লক্ষ্য অর্থনীতি পুনরুদ্ধার স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব তৈরি করেছে সরকার। যেখানে ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধারকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানিয়েছেন, দেশের অর্থনৈতিক পরিবর্তনে সরকারের এই যাত্রা কোনো গোষ্ঠীর বিশেষ সুবিধার ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং দেশের প্রতিটি নাগরিকের উৎপাদনশীল শক্তির ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা হবে। আমাদের এ ভিশনের কেন্দ্রে রয়েছে অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন। যেখানে অর্থনীতি হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, অংগ্রহণমূলক এবং সরবার জন্য উন্মুক্ত। গতকাল সোমবার দেশ রূপান্তরকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, সরকারের পরিকল্পনা হচ্ছে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার; স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়া।

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, আমরা বলছি যে সরকারের আদর্শিক ভিত্তি হচ্ছে অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন। অর্থাৎ সবার আগে যেমন বাংলাদেশ, তেমনি সবার জন্য বাংলাদেশ। এটা হচ্ছে বর্তমান সরকারের অর্থনৈতিক দর্শন। এবং সেই দর্শনের আলোকে আমরা সংকট উত্তরণের নতুন মডেলের কথা বলছি। আমরা মনে করছি, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে অর্থনীতির গতিপ্রাপ্তি ঘটবে এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন (১ লাখ কোটি) ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করা হবে। এই বিশাল মাইলফলক অর্জনের জন্য বর্তমানে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক কাঠামো সংস্কার, শিল্প খাতের বিকাশ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। 

প্রথমত, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার। দ্বিতীয়ত, স্থিতিশীলতা এবং তৃতীয়ত, সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়া। এক্ষেত্রে ‘থ্রি আর’ পদ্ধতিতে আমরা সে দিকে যাচ্ছি। সে ক্ষেত্রে বর্তমান বাস্তবতাকে স্বীকার করে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কৌশল ঠিক করা হচ্ছে। অতীতে অর্থনীতির ক্ষেত্রে এমন সংস্কৃতি ছিল না। এখন অস্বীকৃতির সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে চ্যালেঞ্জগুলো আমরা জানতে চাই, অতিক্রমের উপায় বুঝতে চাই এবং সেই অনুযায়ী কৌশল এবং সেই অনুযায়ী খাতসংশ্লিষ্টদের ইনস্ট্রুমেন্টগুলো (সমাধান) দেওয়া হচ্ছে। সরকার বড় করপোরেটকে বিশেষ গুরুত্ব দেবে আর ছোটদের গুরুত্ব দেবে না, এমনটি হবে না। অবস্থানভিত্তিক সবার জন্য সমান সুবিধা রাখা হচ্ছে। কারণ আমরা জানি যে, বিনিয়োগ দরকার। বিনিয়োগ থেকে উৎপাদন হওয়া দরকার। উৎপাদন থেকে কর্মসংস্থান হওয়া দরকার। আর এটি গড়ে উঠলে কর হার না বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বাড়ানো সম্ভব হবে। তখন আমাদের পক্ষে জনমনের আকাক্সক্ষাগুলো, যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় আরও বাড়ানো এবং কার্যকরী ব্যয় বাড়ানো সম্ভব হবে।

এই মডেলকে (পদ্ধতি) আমরা কীভাবে বাস্তবায়ন করছি, তা বোঝার জন্য ইতিমধ্যেই ১৮০ দিনের কর্মসূচির মাধ্যমে অনেকগুলো বিষয়ে কাজ চলমান রয়েছে। এ ছাড়া নতুন অর্থবছরের জন্য সরকারের কৌশলগুলো মাননীয় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী ১১ জুন জনগণের কাছে অর্থাৎ জনগণের প্রতিনিধিদের কাছে সংসদে উত্থাপন করবেন।

