চট্টগ্রাম বন্দরের সোনার ডিম পাড়া হাঁস নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) আবারও আলোচনায়। বন্দর শ্রমিক-কর্মচারীদের টানা ১২ দিনের আন্দোলনের মুখে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছিল ৮ ফেব্রুয়ারি। এখন আবারও নতুন করে নেগোসিয়েশন কমিটি গঠনের মাধ্যমে স্থগিত আলোচনা সচলের ইঙ্গিত দিচ্ছে বর্তমান সরকার।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিবের গত ৫ জুন স্বাক্ষরিত চিঠিতে এনসিটি নিয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে নেগোসিয়েশন চালিয়ে নিতে নতুন নেগোসিয়েশন কমিটির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের কাছে। এ কমিটিতে আহ্বায়ক হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার ও মেরিন) এবং সদস্য সচিব চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালককে (ট্রাফিক) উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া কমিটির অপর সদস্যদের মধ্যে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব পদমর্যাদার একজন, পিপিপি কর্তৃপক্ষ মনোনীত তিনজন এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ থেকে একজন বহিঃসদস্য নিয়োগের প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে গত ৪ জুন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব ফারজানা হোসেন স্বাক্ষরিত পরপর দুটি চিঠিতে দুই ধরনের আদেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে দ্বিতীয় চিঠিতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে নির্দেশনা দেওয়া হয়। ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ জাকারিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পিপিপি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বাস্তবায়ন হতে যাওয়া এই প্রকল্পে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চলমান নেগোসিয়েশন বন্ধ করার কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না। তাই স্বাভাবিকভাবেই এ আলোচনা চালিয়ে নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, বন্ধ রাখার তো কোনো সিদ্ধান্ত নেই।’
যেহেতু ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি বরাদ্দের বিষয়ে দুবাইয়ের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের একটি জিটুজি চুক্তি হয়েছে। সেই চুক্তির মাঝপথে কি বের হয়ে আসা সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাওয়া হয় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষে দীর্ঘদিন সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) হিসেবে কাজ করা জাফর আলমের কাছে। তিনি বলেন, ‘যেহেতু জিটুজি ভিত্তিতে চুক্তি হয়েছে, তাই মাঝপথে এ চুক্তি থেকে সরে আসার কোনো সুযোগ নেই। চুক্তির কার্যক্রম শেষ করে আসতে হবে।’
সেই শেষ কীভাবে হতে পারে? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যেহেতু এখন দাবি উঠেছে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার। তাই স্বচ্ছতার স্বার্থে জিটুজি চুক্তির আলোকে উভয় পক্ষের সম্মতিতে বের হয়ে আসা যেতে পারে। তারপর উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কিংবা দেশীয় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে যৌথভাবেও অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। তখন আর এটি নিয়ে প্রশ্ন ওঠার কোনো সুযোগ থাকবে না। তবে এর আগে অবশ্যই চুক্তি নিয়ে চলমান নেগোসিয়েশন প্রক্রিয়া শেষ করে বের হয়ে আসতে হবে।’
তাহলে কি সরকার এখন সেই পথেই এগোচ্ছে? এমন প্রশ্নের উত্তরে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের একাধিক কর্মকর্তাও একই মন্তব্য করেন। তাদের মতে, স্থগিত হয়ে যাওয়া আলোচনা চালিয়ে সঠিক প্রক্রিয়ায় সেখান থেকে বের হয়ে আসতে হবে অথবা এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। তবে নেগোসিয়েশন যদি সন্তোষজনক না হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই তা বাতিল হয়ে যাবে।
উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বরাদ্দের বিষয়ে কথা বলেছেন চিটাগাং চেম্বারের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আমিরুল হকও। তিনি বলেন, শুধু একটি প্রতিষ্ঠান কেন পরিচালনার দায়িত্ব পাবে? এখানে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দরপত্র উন্মক্ত করে দেওয়া হোক। যে দর বেশি দেবে কাজ সে পাবে। তবে এ ক্ষেত্রে দেশীয় কোম্পানিগুলো যাতে এগিয়ে যেতে পারে, সে জন্য বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে দেশীয় কোম্পানি যৌথভাবে থাকতে হবে তা বাধ্যতামূলক করে দেওয়া যেতে পারে। আর তা করা গেলে শতাংশ হারে লভ্যাংশের টাকা দেশে যেমন থাকবে, ঠিক তেমনিভাবে দেশীয় কোম্পানিগুলোরও প্রসার হবে।
চুক্তি থেকে সরে আসার উপায় আছে কি? : এদিকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এ চুক্তি থেকে সরে আসার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে উল্লেখ করে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা পরিষদের নেতা ইব্রাহিম খোকন বলেন, দুবাইয়ের সঙ্গে সরকারের জিটুজি চুক্তি হয়েছিল পিসিটি বরাদ্দের বিষয়ে। কিন্তু তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকার সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়েকে পিসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দেয়। ফলে এনসিটি পরিচালনার বিষয়ে তো ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে জিটুজি কোনো চুক্তি হয়নি। এ ছাড়া বিদেশি কোম্পানি পিপিপির মাধ্যমে গ্রিনফিল্ডে বিনিয়োগ করতে পারে, বিদ্যমান কোনো স্থাপনায় বিনিয়োগের কোনো সুযোগ নেই। এসব বিবেচনা করে সরকার চাইলে ডিপি ওয়ার্ল্ড থেকে সরে আসতে পারে ।
তিনি আরও বলেন, তারপরও যদি সরকার দেশের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে এ চুক্তি থেকে সরে না আসে, তাহলে আমরা চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের নিয়ে মাঠে নামতে বাধ্য হব।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে বে-টার্মিনালে একটি টার্মিনাল নির্মাণের চুক্তি অলরেডি রয়েছে জানিয়ে শ্রমিক নেতা ইব্রাহিম খোকন বলেন, তারা চাইলে সেখানে আরেকটি টার্মিনাল নির্মাণ করুক। কিন্তু এই রেডিমেড টার্মিনালে কেন তাদের এত আগ্রহ?
