প্রতিবেশীর বৈরী আচরণ

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে এখন এক অস্বস্তিকর উত্তেজনা। নওগাঁ, লালমনিরহাট, পঞ্চগড় ও চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ একাধিক সীমান্তবর্তী জেলায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ একের পর এক পুশ ইনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে প্রতিটি চেষ্টা রুখে দিচ্ছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বিজিবি। সীমান্ত এলাকায় পুশ ইন ঠেকাতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে তারা। সীমান্তের দুই পাশে এখন সজাগ দৃষ্টি, প্রস্তুত অস্ত্র, টানটান স্নায়ু এ যেন দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে এক নিঃশব্দ সংঘাত রূপ। ‘পুশ ইন’ শব্দটি সীমান্ত ব্যবস্থাপনার পরিভাষায় এমন একটি কার্যক্রমকে বোঝায়, যেখানে এক দেশের নিরাপত্তা বাহিনী কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ছাড়া, জোরপূর্বক অন্য দেশের ভেতরে ঠেলে পাঠিয়ে দেয়। এক দেশের কোনো নাগরিক আরেক দেশে অবৈধ অনুপ্রবেশ করলে, তাকে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও আন্তর্জাতিক আইনকানুন অনুসরণ করে ফেরত পাঠাতে হয়। কিন্তু বিএসএফ সেই নিয়ম মানছে না। সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় বরাবরই ভারতের আচরণ আক্রমণাত্মক। কোনো প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই মানুষকে ঠেলে দেওয়ার এই প্রবণতা শুধু আইনের লঙ্ঘন নয়, এটি মানবিক মর্যাদার চরম অবমাননা।

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, এসব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ভারতের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী রাজ্য থেকে একসঙ্গে একাধিক পয়েন্টে চাপ দেওয়া হচ্ছে। লালমনিরহাট, পঞ্চগড় ও নওগাঁ সীমান্তে ৬০ জনকে বাংলাদেশে পুশ ইনের চেষ্টা করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ। তবে বিজিবি সদস্যদের প্রতিরোধের মুখে তারা বাংলাদেশে আসতে পারেনি। বিজিবির তিস্তা ব্যাটালিয়নের বড়খাতা বিওপির এলাকায় তিনজন পুরুষ ও আটজন নারীকে পুশ ইনের চেষ্টা হয়। আবার ৬৫ নম্বর বিওপির দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় পাঁচজন পুরুষ ও পাঁচজন নারীকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার প্রচেষ্টা চালানো হয়। সব মিলিয়ে ভারতের সঙ্গে সীমান্তের ১১টি পয়েন্ট দিয়ে ১৩৯ জনকে পুশ ইনের চেষ্টা হয়েছে। মাত্র ২৪ ঘণ্টায় বিএসএফের ১০টি পুশ ইনের অপচেষ্টা রুখে দিয়েছে বিজিবি। এই সংখ্যা বলে দেয়, ঘটনা কতটুকু ঘন ঘন ঘটছে। বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৭ মে থেকে চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত বিএসএফ ২ হাজার ৩৪৪ জনকে বাংলাদেশে পুশ ইন করেছে। এই পরিসংখ্যান ভয়াবহ। মাত্র কয়েক মাসে প্রায় আড়াই হাজার মানুষকে জোর করে ঠেলে দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশে। এই চাপের মুখে বিজিবি সীমান্তজুড়ে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে। খবর পেয়ে দ্রুত টহল দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে। পঞ্চগড় জেলার ১৭৭ কিলোমিটার সীমান্তবর্তী এলাকায় টহল জোরদার করার পাশাপাশি, এলাকাবাসীকে মাইকিং করে সতর্ক থাকার অনুরোধ করা হয়েছে।

