ক্ষুধা পেলে তারা চলে যান মায়ের সমাধিস্থলের পাশে। হাতে থাকে খালি খাবারের প্লেট। কথা বলতে পারেন না ঠিকমতো, নিজের কষ্টও প্রকাশ করতে পারেন না। তবুও তাদের এই নীরব উপস্থিতি যেন বলে দেয় মা নেই, কিন্তু ক্ষুধা তো থেমে নেই।
পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার ধূলিয়া ইউনিয়নের চাদকাঠী গ্রামের দাসনগর এলাকায় একটি জরাজীর্ণ টিনের ঘরে মানবেতর জীবন কাটছে তিন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ভাই রিপন দাস, সাধন দাস ও নিদু দাসের। বাবা-মাকে হারানোর পর এখন তারা কার্যত অসহায় হয়ে পড়েছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, জন্ম থেকেই নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বেড়ে ওঠা এই তিন ভাইয়ের মধ্যে সাধন দাস দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। অপর দুই ভাই রিপন ও নিদু বাক ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। ফলে নিজেদের প্রয়োজন কিংবা কষ্টের কথাও তারা স্বাভাবিকভাবে প্রকাশ করতে পারেন না।
একসময় বাবা রতন চন্দ্র দাস ও মা সরস্বতী রানীর স্নেহ-ভালোবাসায় কোনোভাবে চলছিল তাদের জীবন। চরম দারিদ্র্যের মধ্যেও সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেন তারা। স্থানীয়দের দাবি, অনেক সময় নিজেরা না খেয়েও সন্তানদের খাবারের ব্যবস্থা করতেন বাবা-মা।
গত বছর মারা যান পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি রতন চন্দ্র দাস। এরপর অসুস্থ শরীর নিয়েও তিন সন্তানকে আগলে রাখেন মা সরস্বতী রানী। কিন্তু দীর্ঘদিন লিভার ও কিডনি জটিলতায় ভোগার পর গত মাসে তিনিও মারা যান। মায়ের মৃত্যুর পর যেন পুরোপুরি ভেঙে পড়ে পরিবারটি।
পাঁচ ভাইবোনের এই পরিবারের বড় বোন প্রায় ২০ বছর আগে ভারতে চলে যান। আরেক ভাই দিনমজুরের কাজ করে নিজের সংসার চালাতেই হিমশিম খাচ্ছেন। ফলে তিন প্রতিবন্ধী ভাইয়ের দায়িত্ব নেওয়ার মতো সামর্থ্য তারও নেই।
বর্তমানে প্রতিবেশীদের দেওয়া খাবারেই কোনোভাবে দিন পার করছেন তারা। কেউ খাবার দিলে খেতে পারেন, না দিলে অনেক সময় উপোসেই কাটে দিন। ক্ষুধার কষ্টে কখনও কখনও তারা খাবারের প্লেট হাতে মায়ের সমাধিস্থলের পাশে গিয়ে বসে থাকেন। হৃদয়বিদারক এই দৃশ্য নাড়া দিয়েছে স্থানীয়দেরও।
প্রতিবেশী সঞ্চিতা পাল বলেন, এক বেলা খাবার খেলে দুই বেলা না খেয়ে থাকতে হয়। আমরা যদি খাবার না দেই, তাইলে না খেয়েই দিন কাটে। প্রতিবেশীরা তো সব সময় সাহায্য করতে পারে না। সমাজের বিত্তবান মানুষ এগিয়ে এলে তাদের উপকার হত।
আরেক প্রতিবেশী অমিত বলেন, বাবা মারা যাওয়ার পরও মা অনেক কষ্ট করে তিন সন্তানকে দেখাশোনা করছে। কিন্তু মা মারা যাওয়ার পর তারা একেবারে অসহায় হয়ে গেছে। এখন তাদের দুই বেলা খাবার দেওয়ার মতোও কেউ নেই।
এ বিষয়ে বাউফল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ সালেহ আহমেদ বলেন, তিন প্রতিবন্ধী ভাইকে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৫০ কেজি চাল ও ১০ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পরিবারের যে সুস্থ ভাই রয়েছেন, তার জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রশাসন সবসময় তাদের পাশে থাকবে।