বই পড়তে পড়তেই পাহাড়কে ভালোবাসা। সেই ভালোবাসার পাহাড়কে ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগে ভর্তি হন নুরুননাহার নিম্নি। সেই স্বপ্ন পূরণ হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষেই। শিক্ষাসফরে চন্দ্রনাথ পাহাড়ে গিয়ে বুঝতে পারেন পর্বতারোহণই হলো সেই লক্ষ্য, যার জন্য তিনি স্বীকার করতে পারেন যেকোনো ত্যাগ। তারপর দেশ ও বিদেশের নানা পর্বতে আরোহণ করেছেন। ততদিনে নিজেকে শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে শুরু করেছেন বিশে^ সর্বোচ্চ চূড়া স্পর্শ করার জন্য। নিলেন প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ। অবশেষে বাংলাদেশের তৃতীয় নারী পর্বতারোহী হিসেবে স্পর্শ করলেন এভারেস্টের চূড়া। দীর্ঘ দুই দশকের নিরলস পথচলার সেই গল্প শুনিয়েছেন উদয়কাঠীকে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এনাম-উজ-জামান
পাহাড় আর অভিযানের প্রতি আপনার আগ্রহের শুরুটা কীভাবে হয়েছিল?
আগ্রহটা বই পড়ার মাধ্যমেই হয়েছে। আমি ছোটবেলা থেকেই, একটি নির্দিষ্ট স্থানে আবদ্ধ থাকতে পছন্দ করতাম না। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগে আমি কখনো রংপুরের বাইরে আসিনি। আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আগের পড়াশোনা সবই রংপুরে। আমার জগৎ ছিল বইয়ের জগৎ। সমরেশ মজুমদারের বই পড়তে পড়তে জলপাইগুড়ির
প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়। তখন মনে হতো, একটি পাহাড় কি আমি নিজের চোখে দেখতে পারব না? শুধু পাহাড় না, আমার ট্রেন দেখারও ভীষণ আগ্রহ ছিল। রংপুর শহরে তো ট্রেন দেখার সুযোগ ছিল না। তাই যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ এলো তখন দেখে দেখে এমন একটি বিভাগ নির্বাচন করলাম যেটিতে পড়লে পাহাড়ের এমন স্থানে যাওয়ার সুযোগ আছে যেখানে কেউ যেতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুবাদেই বিভিন্ন পাহাড়ে ঘোরাঘুরির শুরু।
এভারেস্ট জয়ের স্বপ্ন প্রথম কবে দেখেছিলেন?
শুরুতে আমি ভাবিনি একদিন আমিও এভারেস্টে যাব। আমি ট্র্যাকিং করতে চেয়েছি। বইপড়া থেকে পাহাড়কে জানা। পাহাড়কে দেখার পরে পাহাড়কে ভালোবাসা। এরপর থেকে আমি শুধু পাহাড়ে কাছে যেতে চেয়েছি। ট্রেকিং করেও যখন পাহাড়ের বেশি কাছে যেতে পারছিলাম না তখন ভাবলাম একটা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হবে। সে চিন্তা থেকেই হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট থেকে বেসিক প্রশিক্ষণটি গ্রহণ করি। সেখানে আমি শিখলাম ডিভাইসগুলোতে বিশ্বাস করা। জুতার নিচে যে ক্রাম্পন পরি, পাহাড়ে চড়তে রোপ ব্যবহার করি সেগুলোতে যখন বিশ্বাস করতে শুরু করলাম বন্ধুর মতো, তখন আমার মধ্যে বিশ্বাস জন্মাল, আমিও পারব (এভারেস্টে আরোহণ করতে)।
আপনার জীবনের কোন মানুষ বা ঘটনা আপনাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছে?
খুব অবাক করা ব্যাপার হলো, আমি জানতাম না আমার বাড়ির কাছে থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। আমার পরিধি আসলে খুব ছোট ছিল। স্কুল, বন্ধুদের বাড়ি সবই ছিল আশপাশে। কলেজের পরে যখন রংপুরেই পড়াশোনার সিদ্ধান্ত হলো, তখন আমি মেনে নিইনি। তাহলে তো আমার সবই রংপুরের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। একটা কথা আছে না ঢাকা বিশ্ববিদালয়ের করিডর দিয়ে হাঁটলেও অনেক কিছু শেখা যায়? আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডর, সবুজ চত্বর, রাস্তা এসব থেকে অনেক কিছু শিখেছি। এই মুক্ত পরিবেশ আমাকে নিজেকে চিনতে শিখিয়েছে, স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে।
এভারেস্ট অভিযানের জন্য নিজেকে কীভাবে প্রস্তুত করেছেন?
