দেশের একাধিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে হিমশিম খাচ্ছে। এ পরিস্থিতি আরও বিস্তৃত হলে তা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। তারা বলেছেন, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, অর্থপাচার রোধ এবং ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থা জনগণের সামনে তুলে ধরা এখন সময়ের দাবি। কৃত্রিমভাবে ইতিবাচক চিত্র উপস্থাপন করলে দীর্ঘমেয়াদে সংকট আরও তীব্র হবে।
গতকাল রবিবার ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত ‘ব্যাংক খাতে সুশাসন ও গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলা হয়। সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক মো. এজাজুল ইসলাম, পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ, ঢাবির সাবেক সহ-উপাচার্য সায়েমা হক বিদিশা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক মো. মশিউর রহমান প্রমুখ।
ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সমকালের বিশেষ প্রতিনিধি ওবায়দুল্লাহ রনি এবং প্রথম আলোর সিনিয়র রিপোর্টার সানাউল্লাহ সাকিব।
তারা বলেন, স্বাধীনতার পর ৭৮৬ কোটি টাকার বাজেট থেকে বাংলাদেশ বর্তমানে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রণয়নের সক্ষমতা অর্জন করেছে। এই দীর্ঘ অর্থনৈতিক যাত্রায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের প্রধান উৎস ছিল ব্যাংকিং ব্যবস্থা। কারণ পুঁজিবাজার ও বন্ড বাজার এখনো অর্থনীতির চাহিদা অনুযায়ী শক্তিশালী বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি। এছাড়া কয়েকটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম, ঋণ কেলেঙ্কারি এবং অর্থ পাচারের ঘটনায় মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মূল প্রবন্ধে আরও বলা হয়, রিজার্ভ চুরি, বড় ঋণ কেলেঙ্কারি, ব্যাংক দখল, পুনঃতফসিলের অপব্যবহার এবং খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্রসহ বিভিন্ন বিষয়ে গণমাধ্যম ধারাবাহিকভাবে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এর মাধ্যমে আর্থিক খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতি উন্মোচিত হওয়ার পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং নীতিনির্ধারকদের ওপর জবাবদিহির চাপ তৈরি হয়েছে।
অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নুরুন নাহার খানম বলেন, সুশাসনের ঘাটতির কারণেই দেশের ব্যাংক খাত ভঙ্গুর অবস্থায় পৌঁছেছে। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতের অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ নয়ছয়ের ঘটনা জনসমক্ষে তুলে ধরতে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
এই ডেপুটি গভর্নর বলেন, ব্যাংকের অধিকাংশ অর্থই আমানতকারীদের। তারা আস্থার ভিত্তিতে ব্যাংকে অর্থ জমা রাখেন। কিন্তু ব্যাংকগুলো অতিরিক্ত ঋণ বিতরণ করলে বা ঋণ যথাযথভাবে আদায় করতে না পারলে তার প্রভাব পড়ে তারল্য সংকটে। তখন আমানতকারীরা নিজেদের অর্থ তুলতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়েন।
ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ মাহমুদুর রশীদ বলেন, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও যেসব ব্যাংক সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পেরেছে, তারা তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে।