স্থলপথে মাদক চোরাচালানে কড়াকড়ি এবং ঝুঁকি থাকায় নাফ নদের জলসীমা ও গভীর সমুদ্রপথকে নিরাপদ রুট হিসেবে বেছে নিয়েছে মাদক পাচারকারীরা। সীমান্তঘেঁষা নাফ নদের এপারে বাংলাদেশের টেকনাফ, ওপারে মিয়ানমারের মংডু শহর। নাফ নদের প্রায় ৬০ কিলোমিটার দুই দেশের জলসীমার মধ্যে পড়েছে। এর মধ্যে ৫৪ কিলোমিটার পড়েছে কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তে বাংলাদেশ অংশে। এই ৫৪ কিলোমিটার জলসীমা বলতে গেলে একপ্রকার অরক্ষিত অবস্থায় আছে। ফলে এ এলাকা দিয়ে প্রতিনিয়ত মিয়ানমার থেকে আসছে কোটি কোটি টাকার ইয়াবা, আইস, মদ, বিয়ারসহ বিভিন্ন মাদকের চালান। এরপর হাতবদল হয়ে তা চলে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়।
নাফ নদের বাংলাদেশ জলসীমায় সম্প্রতি টহল জোরদার করেছে র্যাব, বিজিবি ও কোস্ট গার্ড। তারপরও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে মিয়ানমার থেকে আসছে ইয়াবা ও আইসের বড় বড় চালান। প্রায় সময় আটকও হচ্ছে মাদকের চালান। তবু থেমে নেই মাদক কারবার। কারণ টেকনাফ সীমান্তে জলসীমা কার্যত অরক্ষিত থাকায় মাদকের স্রোত থামানো যাচ্ছে না। আবার মাদক বহনকারী আটক হলেও গডফাদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে এবং আটক ব্যক্তিরা জামিনে বের হয়ে মাদক কারবারে সক্রিয় হচ্ছে।
জানা যায়, উখিয়া ও টেকনাফে বিজিবি, পুলিশ, র্যাব, কোস্ট গার্ড বাহিনীর সঙ্গে গত ৮ বছরে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ২৯৯ মাদক কারবারি নিহত হয়েছে। আত্মসমর্পণ করে ১২৩ জন। এ সময় শুধু টেকনাফে মাদকবিরোধী পৃথক অভিযানে কয়েক হাজার মাদক কারবারিকে আটক করা হয়েছে এবং কোটিরও বেশি ইয়াবা, বিপুল পরিমাণ আইস, মদ ও অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এদিকে আত্মসমর্পণ করা সব মাদক কারবারি এবং মাদকসহ আটক ব্যক্তিও সহজে জামিনে বের হয়ে আসছে। ফলে মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না।
টেকনাফে দায়িত্বরত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, নাফ নদসংলগ্ন সীমান্তের ওপারে কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছে মিয়ানমার সরকার। তবে বাংলাদেশ অংশে সে রকম কোনো ব্যবস্থা না থাকায় সহজেই মাদকের চালান প্রবেশ করতে পারে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মিয়ানমার থেকে দুভাবে মাদক আসে। একটি হচ্ছে মিয়ানমার থেকে আসা মাদক নাফ নদ ও বঙ্গোপসাগর হয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় খালাস হয়। অন্যটি হচ্ছে নাফ নদ থেকে টেকনাফ হয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে মিয়ানমারের মংডু ও আকিয়াবের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে নাফ নদে কার্গো বোটে আসে মাদক। এরপর সেন্টমার্টিনের দক্ষিণ-পশ্চিমে দুই দেশের জলসীমায় হাতবদল হয়। তারপর বঙ্গোপসাগর হয়ে ফিশিং বোটে অবস্থাভেদে সন্দ্বীপ, হাতিয়া, কক্সবাজার খুরশকুল, ইসলামপুর, মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও বাঁশখালীতে খালাস হয়। গত কয়েক মাসে কোস্টগার্ডের অভিযানে বেশ কিছু ট্রলারসহ অর্ধশতাধিক পাচারকারী আটক হয়।
মিয়ানমারের সীমানা অতিক্রমের পর নাফ নদের উপকূলে আনাউক মাইনহলুত, আল-লে থান কিয়াও, জাওমাদত, কানিনচাং, মংডু, নায়াংগইয়াং, আলে কালায়ওয়া, সাবাইগন, কিম্বুক, তমব্রম্ন, টাউনব্রো, তমব্রম্ন বাম, ডেকুবুনিয়া ও ফকিরাপাড়া পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশের জলসীমায় মাদক আসে।
