বিশ্ব রক্তদাতা দিবস

স্বেচ্ছায় রক্তদানে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ গড়তে পারে তরুণরাই

প্রতি বছর ১৪ জুন বিশ্বজুড়ে বিশ্ব রক্তদাতা দিবস পালিত হয়। স্বেচ্ছায় রক্তদানকারী মহৎপ্রাণ ব্যক্তিদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং নিরাপদ রক্ত ব্যবহারে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০০৫ সাল থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দিবসটি উদযাপনের উদ্যোগ নেয়। রক্তদাতা দিবস হিসেবে ১৪ জুন নির্ধারণের কারণ হলো, এটি বিজ্ঞানী কার্ল ল্যান্ডস্টেইনারের জন্মদিন। এই মহান বিজ্ঞানীই রক্তের গ্রুপ (অ, ই, অই, ঙ) আবিষ্কার করে রক্তদান ও গ্রহণ ব্যাপারটি সহজ করে লাখ লাখ মানুষের জীবনে বাঁচাতে ভূমিকা রেখে চলেছেন।

বাংলাদেশে প্রতি বছর আট থেকে দশ লাখ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়। এই রক্তের সিংহভাগ আসে পেশাদার রক্তদাতার কাছ থেকে। ফলে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন রোগী। অথচ সমাজে রক্তদান সম্পর্কে সচেতনতা একটু বৃদ্ধি পেলেই স্বেচ্ছায় রক্তদাতার নিরাপদ রক্তে বাঁচতে পারে লাখো জীবন। এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে তরুণদেরই। কারণ তারুণ্যেই একজন মানুষ সুস্থ ও স্বাস্থ্যবান থাকেন। তবে ১৮ থেকে ৬৫ বছরের নির্দিষ্ট ওজনের যেকোনো নারী-পুরুষই রক্তদান করতে পারেন।

এগিয়ে আসছে তরুণরা

রক্তদান নিয়ে এখন তরুণদের মাঝে ভীতি কমেছে, বেড়েছে আগ্রহ। যুগে যুগে কালে কালে সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনের নেপথ্যশক্তি হিসেবে তরুণদের অবদানই যে মুখ্য ছিল, তা আমরা সবাই জানি।

বাংলাদেশেও পেশাদার রক্তদাতাদের দৌরাত্ম্যে রোগীদের নাকাল হওয়ার যুগের অবসান ঘটিয়ে স্বেচ্ছায় রক্তদানের সংস্কৃতির যে উত্থান, এর মূল চালিকাশক্তি হিসেবেও কাজ করেছে তারুণ্যের এই শক্তি। সুস্থ

থাকলে এখন তরুণদের একটা বড় অংশই আগ্রহী প্রয়োজনে রক্তদান করতে।

রক্তদানের উপকারিতা

রক্তদানের শারীরিক মানসিক উপকারও কিন্তু কম নয়। রক্ত সংগ্রহে যিনি কাজ করেন, তার তো যোগাযোগ বাড়ে, পাশাপাশি দাতা-গ্রহীতার যে আত্মিক বন্ধন তৈরি হয়, তা এক অবিচ্ছেদ্য চিরস্থায়ী বন্ধন। এই বন্ধন একজন তরুণকে উদ্বুদ্ধ করে, পরিণত বয়সেও সমাজ ও দেশের প্রতি তার দায়িত্বগুলো সচেতনভাবে পালনে।

হৃদরোগের ঝুঁকি কমে

রক্তদানের মাধ্যমে শরীরে যে আয়রনের ঘাটতি হয়, তাতে মূলত একজন তরুণ দুভাবে উপকৃত হন।

প্রথমত, শরীরের অতিরিক্ত আয়রন বের হয়ে যাওয়ার ফলে দীর্ঘমেয়াদে একজন তরুণের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমে। এ নিয়ে আমেরিকান জার্নাল অব এপিডেমোলজিতে প্রকাশিত একটি গবেষণা নিবন্ধ আছে।

১৯৯৮ সালে ফিনল্যান্ডে প্রায় ২,৮৬২ জন মধ্যবয়সী পুরুষের ওপর করা একটি জরিপ বলছে, যারা নিয়মিত রক্তদান করেছেন তাদের হার্ট অ্যাটাক (myocardial infarction) হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কম। গবেষকরা দেখেছেন, এর একটি বিশেষ কারণ রক্তদানের ফলে শরীরের অতিরিক্ত আয়রন কমে যাওয়া।

দ্বিতীয়ত, শরীরে আয়রনের যে ঘাটতি হয়, তা পূরণ করার জন্য অস্থিমজ্জা রক্তকণিকার উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়। নতুন রক্তকণিকা দেহে নতুন উদ্দীপনা নিয়ে আসে। ফলে রক্তদাতার সুস্থতার পরিমাণ বাড়ে।

রক্তের অপচয় রোধ

রক্তদানের মাধ্যমে রক্তের অপচয় রোধেও তরুণরা সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারেন। আমাদের রক্তে যে লোহিত রক্তকণিকা থাকে এর আয়ু হচ্ছে চার মাস। এ সময়ের মধ্যেই শরীরের রক্তকণিকাগুলো মরে গিয়ে নতুন কণিকা তৈরি হয়। যখন একজন তরুণ চার মাস পরপর নিয়মিত রক্তদান করছেন, তার এই রক্তকণিকাগুলো মারা যাওয়ার আগে অন্য নতুন দেহে গিয়ে প্রাণ সঞ্চার করছে।

বিনামূল্যে রক্ত পরীক্ষা

রোগীর শরীরে রক্ত যাওয়ার আগে তা ডঐঙ নির্ধারিত ৫টি টেস্টে (এইচআইভি, ম্যালেরিয়া, সিফিলিস, হেপাটাইটিস বি ও সি) নেগেটিভ এবং থ্রি ফেজ ক্রস ম্যাচিংয়ে রোগীর দেহের রক্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রচলিত ভাষায়, একই গ্রুপের ব্লাড। এ পরীক্ষাগুলোতেও নিয়মিত রক্তদাতাদের একটা সুবিধা হয়, রক্তের বিশুদ্ধতা পরীক্ষা হয়ে যায়। হেমোগ্লোবিন লেভেল ঠিক আছে কিনা, জানা হয়ে যায়।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের হেপাটোলজি বিভাগের অধ্যাপক প্রফেসর ডা. মো. শাহিনুল আলম বলেন, কোয়ান্টাম স্বেচ্ছায় রক্তদান কার্যক্রমের মতো উদ্যোগে স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের নিয়মিত রক্তদানের কারণে বাংলাদেশে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে রোগীদের সংক্রমিত হওয়ার হার ১০-১১% থেকে কমে ৫.১%-এ নেমেছে। হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার প্রবণতা এখন অত্যন্ত নিম্নগামী। এর পুরো কৃতিত্ব বিশুদ্ধ রক্ত রোগীকে দেওয়ার জন্য কাজ করা নিবেদিতপ্রাণ স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের।

অর্থাৎ তরুণ রক্তদাতাদের সচেতনতার প্রয়োজনীয়তা এখানেই। নিরাপদ ও বিশুদ্ধ রক্ত রোগীকে দেওয়ার ব্যাপারে তরুণদের উদ্যোগ যত সম্প্রসারিত হবে, গোটা স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় তত এর প্রভাব পড়বে। আর তরুণ রক্তদাতাদের শারীরিক মানসিকভাবে উপকৃত হয়ে সুনাগরিক হওয়ার সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পাবে।