বিনিয়োগ পরিস্থিতির বিষয়ে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমরা লক্ষ্য করেছি, পাঁচটি বিষয়ের কথা সংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করেন। প্রথম হচ্ছে নীতির ধারাবাহিকতা। অর্থাৎ একজন বিনিয়োগকারী বিনিয়োগ করতে পারেন, যদি তিনি ন্যূনতম পাঁচ বছরের জন্য পরিকল্পনা করতে পারেন। বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় যেকোনো বিনিয়োগকারী বলেন, সরকারের বিভিন্ন টেবিলে (দপ্তরে) ঘুরে বেড়াতে হয়। অর্থাৎ যেটাকে সাংবাদিকতার ভাষায় বলা হয় লালফিতার দৌরাত্ম্য। সে ক্ষেত্রে কীভাবে বিনিয়োগকে ব্যবসাবান্ধব করা হবে, তার পরিষ্কার বাস্তবায়নযোগ্য পদ্ধতিগুলো আমরা বাজেটে উল্লেখ করব।

তৃতীয়ত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমরা যেটা শুনি, পণ্যের বহুমুখীকরণ করতে হবে। উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এর জন্য অভ্যন্তরীণ এবং রপ্তানি পর্যায়ে সুবিধা বাড়াতে হবে। আমরা দেশীয় ও রপ্তানি পর্যায়ে সবার জন্যই সমান সুবিধা রাখব।

চতুর্থ আমাদের অনেকগুলো বন্ধ কল কারখানা আছে, সেগুলো চালু করতে হবে। ইতিমধ্যেই আপনারা লক্ষ্য করেছেন ৬০ হাজার কোটি টাকার একটা রিকভারি কনস্ট্রাকশন প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে নির্ধারিত সুদে ঋণ পাওয়া যাবে। যেখানে সরকার ভর্তুকি দেবে। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন বজায় থাকবে, অন্যদিকে উদ্যোক্তারা তাদের বন্ধ কারখানা চালু করতে পারবেন। সে আলোকে প্যাকেজ তৈরি করা হচ্ছে। এ ছাড়া তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ৬০০ কোট টাকার অর্থায়ন প্যাকেজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।

পঞ্চমত বিনিয়োগকারীরা মনে করেন যেটা খুবই দরকার, সেটি হচ্ছে আমাদের আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়নের বিষয়ে এর আগে উল্লেখ করেছি।

শিল্পায়নের বিষয়ে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, বর্তমানে যে সমস্যা আমরা জানি, তা হচ্ছে শিল্পের বহুমুখীকরণ হয়নি। দ্বিতীয়ত হচ্ছে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো যাচ্ছে না। তৃতীয়ত প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা। এর সমাধানে আমরা কয়েকটি খাতকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে বিবেচনা করেছি এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আমরা যদি খেয়াল করি, উত্তরাঞ্চলে পাঁচটি ক্ষেত্রে উদ্বৃত্ত আছে। প্রথম হচ্ছে অঞ্চলটিতে ফসলের উদ্বৃত্ত হয়, ফলে উদ্বৃত্ত হয়, ফুলে উদ্বৃত্ত হয়, দুগ্ধজাত পণ্যে উদ্বৃত্ত হয় এবং পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে। সে জন্য উত্তরাঞ্চলে কৃষি এবং কৃষিজাত পণ্যের যাতে মূল্য সংযোজন বাড়ে, সেই লক্ষ্যে দেশীয় বিনিয়োগকারীদের সুবিধা দেওয়ার ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আইএমএফ আমাদের বলে একই হারে ভ্যাট দিতে হবে। আমরা তাদের বলেছি, যদি সব পণ্যের ক্ষেত্রে একই হারে ভ্যাট আরোপ করা হয় তাহলে ১ কোটি ৬৫ লাখ লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাবে। সুতরাং আমরা কোনোভাবেই কখনোই একই হারে ভ্যাট মেনে নেব না। কারণ ১৫ শতাংশ যদি ভ্যাট প্রস্তাব করা হয়, তাহলে ন্যূনতম ১ কোটি ৬৫ লাখ লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাবে।

এর আগের পতিত সরকার অনেক বিষয়ে শর্ত মেনে ঋণ নিয়েছে। আইএমএফের সঙ্গে আমাদের নেগোসিয়েশন চলছে। আমরা পরিষ্কার করেছি, অতীতে দেশে পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতি ছিল। সংস্কৃতি পুরোটাই নির্ভর করত অবৈধভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য। যারা স্বজনতোষী, গোষ্ঠীতন্ত্রের জন্য অর্থনীতিকে ঋণের ভারে রেখে পালিয়ে গেছে আমরা সেখান থেকে বের হয়ে আসতে চাচ্ছি। অর্থনীতিতে গতি সঞ্চারিত করতে চাচ্ছি। কারণ অর্থনীতি যদি সম্প্রসারিত হয়, তাহলে কর্মসংস্থান বাড়বে, কর্মসংস্থান বাড়লে একটি স্থিতিশীল সামাজিক কাঠামো গড়ে উঠবে। এর মাধ্যমে প্রত্যক্ষ করের হার বাড়বে। একইভাবে পণ্যের বহুমুখী ব্যবহারের কারণে মূল্য সংযোজন করের আহরণ বাড়বে।