আমি পূবালী ব্যাংক পিএলসির জেনারেল ব্যাংকিং বিভাগে প্রিন্সিপাল অফিসার হিসেবে কর্মরত আছি। আমাকে কিন্তু দশটা-ছয়টা অফিস করতে হয়েছে। সে জন্য প্রতিদিন পাঁচটায় উঠে রমনায় আসতে হয়েছে। প্রচ- শীতের দিনে, দুর্বিষহ গরমের দিনে, ঝড়-বৃষ্টি সবকিছুর মধ্যে প্রতিদিন আমি রমনায় এসেছি। এখানেই আমি একুশ কিলোমিটার দৌড়িয়েছি, বিয়াল্লিশ কিলোমিটার দৌড়িয়েছি। এই রমনার প্রতিটি গাছপালা আর মানুষ আমার প্রশিক্ষণের সাক্ষী। রমনা থেকে বাসায় ফিরে রেডি হয়ে লাঞ্চ নিয়ে যেতাম অফিসে। অফিস শেষে মতিঝিলে অফিসের পাশের জিমে যেতাম। তাদের আমি বলেছিলাম, আমি এভারেস্টে যেতে চাই। আমাকে যেন সেভাবে ট্রেনিং করানো হয়। বাসায় ফিরে ফ্রেশ হয়ে আবার ইয়োগা করতাম, প্রাণায়াম করতাম। আমার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এই প্রস্তুতির মধ্য দিয়েই যেত। খাওয়া-দাওয়াটাও খুব মেনে করতাম। সবকিছু খেতাম না। নিয়ম মেনে, ডায়েট ফলো করে খাওয়া-দাওয়া করতাম। এসবই প্রস্তুতির অংশ।
শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতির মধ্যে কোনটিকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন?
মানসিক প্রস্তুতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ যাওয়ার আগে। মানসিক প্রস্তুতি না থাকলে যাওয়াই হবে না। মানসিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়ে গেলে তখন শারীরিক প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করতে হয়। আর শারীরিক প্রস্তুতি না নিয়ে যাওয়া যায় না।
এভারেস্ট অভিযানের আগে কোন কোন পর্বত আরোহণের অভিজ্ঞতা আপনার কাজে এসেছে?
সব পর্বতারোহণের অভিজ্ঞতা কাজে এসেছে, তবে গত বছর আমি একটা সাত হাজার একশ ছাব্বিশ মিটারের পর্বত আরোহণ করি যেটার নাম হিমলুং হিমাল। সেটার যে স্ট্রাকচার ও আবহাওয়া ছিল এভারেস্টের উচ্চতা ও আবহাওয়া কমবেশি একই রকম, তবে ব্যাপ্তিটা বিশাল। আমার প্রথম ছয় হাজার পর্বতাভিযান ফার্চামো, সেটা কিন্তু ব্যর্থ হয়েছিল। আমি ওটার চূড়ায় পৌঁছতে পারিনি। এটা আমি কখনই ভুলতে পারি না। আমার সবসময় মনে পড়ে, প্রথমটা কিন্তু ব্যর্থ হয়েছিল। আমাকে এগোতে হবে।
অভিযানের সময় সবচেয়ে ভয়ংকর বা ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি কী ছিল? হাল ছেড়ে দেওয়ার কথা কি একবারও মনে হয়েছিল? সে অবস্থা থেকে উত্তোরণ ঘটালেন কীভাবে?
