এক বছরও হয়নি, দেশের প্রধান বিমানবন্দরে বড় ধরনের অগ্নিকা- ঘটেছিল। মাত্র সাত মাসের মধ্যে একই বিমানবন্দরে গত শুক্রবার আবারও আগুন ‘লাগল’। একই স্থানে, কার্গো এলাকায়। দুটি অগ্নিকান্ড ই ঘটেছে ছুটির দিনে। দেশ রূপান্তরে রবিবার প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, কর্তৃপক্ষ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সর্বশেষ আগুনকে ‘রহস্যজনক’ ও ‘সন্দেহজনক’ মনে করছে। কোনো ঘটনা ঘটলেই যেখানে ‘দুর্ঘটনা’, ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ অথবা ‘অন্তর্ঘাতমূলক কাজ নয়’ বলে দ্রুত চিহ্নিত করার প্রবণতা দেখা যায়, সেখানে কর্মকর্তাদের মনে কিঞ্চিত সন্দেহ আসাকে কি কিছুটা ‘অগ্রগতি’ বলা যাবে? আমরা এমনটা মনে করি না। কারণ, শাহজালাল বিমানবন্দর অত্যন্ত স্পর্শকাতর স্থান। সেখানে কেবল এই দুটি অগ্নিকা-ই ঘটেছে, তা নয়। গত ১৩ বছরে ছোট-বড় কমপক্ষে ৭টি অগ্নিকান্ড ঘটেছে। এর মধ্যে কটি ঘটনার যথাযথ তদন্ত হয়েছে?
২০২৫ সালের ১৮ অক্টোবর এ বিমানবন্দরের কার্গো এলাকায় অগ্নিকাণ্ডে কয়েকশ কোটি টাকার মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দাবি তুলেছিলেন ব্যবসায়ীরা। আবারও কার্গো এলাকার একই শেডে আগুনের ঘটনায় নানা প্রশ্ন সামনে আসছে। এর কারণ হলো, শেডটির অনেক পণ্য নিলামে ওঠার কথা ছিল। তাহলে, আগুনে পুড়িয়ে কেউ কি কিছু লুকাতে চেয়েছে? বিমানবন্দরের প্রতি ইঞ্চি স্থান যেখানে সিসি ক্যামেরার আওতায় থাকার কথা, সেখানে শুক্রবার শেডের যে স্থানে আগুন লাগে, সে স্থানটি ক্যামেরার আওতায় ছিল না! কেন? অনেক ক্ষেত্রে আগুনের কারণ হিসেবে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট ও সিগারেটের আগুনের কথা বলা হয়। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এর কোনোটিই শুক্রবার হয়নি। হঠাৎ দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠেছিল! আশপাশের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ অনুযায়ী, আগুন ছড়িয়ে পড়লে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এক কর্মী সবাইকে জানান। বিমানবন্দরে সারা বছর ২৪ ঘণ্টা সরকারি অন্তত দেড় ডজন কর্তৃপক্ষের লোক দায়িত্ব পালন করেন। আগুন লাগার বিষয়টি তাদের একজনেরও নজরে এলো না!
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস শুক্রবারের আগুনের বিষয়টি তদন্ত করছে। কেউ ইচ্ছে করে আগুন দিয়েছে কি না, তা বের হবে, এমন আশাবাদ কর্তৃপক্ষের। আমরা চাই, শুক্রবারের অগ্নিকা-সহ সব ঘটনার যথাযথ তদন্ত হোক। দোষী ব্যক্তি চিহ্নিত হোক, উপযুক্ত সাজা পাক।
শুক্রবারের আগুনের পর সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তা প্রাথমিক কারণ হিসেবে ‘বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট’ সামনে আনেন। গত বছরও আগুনের কারণ বলা হয়েছে শর্ট সার্কিট। কেন বারবার শর্ট সার্কিট থেকেই আগুন লাগবে? কেন ছুটির দিনই শর্ট সার্কিট হয়! এটা কি ইচ্ছাকৃত, নাকি কারও গাফিলতি? কাদের? তাদের কি চিহ্নিত করা হয়েছে? আগের ঘটনায় কেউ চিহ্নিত হয়ে থাকলে তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? মানুষ এসব প্রশ্নের জবাব চায়।
গত বছরের আগুনের ঘটনায় সরকার-গঠিত একটি তদন্ত কমিটি ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে কয়েকটি সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে আছে বিপজ্জনক রাসায়নিক ও ঝুঁকিপূর্ণ পণ্যের গুদাম যথাযথ আন্তর্জাতিকমানের স্থাপনায় স্থানান্তর করা, বিমানবন্দরের রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম থেকে সিএএবি-ও নিয়ন্ত্রক ভূমিকা পৃথক করা, বিমানবন্দরের জন্য একটি বিশেষ অগ্নিনির্বাপণ কেন্দ্র স্থাপন। সুপারিশগুলো বাস্তবসম্মত কি না, তা কি কেউ যাচাই করে দেখেছে? বাস্তবসম্মত হলে বাস্তবায়নে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে?
একটি অগ্নিকান্ডকে উপলক্ষ করে আমরা এ বিষয়গুলো সামনে আনছি, কারণ সাধারণভাবে, বিমানবন্দরে সেবা, নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধা কতটা মানসম্মত, তা থেকে দেশ-বিদেশের মানুষ ধারণা পেতে পারেন রাষ্ট্রটি কেমন চলছে। কিন্তু দেশের প্রধান বিমানবন্দরসহ সব বিমানবন্দরে সেবা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার মান নিয়ে আমরা যারপরনাই উদ্বিগ্ন। অব্যবস্থাপনা ও লাগেজ কাটা থেকে শুরু করে যাত্রী হয়রানিসহ অনেক অভিযোগ আছে। আমরা চাই শাহজালাল বিমানবন্দর দ্রুত এসব অভিযোগ-মুক্ত হোক। যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের নির্ভরযোগ্য স্থাপনা হয়ে উঠুক।
