সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের চেষ্টায় পুশইন প্রভাব ফেলবে

আপডেট : ০৯ জুন ২০২৬, ০২:৫৩ এএম

ভারত থেকে অবৈধভাবে জোর করে সীমান্ত পথে মানুষ ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা (পুশইন) দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের চেষ্টায় প্রভাব ফেলতে পারে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম গতকাল সোমবার ঢাকায় সাংবাদিকদের এ কথা বলেন।

ভারতীয় সীমান্ত রক্ষা বাহিনী বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) পুশইনের জন্য লাগাতার যে চেষ্টা করছে, সে প্রসঙ্গে করা এক প্রশ্নে প্রতিমন্ত্রী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, অবৈধভাবে কেউ কোথাও থেকে থাকলে তাদের ফেরত দেওয়ার একটা প্রক্রিয়া আছে। সেটা মেনেই ভারতকে কাজ করতে হবে।

২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে টানাপড়েন চলছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই ভারতের দিক থেকে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা শুরু হয়।

সরকার পুশইনের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নিয়েছে, এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী সীমান্ত রক্ষা বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ভূমিকার প্রশংসা করেন। প্রতিমন্ত্রী বলেন, সীমান্তে ভারত থেকে পুশইন করার চেষ্টা বিজিবি শক্তভাবে প্রতিহত করছে। এ ছাড়া, পুশইনের চেষ্টা বন্ধের জন্য সরকার ভারতকে ১২ থেকে ১৩টি চিঠি দিয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের মাধ্যমে এসব চিঠি দেওয়া হয়। চিঠিতে বলা হয়েছে, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন করে যথেচ্ছভাবে মানুষকে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে ঠেলে দিতে বারবার চেষ্টা করা অত্যন্ত দুঃখজনক। এটি পারস্পরিক আস্থা ও সীমান্ত এলাকার স্থিতিশীলতা নষ্টের ঝুঁকি তৈরি করে।

চিঠিতে আরও বলা হয়, বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকের আগে এ ধরনের ঘটনা দুই বাহিনীর মধ্যে অর্থপূর্ণ সংলাপের জন্য প্রয়োজনীয় গঠনমূলক বোঝাপড়ার পরিবেশ নষ্ট করে।

সরকার বলেছে, সব ‘প্রত্যাবাসন’ অবশ্যই আইনসম্মত উপায়ে, আন্তর্জাতিক স্বীকৃত নিয়ম-পদ্ধতি ও প্রটোকল মেনে এবং সম্মত দ্বিপক্ষীয় পদ্ধতি অনুসারে সম্পন্ন করতে হবে।

এভাবে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে জোরপূর্বক বাংলাদেশ ভূখণ্ডে ঠেলে দেওয়ার সব রকম কার্যকলাপ বন্ধের জন্য ভারত সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে, এমন কোনো জনমতকে প্রশ্রয় দেওয়া উচিত নয়, যা সংঘাত ও জন বিদ্বেষ উস্কে দিয়ে সামগ্রিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

ভারত সম্প্রতি বিএসএফ-এর মাধ্যমে ‘বাংলায় কথা বলে’ এমন লোকদের জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার জোরালো চেষ্টা শুরু করে। এমন পরিস্থিতিতে সীমান্তবর্তী ২৬ জেলায় বিপুলসংখ্যক বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। তারা আনসার-ভিডিপি ও গ্রামপুলিশের সদস্য এবং স্থানীয় জনতার সহায়তায় সীমান্তে নজরদারি জোরদার করেছে।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর দাবি : ভারতীয় সীমান্তবর্তী রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছেন, রাজ্যের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোয় স্থাপিত আটক কেন্দ্রগুলো থেকে প্রায় ৪ হাজার ৮০০ ‘অভিবাসীকে’ বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। আরও ৮৩৬ জন বর্তমানে ‘প্রত্যাবাসনের’ অপেক্ষায় রয়েছেন।