হাল ছেড়ে দেওয়ার কথা মনে হয়নি। কিন্তু ভয়ের একটা মুহূর্ত ছিল সামিট ডে-তে। চূড়া থেকে মাত্র ৪০০ মিটার যখন দূরে আমি, তখন হঠাৎ আমার ক্রাম্পন খুলে গেল। আমার শেরপা যিনি ছিলেন তিনি তখন আমার থেকে অনেক দূরে। আমি চিৎকার করছি কিন্তু তিনি শুনতে পারছেন না। পরে জানতে পারলেন আমার ক্রাম্পন ছিঁড়ে গেছে। আমাকে ওপরে যেতে বললেন। আমি রাজি হচ্ছিলাম না। উনি তখন বললেন, না দেখলে তো উনি কিছু করতে পারবেন না। তা ছাড়া ক্রাম্পন ছাড়া তো আমি নিচেও নামতে পারব না। এভাবে ওপরে উঠতে আমাকে সাহস দিলেন। পরে যখন তার সঙ্গে আমার দেখা হলো, তিনি দেখলেন আমার ক্রাম্পন খুলে যায়নি, ছিঁড়ে গেছে। এত উঁচুতে আমি ক্রাম্পন ছাড়া কীভাবে যাব এসব ভেবে আমি কেঁদে দিলাম। পরে উনি একটা ঝুলতে থাকা রোপ থেকে দড়ি কেটে আমার ক্রাম্পন বেঁধে দিলেন। যে কারণে আমার সামিট হলো।
এভারেস্টের চূড়ায় দাঁড়িয়ে প্রথম কী অনুভব করেছিলেন?
আমি এভারেস্টের চূড়ায় উঠিনি। চূড়াটা স্পর্শ করেছি। ওটা এত বড় আর বিশাল যে, ওটার ওপরে ওঠা আমার কাছে ঠিক মনে হয়নি। আমরা যখন সামিট করলাম তখন সূর্য উঠছে। আমরা সূর্যকে উঠতে দেখলাম। সে এক অসাধারণ মুহূর্ত।
পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সূর্যোদয় মনে হলো সেটি আমার কাছে। সেই উচ্চতায় আকাশছোঁয়া যায়। আকাশটা একটু ছুঁয়ে দেখলাম। এই অনুভূতি আসলে বর্ণনা করা যায় না।
বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানোর মুহূর্তটি কেমন ছিল?
আমার জীবনের সবচেয়ে গৌরবের মুহূর্ত। আমার মনে হয়েছিল, এই দেশটার জন্য আমিও কিছু একটা করলাম। আমার দেশের পতাকাকে সর্বোচ্চ উচ্চতায় নিয়ে এলাম। আমার মনে হচ্ছিল শুধু আমি না, আমার দেশের সব মানুষ এভারেস্টের চূড়ায় এসেছে।
অর্থায়ন বা স্পন্সর সংগ্রহের ক্ষেত্রে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ ছিল?
আমি খুব সৌভাগ্যবান যে, আমাকে স্পন্সর সংগ্রহের জন্য তেমন কোনো সংকটে পড়তে হয়নি। আমি পূবালী ব্যাংক পিএলসিতে কর্মরত আছি। আমার অভিযানের স্পন্সরও তারাই। তারা ঘরের মেয়েকে এভারেস্টে পাঠিয়েছিল।
বাংলাদেশের মেয়েদের জন্য আপনার কী বার্তা থাকবে?
সবাইকে এভারেস্টের চূড়ায় আসতে হবে না। আমাদের সবার জীবনে এভারেস্টের চূড়া আছে। সেটি জয় করতে হবে। নিজের জীবনটা নিজের মতো, নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী বাঁচতে হবে।
পরিবার আপনার এই যাত্রায় কতটা সহযোগিতা করেছে?
পরিবার তো অবশ্যই সহযোগিতা করেছে। পরিবারের সহযোগিতা ছাড়া কেউ বড় লক্ষ্য জয় করতে পারে না।
তরুণদের উদ্দেশ্যে আপনি কী বলবেন?
স্বপ্ন বড় দেখতে হবে। দেশকে ভালোবাসতে হবে। বড় স্বপ্নটা যেন দেশের সঙ্গে সংযুক্ত হয়। স্বপ্ন দেখতে কার্পণ্য করা চলবে না। বড় বড় স্বপ্ন দেখতে হবে।
এভারেস্ট আপনাকে একজন মানুষ হিসেবে কী শিখিয়েছে?
এভারেস্ট আমাকে শিখিয়েছে আমরা প্রকৃতির সামনে কত ক্ষুদ্র সেটা উপলব্ধি করতে। এভারেস্ট কী বিশাল, তার সামনে আমরা কতটুকু! অথচ আমাদের অহমিকা, ইগো, দম্ভ যেন এভারেস্টের থেকেও বিশাল!
