ঈদে রোগীদের দেওয়া হয় দুর্গন্ধযুক্ত মুরগির মাংস

ব্রয়লার মুরগির মাংসের পরিবর্তে প্রায় প্রতিদিন ডিম ও সন্ধ্যায় রুই-কাতলার পরিবর্তে অন্যান্য সাদা মাছ খাওয়ানো হতো। আর ঈদুল আজহায় খাওয়ালেন দুর্গন্ধযুক্ত-বাসি মুরগির মাংস। ঘটনাটি খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (খুমেক)। এ ঘটনায় স্টুয়ার্ট হাবিবকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এই নিয়ে তাকে দুবার অব্যাহতি দেওয়া হলো।

খুমেক হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. মোঝাহার আলী খান জানান, গত বুধবার ৩ জুন তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এর আগে ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর দুদক একবার খুমেক হাসপাতালের রান্নাঘরে অভিযান পরিচালনা করে। সেই অভিযানে অনিয়মের অভিযোগে হাবিবকে ২৫ ডিসেম্বর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তবে তিনি অসৎ কর্মকর্তাদের যোগসাজশে দুই মাস পর আবারও স্বপদে ফিরে আসেন।

খুমেক হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, কর্তৃপক্ষের চোখে ধুলো দিয়ে স্টুয়ার্ট হাবিব রান্নাঘরে অদৃশ্য সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন। তার বিরুদ্ধে রোগীদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি খাবার সরবরাহে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এই কাজে আউটসোর্সিং-এর সহকারী বাবুর্চি মলয় তাকে সহযোগিতা করতেন। সবশেষ গত ২৯ মে শুক্রবার ঈদের দ্বিতীয় দিন খুমেক হাসপাতালে রোগীদের দেওয়া দুপুরের খাবারের মুরগির মাংস থেকে দুর্গন্ধ বের হয়। দুর্গন্ধযুক্ত মাংস খেয়ে অনেকে বমি করেন। বিষয়টি নিয়ে হাসপাতালজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। স্টুয়ার্ট হাবিব ওই দিন হাসপাতালে ছিলেন না। অন্য কাউকে দায়িত্বও দিয়ে যাননি। এই ঘটনায় স্টুয়ার্ট হাবিব ও ঠিকাদার আলহাজ এ রহমানকে শোকজ করা হয়। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় স্টুয়ার্ট হাবিবকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

হাসপাতালের অর্থোপেডিক্স ওয়ার্ডের রোগী রায়হান বলেন, ঈদের দ্বিতীয় দিন শুক্রবার দুপুরে খাবারে গন্ধযুক্ত মুরগির মাংস দেওয়া হয়। মাংস খেয়ে আমি নিজেও বমি করি। অনেক রোগী অসুস্থ হয়ে পড়েন। রোগীর স্বজন জাহানারা খাতুন বলেন, ২৯ মে শুক্রবার দুপুরের খাবারে গন্ধযুক্ত মুরগির মাংস দেওয়া হয়। ওই মাংস কেউ খেতে পারেননি। আমরা বাইরে থেকে খাবার কিনে খেয়েছি। যে সব অসুস্থ রোগীর আত্মীয়-স্বজন পাশে ছিলেন, তাদের না খেয়ে থাকতে হয়েছে।

হাসপাতালের কয়েকটি ওয়ার্ড ঘুরে রোগীদের সঙ্গে খাবারের বিষয়ে জানতে চাইলে রোগীরা খাবারের মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এক রোগীর স্বজন বলেন, হাসপাতালে রোগীরা এমনিতেই শারীরিক কষ্টে থাকেন। এর মধ্যে নিম্নমানের খাবার তাদের জন্য আরও ঝুঁকির কারণ হতে পারে। রোগীদের স্বজনরা জানান, অধিকাংশ সময় বাইরে থেকে খাবার কিনে আনতে হয়। রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, রোগীদের খাবারের জন্য সরকারি বরাদ্দ থাকলেও কিছু অসাধু ঠিকাদার ও দায়িত্বপ্রাপ্তদের অবহেলার কারণে নিম্নমানের খাবার সরবরাহ করা হয়। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

স্টুয়ার্ট হাবিবের অনিয়মের অনুসন্ধানে জানা গেছে, খুমেকে একজন রোগীর তিন বেলা খাবারের জন্য সরকারি বরাদ্দ ১৭৫ টাকা। উন্মুক্ত দরপত্রে ঠিকাদারের মাধ্যমে খাবার সংগ্রহ করা হয়। খাবারের মেন্যুতে ডায়েট-১ এ কলা, রুটি ও  ডিম, ডায়েট-২ এ দুধ এবং ডায়েট-৩ এ স্বল্প সংখ্যক রোগীকে হাই প্রোটিন খাবার দেওয়া হয়। দুপুর ও রাতে একবেলা মাছ এবং একবেলা ব্রয়লার মুরগির মাংস অথবা ডিম দেওয়া হয়।

একমাস ধরে চলা অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দুপুরে ব্রয়লার মুরগির মাংসের পরিবর্তে প্রায় প্রতিদিন ডিম ও সন্ধ্যায় রুই-কাতলার পরিবর্তে অন্যান্য সাদা মাছ অথবা ডিম দিয়ে রোগীর ক্ষুধা নিবৃত করা হয়। প্রতিদিন একজন রোগীর জন্য ১৭৫ টাকার খাবার কোনো দিনও থাকে না। খুমেক হাসপাতালে গড়ে প্রতিদিন ১৩৫০ থেকে ১৪৫০ জন রোগী থাকে। প্রতিটি রোগীর জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের একটি অংশ স্টুয়ার্ট হাবিবের মাধ্যমে আত্মসাৎ হয়। এছাড়া অতিরিক্ত রোগী দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে অনিয়মকে নিয়মে পরিণত করেছেন হাবিব। কর্তৃপক্ষ তাকে বারবার সতর্ক করে। তিনি কাউকে তোয়াক্কা করেন না। নিয়মবহির্ভূত পদোন্নতি পেয়ে স্টুয়ার্ট হয়েছেন।

দায়িত্ব থেকে অব্যাহতির বিষয়ে স্টুয়ার্ট হাবিব বলেন, ‘আমি জানি না। আমার বিরুদ্ধে সব অভিযোগ মিথ্যা। ঈদের দ্বিতীয় দিন আমি খুলনাতে ছিলাম না। রান্নাঘরের কোনো টাকা আত্মসাৎ করা হয় না। আমি সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত সব টাকা রোগীদের জন্য ব্যয় করি। আমি সৎভাবে কাজ করি।’

এ বিষয়ে খুমেকের পরিচালক ডা. কাজী মো. আইনুল ইসলাম বলেন, ‘আমি ২০২৫ সালের আগস্টে যোগদান করি। আমি যোগদানের আগে হাবিব কী করেছে জানি না। আমি সব সময় খাবার তদারক করি। তবে গত ২৮ মে শুক্রবার তিনি নিয়ম বহির্ভূতভাবে ছুটি কাটিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে দুপুরের খাবারে দুর্গন্ধযুক্ত পচা মুরগির মাংস দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।