তিনি বলেন, আমাদের আগামী পাঁচ বছরে আকাক্সক্ষা হচ্ছে, আস্তে আস্তে পরিচালন ব্যয় কমতে থাকবে, আর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি ব্যয় বাড়বে। সে ক্ষেত্রে আমাদের বিস্তারিত বক্তব্য রয়েছে। অর্থাৎ বাস্তবায়নের জন্য আমরা কী কী করছি? প্রোগ্রামিংয়ের জন্য আমরা কী করছি? ইমপ্লিমেন্টেশন ফ্রেমওয়ার্কের জন্য কী করছি? তা প্রতি প্রান্তিকে ড্যাশবোর্ডে দেখতে পারব। আমরা সবার জন্য কাজ করে যাচ্ছি। তার মানে হচ্ছে অঞ্চলে অঞ্চলে বৈষম্য থাকবে না। খাতের সঙ্গে খাতের কোনো বৈষম্য থাকবে না। নারী ও পুরুষ উদ্যোক্তাদের মধ্যে কোনো বৈষম্য থাকবে না। বৃহৎ শিল্প যেমন সুবিধা পাবে, তেমনি ক্ষুদ্র কুটিরশিল্পও পাবে। তার সঙ্গে অরেঞ্জ ইকোনমিকেও সংযুক্ত করা হচ্ছে।

এ ছাড়া শান্তিপূর্ণ সমৃদ্ধশালী বঙ্গোপসাগর কীভাবে গড়ে তোলা যায়, সে ব্যাপারে আমরা সুনীল অর্থনীতির দিকেও নজর দেব।

কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, এতদিন হয়ে গেছে, কিন্তু সার্বিকভাবে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় কখনো কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় একমাত্র গ্যারান্টি ক্লজ ছিল, আর পরবর্তীতে কিন্তু পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় গ্যারান্টি ক্লজ নেই। আমাদের তো একটি স্থায়ী পরিকল্পনা করতে হবে। কারণ এর সঙ্গে কৃষি সম্পৃক্ত। আমাদের কৃষিতে তিনটা মোটা দাগের সমস্যা। প্রথম হচ্ছে উৎপাদনের উপকরণের দাম বেশি। কৃষকের পণ্যের দাম এবং জমির উর্বরতা কমে যাওয়া; পানির স্তর নেমে যাওয়া। এই সমস্যাগুলো সমাধানে সরকার তিনটি উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

পানি ব্যবস্থাপনা অর্থাৎ ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানো। আর ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার হ্রাস করা। কারণ মাটির পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। সেই জন্য আমরা তিস্তা মহাপরিকল্পনা, পদ্মা ব্যারাজের মতো প্রকল্পের উদ্যোগ নিয়েছি। হাওর, বাঁওড় বোর্ডকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ আগামী বছর থেকে তিস্তা মহাপরিকল্পনা; পদ্মা ব্যারাজ এবং উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ততা বৃদ্ধির বিষয়ে পরিষ্কার পরিকল্পনা থাকবে। আর কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে কৃষক কার্ড চালু করেছি। আমরা প্রত্যেক কৃষকের কাছে যেতে চাই। যাতে করে সর্বজনীন ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে কৃষক ন্যায্যমূল্য পান। একই সঙ্গে ভোক্তাও যাতে ন্যায্যমূল্যে পণ্য কিনতে পারেন।

আমি শেষ করব এই বলে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ সেই প্ল্যান বাস্তবায়ন হচ্ছে। অতীতে যেমন আমরা সংকট থেকে বেরিয়ে এসেছি এবং সেই জন্য জনগণ আস্থা রেখেছে। ঠিক একই কায়দায় আমরা সংকট থেকে বেরিয়ে আসব, বের হয়ে যাব এবং সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ প্রতিফলন ঘটবে আগামী বাজেটে।