আর নাফ নদ থেকে টেকনাফে মাদকের চালান প্রবেশের পয়েন্টগুলো হচ্ছে নাফ নদের উপকূলসংলগ্ন হোয়াইক্যং ইউনিয়নের নয়াবাজার, নয়াপাড়া, মিনাবাজার, ঝিমংখালী, কাঠাখালী, লম্বাবিল উলুবনিয়া, খাংজরপাড়া, উনচিপ্রাং। হ্নীলা ইউনিয়নের মৌলভীবাজার, নাইক্ষ্যংখালী, ওয়াবরাং, চৌধুরীপাড়া, আলীখালী, মোচনী, জাদীমুরা, দমদমিয়া মাদক অন্যতম। টেকনাফ সদর ইউপির নাজিরপাড়া, মৌলভীপাড়া, বরইতলী, কেরুনতলী। টেকনাফ পৌরসভার নাইটংপাড়া, হেচ্ছার খাল, কে কে পাড়া, জালিয়াপাড়া, খানকার ডেইলসহ বেশ কয়েকটি অরক্ষিত প্যারাবন পয়েন্ট। সাবরাং ইউনিয়নের মণ্ডলপাড়া, সিকদারপাড়া, করাচিপাড়া, আচারবনিয়া, নয়াপাড়া, ডেগিল্যার বিল, ঝিনাপাড়া, লেজিরপাড়া, লাফার ঘোনা, কাটাবনিয়া, ওয়াবফ্রিডিয়া, শাহপরীর দ্বীপের জালিয়াপাড়া, ঘোলারপাড়া, মাঝরপাড়া, ক্যাম্পপাড়া, পশ্চিমপাড়া, ডাঙ্গরপাড়া। মেরিন ড্রাইভ সড়কসংলগ্ন কাটাবনিয়া নতুন সুøইসগেট, কচুবনিয়া, টেকনাফ সদরের রাজারছড়া, মহেশখালিয়া পাড়া, লম্বরী, মিঠাপানির ছড়া, বাহারছড়া ইউনিয়নের নোয়াখালীপাড়া, মারিশবনিয়া, উত্তর শিলখালী, দক্ষিণ শিলখালী, শামলাপুরসহ আরও বেশ কয়েকটি পয়েন্ট দিয়ে প্রায়ই বড় বড় মাদকের চালান প্রবেশ করছে।
ইদানীং প্রবালদ্বীপখ্যাত সেন্টমার্টিনের ছেঁড়াদ্বীপও মাদক পাচারের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। গত ১১ এপ্রিল উখিয়া ব্যাটালিয়ন (৬৪ বিজিবি) টেকনাফের হ্নীলা সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৮ লাখ ৫৯ হাজার ৪০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে। তবে কাউকে আটক করতে পারেনি বিজিবি।
এপ্রিল থেকে মে পর্যন্ত দুই মাসে টেকনাফে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পৃথক অভিযানে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। তথ্য অনুযায়ী, ১০ এপ্রিল পুলিশ পাঁচ লাখ পিস ইয়াবা ও ১৬ এপ্রিল নৌবাহিনী পৃথক অভিযানে ৭২ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করে। ১৪ মে এক লাখ ৩১ পিস ইয়াবাসহ দুই পাচারকারীকে আটক করেছে র্যাব এবং নৌবাহিনীর অভিযানে এক লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া ৮ মে কোস্টগার্ড ৭০ হাজার পিস এবং ২০ মে বিজিবি আরও ৫০ হাজার পিস ইয়াবা জব্দ করে। ২৫ মে কোস্টগার্ড ১৫ হাজার পিস এবং অন্য আরেকটি অভিযানে আরও চার লাখ ২০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে ১০ পাচারকারীকে মাদকসহ আটক করা হয়।
টেকনাফ ২ বিজিবি অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হানিফুর রহমান জানান, সীমান্তে বিজিবি নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রেখেছে। মাদক পাচার ঠেকাতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের এগিয়ে আসতে হবে। মাদক কারবারে জড়িত অপরাধীদের চিহ্নিত করে আইনের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য সঠিক তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতে হবে বলেও জানান তিনি।
এ বিষয়ে হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. আলী বলেন, গত কয়েক মাসে টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সবচেয়ে বেশি মাদক উদ্ধার করেছে। মাদক কারবারিরা টেকনাফ সীমান্তবর্তী এলাকায় মিয়ানমারে মোবাইল সিম ব্যবহার করে। হুন্ডি, বিকাশ ও বড় বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের পণ্যের আড়ালে মাদকের টাকা টেকনাফে চলে আসে। নজরদারির অভাবে এদের দৌরাত্ম্য বাড়ছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে বসে শীর্ষ মাদক কারবারিরা এর নিয়ন্ত্রণ করছে।
স্থানীয় প্রশাসনের অভিযানে বিপুল ইয়াবা ও আইস নিয়ে বাহক আটক হলেও গডফাদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এতে দিন দিন ইয়াবা ও আইসের আগ্রাসন বাড়ছে। তার পাশাপাশি সাগরপথে মালয়েশিয়াগামী মানব পাচারও বাড়ছে। মানব পাচারকারী চক্র মালয়েশিয়াগামী নৌকায় লোকজন নিয়ে ফেরার পথে ইয়াবা, আইস নিয়ে আসছে।
এ ব্যাপারে টেকনাফ মডেল থানার ওসি মো. সাইফুল ইসলাম জানান, মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে বেশ কিছু চিহ্নিত মাদক পাচারের গডফাদারকে আটক করা হয়েছে। মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।