ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে তদন্ত প্রতিবেদনের মূল অংশ পড়ে শোনান স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল। সে সময় শাস্তির বিষয়ে কড়া বার্তা দেন মন্ত্রী। তিনি জানান, আগামী রবিবার আইন অনুযায়ী শাস্তির বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এমন শাস্তি দেওয়া হবে যে, যাতে এ ধরনের সাহস আর কেউ পাবে না।’
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদনে অপরাধ ও অবহেলা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে। হাসপাতালটির যে পোস্ট অপারেটিভ রুমে এ ঘটনা ঘটেছে, সেটি আমরা ইতিমধ্যে সিলগালা করে দিয়েছি। তবে পুরো হাসপাতালে দুই শতাধিক রোগী ভর্তি থাকায় হুট করে তা বন্ধ করা যাচ্ছে না। এখন শাস্তির বিষয় কী আছে, তা বসে আমরা নিশ্চিত করব। আগামী দুই দিন বন্ধ, রবিবারের মধ্যে আমরা সিদ্ধান্তে পৌঁছাব, ওই দিন সন্ধ্যার মধ্যে জানতে পারবেন।’
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার দৃঢ়বিশ্বাস, আমরা যেভাবে এটা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছি, যে ত্বরিত গতিতে যাচ্ছি, আপনাদের সহযোগিতা আছে, আমার দৃঢ়বিশ্বাস পরবর্তী সময়ে আমরা যে কার্যক্রম গ্রহণ করতে যাচ্ছি, যেভাবে প্রতিটা হাসপাতাল পরিদর্শনের জন্য আমরা চিন্তাভাবনা স্থির করেছি, যেভাবে আমাদের পরিদর্শন কার্যক্রম সাজাচ্ছি, আর যে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে যাচ্ছি, তাতে এ ধরনের কর্মকা-ের সাহস আর কেউ পাবে না। এরকম বদ্ধ ঘরে শিশু বা মানুষ রাখার সাহস আর কেউ পাবে বলে আমি বিশ্বাস করি না। আইনে যতটুকু সম্ভব ততটুকু যাব আমি।’
তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদনে পাঁচটি পর্যবেক্ষণ, মৃত্যুর সম্ভাব্য কয়েকটি কারণ ও সুপারিশ উল্লেখ করেছে। মৃত্যুর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, যদিও অস্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে ময়নাতদন্ত ছাড়া মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ বের করা সম্ভব নয়, তবু পারিপাশির্^ক অবস্থার পর্যবেক্ষণ, বিভিন্ন ব্যক্তির বক্তব্য, জবানবন্দি থেকে মৃত্যুর কারণ হিসেবে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা যায়। সেগুলো হলো : ছোট বদ্ধ কক্ষে অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতি, দীর্ঘক্ষণ এসি বন্ধ থাকা এবং বিকল্প কোনো ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা না থাকায় বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যাওয়া এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া, যা নবজাতকের দীর্ঘ সময় টিকে থাকার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন, ভিকটিমদের পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য, জবানবন্দি, হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও স্টাফদের বক্তব্য পর্যালোচনার ওপর পারিপাশির্^ক সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় তদন্ত কমিটি প্রতিবেদনে বলেছে, ছয় নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় ওই সময়ে দায়িত্বরত চিকিৎসক না থাকা ও নার্স, স্টাফ, সর্বোপরি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব অবহেলার বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণে যে পাঁচটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে, তা হলো : এক. ভবনটি হাসপাতালের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য উপযুক্ত নয়। দুই. সংশ্লিষ্ট পোস্ট অপারেটিভ কক্ষটিতে দীর্ঘ সময় এসি বন্ধ থাকায় এবং স্বাভাবিক ভেন্টিলেশন কার্যক্রম না থাকায় প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের মাত্রার ঘাটতি ছিল। কার্বন ডাই- অক্সাইডের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ছিল। তিন. সংশ্লিষ্ট কক্ষের দায়িত্বরত সব সেবিকা, পরিচ্ছন্নতা কর্মী ও মৃত নবজাতকদের অভিভাবকদের বক্তব্যে প্রমাণ পেয়েছে যে, দায়িত্বরত সেবিকাদের দায়িত্বে চরম অবহেলা ও অসহযোগিতা ছিল। নবজাতকের আকস্মিক শারীরিক অবনতিশীল অবস্থায় হাসপাতালের সক্রিয় ইমার্জেন্সি মেডিকেল রেসপন্স ছিল না। অভিভাবকদের আহ্বানে সাড়া না দিয়ে, সংশ্লিষ্ট নার্স কোনো চিকিৎসককে বিষয়টি অবহিত না করে কালক্ষেপণ করতে থাকে। এমনকি নবজাতকদের মৃত্যু রোধে যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হয়নি। চার. ওই কক্ষটির আয়তন প্রায় ৯০০ বর্গফুট, যেখানে ১১ জন রোগী, নবজাতক এবং রোগীর লোকসহ প্রায় ৫০ জনের উপস্থিতি ছিল। কক্ষটির ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি লোক ছিল।
