শুধু নিজের শিশু সন্তানই নয়, সারা দেশের শিশুদের নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন রাজধানীর পল্লবীতে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার শিশু রামিসা আক্তারের বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেছেন, ‘আমি একজন ধর্ষিতার বাবা, একজন খন্ডিত লাশের বাবা। কিন্তু আমি তো এভাবে পরিচিত হতে চাইনি। আমি তো গর্বিত পিতা হয়ে থাকতে চেয়েছিলাম।
সন্তানের সঙ্গে নির্মমতার জন্য কে দায়ী, সে প্রশ্ন তুলে আব্দুল হান্নান মোল্লা বলেন, আমি শুধু জানতে চাই এই দায়িত্ব কে নেবে? এটা কি আমার অবহেলা, সমাজের অবহেলা, না রাষ্ট্রের অবহেলা? আজকে খন্ডবিখন্ড আমার খুকু সোনার ঘটনার দায়িত্ব কে নেবে? আমি কি তার জন্য দায়ী? না কে দায়ী?’ গতকাল শনিবার রাজধানীর শহীদ আবু সাঈদ কনভেনশন সেন্টারে ‘বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন তিনি। বিএনপির উদ্যোগে গঠিত ‘নিপীড়িত নারী ও শিশুদের আইনি ও স্বাস্থ্যসহায়তা সেল’ বৈঠকের আয়োজন করে।
শিশুদের জন্য নিরাপদ সমাজব্যবস্থা চেয়ে আব্দুল হান্নান মোল্লা বলেন, ‘আমার সম্মান আমাকে ফিরিয়ে দিন। যদি তা না পারেন, তাহলে আপনারা কী দিতে পারবেন? এমন একটা অন্তত সমাজব্যবস্থা দেন, যেই ব্যবস্থায় আর কোনো দিন বাবা-মায়ের বুক খালি হবে না। আর কোনো বাবা-মায়ের সারা জীবনের জন্য কান্নার পথ খোলা থাকবে না। সারা জীবন তারা জিন্দা লাশ হয়ে থাকবে না।’ তিনি আরও বলেন, ঘটনার ১৩ দিন পরও আমার স্ত্রী মানসিক ট্রমায় ভুগছেন। পাশাপাশি তার বড় মেয়েকে নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এ সময় শুধু নিজের মেয়েরাই নয়, সব শিশুকে নিয়েই উদ্বেগ জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে আয়োজক সংগঠনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী অধ্যাপক ডা. মো. রফিকুল ইসলাম জানান, ২০২৬ সালের ১৫ মে পর্যন্ত ৯৩৬ নারী ও শিশু বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ১৩২ শিশু ও ৭৫ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। একই সময়ে ২০৭ নারী ও শিশু হত্যার শিকার হয়েছেন।
শিশুর সুরক্ষায় টাস্কফোর্স চান ডেপুটি স্পিকার : অনুষ্ঠানে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার বলেন, শিশু সুরক্ষার বিষয়টি শুধু সামাজিক সচেতনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। তিনি শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে একটি জাতীয় টাস্কফোর্স এবং ‘ন্যাশনাল কমিশন ফর চাইল্ড প্রোটেকশন’ গঠনের প্রস্তাব দেন। কায়সার কামাল মনে করেন, আইনজীবী, শিক্ষাবিদ, গণমাধ্যমকর্মী, করপোরেট প্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণে একটি সমন্বিত কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যাতে শিশু সুরক্ষাবিষয়ক কার্যকর নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন সম্ভব হয়। শিশু নির্যাতনকারীদের কেন্দ্রীয় তথ্যভা-ার তৈরির গুরুত্বারোপ এবং শিশু নির্যাতনের মামলায় দ্রুত তদন্ত ও দ্রুত বিচার নিশ্চিতে জোর দেন।
অনুষ্ঠানে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমীন বলেন, ‘১০৯৮ শিশু সহায়তা হেল্পলাইনসহ বিভিন্ন সরকারি উদ্যোগ চলমান রয়েছে। পাশাপাশি সাক্ষী সুরক্ষা, দ্রুত বিচার ও ভুক্তভোগীদের আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। বৈঠকে শিশু সুরক্ষায় ১০টি সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এগুলো হলো প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক চাইল্ড প্রোটেকশন পলিসি, জেলা ও উপজেলায় চাইল্ড প্রোটেকশন কেস ম্যানেজমেন্ট ডেস্ক, শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের মামলায় দ্রুত তদন্ত, ফরেনসিক সহায়তা ও দ্রুত বিচার, শিশু হেল্পলাইন ১০৯৮-এর সক্ষমতা বৃদ্ধি, শিশু-সংবেদনশীল গণমাধ্যম নীতিমালা, সেফ টাচ-আনসেফ টাচ ও অনলাইন নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা কর্মসূচি, শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত জাতীয় ডাটাবেজ ইত্যাদি।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিপুণ রায় চৌধুরী, ওজিএসবির সভাপতি অধ্যাপক ফিরোজা বেগম, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি ড. তৌহিদ ইসলাম, ঢামেক হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক কাজী গোলাম মোখলেছুর রহমান, আইনজীবী রাশনা ইমাম, করপোরেট ব্যক্তিত্ব রুবাবা দৌলা প্রমুখ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক মো. রফিকুল ইসলাম।