এনসিটিতে সবার টার্গেট কেন? : দুবাইয়ের ডিপি ওয়ার্ল্ডের পাশাপাশি দেশীয় কোম্পানি এমজিএইচ গ্রুপও বরাদ্দ পেতে চায় এনসিটি। কিন্তু জিটুজি চুক্তির আওতায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চলমান নেগোসিয়েশন শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেই সুযোগ নেই। কিন্তু এনসিটি কেন চাহিদার শীর্ষে? ২০০৭ সালে ৭০০ কোটি টাকা খরচ করে এনসিটি টার্মিনাল নির্মাণ করা হয়েছিল। পরে প্রায় ১২০০ কোটি টাকা খরচ করে ১৪টি ‘কি গ্যান্ট্রিক্রেন’সহ আধুনিক ইকুইপমেন্ট স্থাপন করা হয়েছিল ২০১৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে। চট্টগ্রাম বন্দরের ১৮টি কি গ্যান্ট্রিক্রেনের মধ্যে ১৪টি এ টার্মিনালে রয়েছে। এই টার্মিনালে পরে আরও প্রায় ৬০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়। ফলে দেশীয় অপারেটর দিয়ে পরিচালিত চট্টগ্রাম বন্দরের জিসিবি (জেনারেল কার্গো বার্থ) ও সিসিটির (চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল) তুলনায় বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করে এনসিটি। সবই দেশীয় অপারেটর দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। অপরদিকে সৌদি আরবের রেডসি গেটওয়ে পরিচালনা করছে পিসিটি (পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল)। গত বছর চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনারের ৪৪ শতাংশ এনসিটিতে, ৩৬ শতাংশ জিসিবিতে (জেনারেল কার্গো বার্থ), ১৬ শতাংশ সিসিটিতে এবং প্রায় ৪ শতাংশ পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালে হ্যান্ডলিং হয়েছে। এনসিটিতে একসঙ্গে চারটি জাহাজ ভিড়তে পারবে, আর তাই সবার টার্গেট এই এনসিটি।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ল্যান্ড লর্ড (সরকারের ভূমিতে প্রাইভেট বিনিয়োগে বন্দর নির্মাণ) পদ্ধতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। এ জন্যই বে-টার্মিনাল ও মাতারবাড়িতে কিংবা পতেঙ্গার লাদিয়ায় এপিমুলারের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। বে-টার্মিনালে নির্মাণ হতে যাওয়া তিনটি টার্মিনালের মধ্যে দুটির একটিতে ডিপি ওয়ার্ল্ড এবং অপরটিতে পিএসএ সিঙ্গাপুরের সঙ্গে সরকারের চুক্তি হয়েছে। এ বিষয়ে জাফর আলম বলেন, রেডিমেড বন্দরে বিনিয়োগ কম। যেদিন বিনিয়োগ করবে, সেদিন থেকেই লাভ আসবে। কিন্তু গ্রিনফিল্ডে টার্মিনাল নির্মাণে সময় যেমন বেশি লাগবে, ঠিক তেমনি বিনিয়োগে টাকাও বেশি লাগবে। রিটার্ন আসতে দেরি হবে। সে জন্য বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ রেডিমেডে বেশি।
উল্লেখ্য, এনসিটি টার্মিনাল নিয়ে উচ্চ আদালত থেকে বিদেশি অপারেটরের সঙ্গে চুক্তির প্রক্রিয়ার বৈধতা প্রশ্নে দায়ের করা রিট গত ২৯ জানুয়ারি খারিজ করে দিয়েছিল হাইকোর্ট। এতে বিদেশিদের (ডিপি ওয়ার্ল্ড) বরাদ্দ দিতে কোনো আইনগত সমস্যা নেই বলে মতামত দেওয়া হয়েছিল। আর এরপর থেকেই আন্দোলনের ঘোষণা দেয় বন্দরের জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল এবং যা পরে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদে রূপ নেয়। মূলত তাদের আন্দোলনের মুখে অন্তর্বর্তী সরকার বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগমুহূর্তে ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়েছিল এনসিটি চুক্তির বিষয়ে তারা (অন্তবর্তী সরকার) এগোবে না। পরে নির্বাচিত সরকার এসে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। গত ৪ জুন নির্বাচিত সরকার এনসিটি ইস্যুতে আলোচনা চালিয়ে যেতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।