সর্বশেষ পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, তদন্ত কমিটি ওই হাসপাতালের দায়িত্বরত প্রশাসনিক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে প্রমাণ পেয়েছে যে, বিদ্যমান প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিবর্গ একটি হাসপাতাল পরিচালনার প্রাথমিক শর্তগুলো পালনে সক্ষম ছিল না। যেমন: ক. পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ড ২-এ ভর্তি রোগীদের দেখাশোনার জন্য কোনো চিকিৎসক ছিল না। খ. ওই ওয়ার্ডে দায়িত্বরত সেবিকাদের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি। গ. ওই ওয়ার্ডে আলো-বাতাস চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ঘ. সেখানে রোগী, নবজাতক, রোগীর অ্যাটেনডেন্টসহ অতিরিক্ত সংখ্যক লোকের উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়নি। ঙ. হাসপাতালটির ভেতরে যত্রতত্র কাচের ছোট ছোট কক্ষ নির্মাণ করায় হাসপাতালটি যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হয়েছে। চ. তদন্ত কমিটি মনে করে ভবিষতে বেসরকারি হাসপাতালের নতুন লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল ভবন পরিদর্শনপূর্বক আগে পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি গ্রহণ বাধ্যতামূলক হিসেবে শর্তারোপ করা প্রয়োজন।
গত ২৭ মে ভোরে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে তিন ঘণ্টায় ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। ঘটনার পর হইচই পড়ে যায়। পুলিশ, র্যাব, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হাসপাতালটি পরিদর্শন করেন। ঘটনার পর সরকারের পক্ষ থেকে দুটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। পাশাপাশি আদ্-দ্বীন কর্তৃপক্ষও একটি কমিটি গঠন করে তদন্ত করে। সেটি তারা গত ২ জুন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে জমা দেয়। এ ছাড়া নবজাতক মৃত্যুর ঘটনায় অবহেলার অভিযোগ এনে গত ২৭ মে রাতে মৃত এক নবজাতকের পরিবারের পক্ষ থেকে রমনা থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। গত ৩০ মে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল ওই হাসপাতাল পরিদর্শনে যান। তিনি প্রশাসনিক ভবনের বেকারির কারখানা দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। মন্ত্রী চলে যাওয়ার পর ওই হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা সাংবাদিকদের ধাওয়া করে। যদিও বিকেলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের পরিচালক (এইচ আর অ্যান্ড কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স) তারিকুল ইসলাম মুকুল।
উল্লেখ্য, আদ্-দ্বীনের বিরুদ্ধে অভিযোগ নতুন নয়। এর আগেও বহু মানুষ সেবা নিতে এসে হয়রানির কথা উল্লেখ করে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দিয়ছে। কিন্তু সেসব কখনো আলোচনায় আসেনি।
ছয় শিশুর মৃত্যুকে কেবল পেশাগত অবহেলা নাকি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে দেখা হচ্ছে, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এটি নিশ্চিতভাবেই একটি মারাত্মক ফৌজদারি অপরাধ এবং এ ঘটনায় ইতিমধ্যে মামলা হয়েছে। আবেগের কারণে ময়নাতদন্ত ছাড়াই স্বজনরা শিশুদের মরদেহ নিয়ে গেছেন, যা আসামিরা আইনি সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করতে পারে। তবে এটি রাতের আঁধারে ঘটা কোনো গোপন ঘটনা নয়, এটি শতভাগ প্রমাণিত সত্য। আমার দৃঢ়বিশ্বাস, বিজ্ঞ আদালত আসামিদের কোনো ছাড় দেবে না।’