উপকূলের কথা বলেন যিনি

আপডেট : ০৮ জুন ২০২৬, ০৭:২৪ এএম

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও। এ অঞ্চলের মানুষের জীবনসংগ্রামের গল্পগুলো তুলে ধরতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছেন সাতক্ষীরার তরুণ জলবায়ু কর্মী এসএম শাহীন আলম। উপকূলের দুঃখ-দুর্দশা, মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের বাস্তব চিত্র দেশ-বিদেশে তুলে ধরে তিনি পরিচিত হয়েছেন ‘উপকূল এক্সপ্রেস’ নামে। তরুণ এই জলবায়ু কর্মীর কাজ ও সংগ্রাম নিয়ে লিখেছেন শরিফুল ইসলাম রিফাত

উপকূলেই বেড়ে ওঠা

উপকূলে জন্ম, সাতক্ষীরার দ্বীপ ইউনিয়ন পদ্মপুকুরে বেড়ে ওঠা শাহীন আলমের। ছোটবেলা থেকেই প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে যুদ্ধ করে বড় হয়েছেন তিনি। আইলা, আম্ফান, বুলবুলসহ অসংখ্য ঘূর্ণিঝড়ের সাক্ষী এই তরুণ। কখনো ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য খাবার পানির ব্যবস্থা করেছেন, কখনো শিশুদের জন্য নিয়ে গেছেন পুষ্টিকর খাবার ও খেলনাসামগ্রী। গর্ভবতী নারীদের জন্য পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করেছেন, আবার অবহেলিত কিশোরীদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন স্যানিটারি ন্যাপকিন। উপকূলবাসীর কষ্টকে নিজের কষ্ট মনে করেই মানুষের কল্যাণে কাজ করে গেছেন তিনি।

জলবায়ু সংকটের কণ্ঠস্বর

উপকূলের অস্বাভাবিক পরিবেশই তাকে একজন জলবায়ু কর্মী হিসেবে গড়ে তুলেছে। শুধু মানবিক সহায়তা নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা উপকূলবাসীর কথাও নিয়মিত তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন শাহীন আলম। তার বিশ্বাস, নিজেদের কথা নিজেদেরই বলতে হবে। এ বিষয়ে শাহীন বলেন, ‘এটা উপলব্ধি করতে পারি যে, আমরা নিজেরা না দাঁড়ালে কেউ আমাদের পক্ষে লড়বে না।’

বর্তমানে তিনি পরিবেশবাদী সংগঠন ইয়ুথনেট ফর ক্লাইমেট জাস্টিসের ঢাকা বিভাগীয় সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করছেন। পাশাপাশি গণ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান ও সমাজকর্ম বিভাগে অষ্টম সেমিস্টারে পড়াশোনা করছেন।

বৃক্ষরোপণ, বাঁধ নির্মাণ ও স্কুল পরিচালনা

শুধু জলবায়ু সংকট নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিই নয়, এ সমস্যা থেকে উত্তোরণের জন্য কাজও করছেন। কখনো বাঁধ নির্মাণ, কখনো বৃক্ষরোপণ, আবার কখনো শিশুদের স্কুল পরিচালনার মাধ্যমে। গত বছর বর্ষা মৌসুমে তারা উদ্যোগ নিয়েছিলেন দেশের ৬৪ জেলায় বৃক্ষরোপণ করার। এ উদ্যোগে তারা কোনো একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তির নামে গাছটি রোপণ করেন। এর ফলে ওই ব্যক্তি গাছটির পরিচর্যা করেন আন্তরিকভাবেই। এভাবে ৬৪ জেলায় ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ রোপণ করেছেন তারা। এ ছাড়াও সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকাগুলোতে চর বনায়নের কাজ করছেন তারা। উপকূলীয় অঞ্চলে পরিবেশ রক্ষা এবং বাঁধ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত বা ভেঙে না যায়, সে বিষয়টিও মাথায় রেখে এই কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

বিশ্বমঞ্চে উপকূলের প্রতিনিধিত্ব

কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পা রাখা শাহীনের কর্মপরিধিও বেড়েছে সময়ের সঙ্গে। এরই অংশ হিসেবে ২০২৪ সালে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের ব্যাজ নিয়ে ন্যাচার কনজার্ভেশন ম্যানেজমেন্টের (ন্যাকম) অর্থায়নে কপ-২৯ এ অংশ নিয়েছিলেন তিনি।

আগামী ১১ থেকে ২২ নভেম্বর আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনে অংশ নিয়ে জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত সাতক্ষীরা উপকূলের মানুষের কথা তুলে ধরবেন শাহীন। এটিকে শুধু অংশগ্রহণ হিসেবে না দেখে বরং দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এলাকার সংকটের গল্প বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার একটি বিরাট সুযোগ হিসেবে দেখতেই আগ্রহী শাহীন।

পরিবেশবাদী সংগঠন ইয়ুথনেট ফর ক্লাইমেট জাস্টিসের খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করা ২৪ বছরের এই তরুণ মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সাতক্ষীরা উপকূলীয় অঞ্চল ধীরে ধীরে বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে।

শাহীন বলেন, ‘এটা এখন বাঁচা-মরার লড়াই। এই সম্মেলনে বিশ^নেতাদের সামনে আমাদের পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে দাবি একটাই উন্নত দেশগুলো যেন তাদের অতীতের ভুলগুলোর মাশুল আমাদের ওপর চাপিয়ে না দেয়।’

শাহীন আলমের স্বপ্ন, উপকূলের শিশুরা জন্মের পর থেকেই যেন মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা পায়। উপকূলের মানুষকে যেন আর বাস্তুচ্যুত না হতে হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত