একজন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে তার মৃত্যুর ঘটনা তদন্তের নির্দেশনাও চাওয়া হয়েছে রিট আবেদনে। গতকাল সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শরীফ সরকারের পক্ষে জনস্বার্থে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এ রিট আবেদনটি করেন ব্যারিস্টার এইচ এম সানজিদ সিদ্দিকী।
এ ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ আর নিন্দা জানিয়ে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করেছেন অসংখ্য মানুষ। কেউ কেউ সন্তানদের ছবি দিয়ে ধিক্কার জানিয়েছেন। গতকালও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পল্লবীর ৮নং রোডের বাসিন্দারা। সেখানকার একটি বাসা থেকে গত রবিবার নুরজাহান বেগমের গলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নুরজাহান বেগম মেয়ে ফাতেমার সঙ্গে ওই বাসায় থাকতেন। ঘটনার পর দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা ও নিন্দা প্রকাশ করেন সাধারণ মানুষ। কেননা, নুরজাহান বেগমের সন্তানরা প্রতিষ্ঠিত হলেও তাকে দেখভাল করতেন না। একাকী ওই কক্ষে জীবনযাপন করতেন এই মা। এমনকি মৃত্যুর পর মায়ের কবরে মাটি দিতে আসেননি বড় ছেলে।