সীমান্ত এলাকায় যেকোনো ধরনের পুশ ইন ঠেকাতে, বিজিবি সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং স্থানীয়দের সচেতন করতে মাইকিং চালানো হচ্ছে। শুধু সীমান্তে প্রতিরোধ নয়, স্থানীয় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সচেতনতামূলক তৎপরতাও চালাচ্ছে বিজিবি। এটি একটি সমন্বিত ও পরিণত কৌশলের পরিচয়। লালমনিরহাটের পাটগ্রামে আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করে জোরপূর্বক খুঁটি স্থাপনের চেষ্টা চালিয়েছিল বিএসএফ। কিন্তু বিজিবির তাৎক্ষণিক তীব্র আপত্তি ও মাঠপর্যায়ে কঠোর অবস্থানের কারণে শেষ পর্যন্ত অবৈধভাবে বসানো সেই খুঁটি সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে বিএসএফ। এই ঘটনা প্রমাণ করে, বিজিবির দৃঢ়তা সীমান্তে কার্যকর।

বাংলাদেশের প্রতিবাদ ও স্পষ্ট প্রমাণের মুখে ভারত এই পুশ ইনকে স্বীকার করতে নারাজ। সীমান্তে অনেককে পুশ ইন করার অকাট্য প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও, বিষয়টি অস্বীকার করেছে তারা। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল দাবি করেছেন, তারা দ্বিপক্ষীয় চুক্তি এবং আইন মেনে অবৈধ বিদেশি নাগরিকদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাচ্ছে। কিন্তু এই দাবি কতটা গ্রহণযোগ্য? যদি সত্যিই ‘আইন মেনে’ ফেরত পাঠানো হতো, তাহলে কেন রাতের আঁধারে, কাঁটাতারের ফাঁক দিয়ে, নারী-শিশুসহ মানুষদের ঠেলে দেওয়া হচ্ছে? কেন দ্বিপক্ষীয় প্রোটোকল বা কূটনৈতিক চ্যানেল ব্যবহার করা হচ্ছে না? এই প্রশ্নের উত্তর কি ভারতের কাছে আছে?

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া জোরপূর্বক কোনো স্থানে পাঠানো ‘রিফুলমেন্ট’ নীতির লঙ্ঘন। জাতিসংঘের শরণার্থী কনভেনশন এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক চুক্তিতে এ ধরনের জোরপূর্বক বহিষ্কার নিষিদ্ধ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন এবং দুই দেশের বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক চুক্তির পরিপন্থি। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে অনুপ্রবেশকারীদের প্রত্যাবর্তন নিয়ে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক রয়েছে। সেগুলো এড়িয়ে পুশ ইন করা শুধু অবৈধ নয়, এটি প্রতিবেশী সম্পর্কের প্রতিও গভীর অশ্রদ্ধার প্রকাশ। রাতের অন্ধকারে তাদের অপরিচিত ভূখণ্ডে ফেলে দেওয়া মানবতার প্রতি নির্মম আচরণ। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক গত কয়েক বছরে নানা কারণে টানাপড়েনের মধ্যে রয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের মোট দৈর্ঘ্য ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি, ২ হাজার ২১৬ কিলোমিটার সীমান্ত পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে। এই দীর্ঘ সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় পারস্পরিক বিশ্বাস ও সহযোগিতা অপরিহার্য। কিন্তু পুশ ইনের ধারাবাহিক চেষ্টা সেই বিশ্বাসের ভিতকে নাড়িয়ে দিচ্ছে।

অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর জন্য ভারত ও বাংলাদেশ আইনি কাঠামোর পাশাপাশি চুক্তি করলেও, সেসব উপেক্ষা করে পুশ ইন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। আমরা ধারণা করতে পারি, এই উপেক্ষা কূটনৈতিক সৌজন্যের সীমা অতিক্রম করেছে। ভারতের এই আচরণকে অনেকে, দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করে দেখছেন। ভারতে অভিবাসন ইস্যু সংবেদনশীল রাজনৈতিক বিষয়। পাশর্^বর্তী দেশের সঙ্গে পারস্পরিক সম্মান ও সুসম্পর্ক থাকা দরকার।

লেখক : সাংবাদিক ও অপরাধ বিশ্লেষক

rupomnews@gmail.com