ভারতের শাসক দল বিজেপির রাজ্য শাখা আয়োজিত এক বিশেষ প্রশিক্ষণ শিবিরের প্রস্তুতিমূলক সভায় গতকাল সোমবার তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, অবৈধ অভিবাসন মোকাবিলা এবং ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত সুরক্ষিত করা তার সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।

পশ্চিমবঙ্গের জনতাত্ত্বিক পরিবর্তন একটি বড় রাজনৈতিক বিষয় হয়ে উঠেছে, এমনটি উল্লেখ করে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, যে সমস্ত অবৈধ অভিবাসী নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের আওতাভুক্ত নন, তাদের কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ম অনুযায়ী সরাসরি বিএসএফ-এর হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে।

প্রায় ৪ হাজার ৮০০ ব্যক্তিকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর দাবিটি সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সরকারের একজন মুখপাত্র দাবিটি নাকচ করে দেন।

বিজিবি-বিএসএফ বৈঠক : বিজিবি ও বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ে ৫৭তম সম্মেলন গতকাল শুরু হয়েছে। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বিএসএফ সদর দপ্তরে এ সম্মেলন চার দিন চলবে।

বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী ও বিএসএফ মহাপরিচালক প্রবীণ কুমার সম্মেলনে যথাক্রমে বাংলাদেশ ও ভারতীয় প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

সরকারি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ভারত কর্তৃপক্ষ ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলের দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা সীমান্ত হত্যা ও পুশইন বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধ, ভারত থেকে বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য, অস্ত্র ও অন্য নিষিদ্ধ পণ্যের চোরাচালান রোধ, মানবপাচার প্রতিরোধ, আন্তর্জাতিক সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে কাঁটাতারের বেড়াসহ অন্য অননুমোদিত অবকাঠামো নির্মাণ বন্ধ, আকাশসীমা লঙ্ঘন করে অবৈধ ড্রোন ও হেলিকপ্টার ওড়ানো বন্ধ, ভারতীয় গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক প্রচার বন্ধের জন্য বিজিবির পক্ষ থেকে সম্মেলনে দাবি তোলার কথা রয়েছে।

এ ছাড়া, চলমান বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের নিষ্পত্তি, তিনবিঘা করিডর দিয়ে পাটগ্রাম থেকে দহগ্রাম পর্যন্ত অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল স্থাপন, আগরতলা থেকে আখাউড়াগামী চারটি খালের বর্জ্য-পানি পরিশোধন করে নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নির্মাণ, মুহুরির চর এলাকায় স্থায়ী সীমান্ত পিলার নির্মাণ, আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর তীর সংরক্ষণ কার্যক্রম, আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সম্ভাব্য অবস্থান ও তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কিত তথ্য আদান-প্রদান, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও সীমান্ত সম্পর্কিত সমস্যা সমাধানে সমন্বিত ব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন এবং উভয় বাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন বিষয় এ সম্মেলনের আলোচনায় আসবে।

সীমান্তের অবস্থা : পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, কুড়িগ্রাম ও হবিগঞ্জসহ সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে দেশ রূপান্তরের প্রতিনিধি ও সরকারি সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ‘বাংলায় কথা বলা’ ব্যক্তিদের বাংলাদেশে পুশইন করতে পশ্চিমবঙ্গসহ সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোয় বিএসএফ-এর নানামুখী তৎপরতার মধ্যে ভারত সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বিজিবি দিনরাত টহল জোরদার করেছে। কোথাও কোথাও নজরদারির জন্য বাংলাদেশ সীমানার ভেতরেই ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ে আনসার-ভিডিপি ও গ্রামপুলিশ সদস্যদের সতর্ক রাখা হচ্ছে। মাইকিং ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমে স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। তাদের বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে পুশইন কী, কী করে সন্দেহভাজন অনুপ্রবেশকারীকে শনাক্ত করতে হবে। সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও কর্মকাণ্ড চিহ্নিত করার সঙ্গে সঙ্গে বিজিবিকে জানাতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। যেসব জেলায় সীমান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত অনুপ্রবেশ ঘটেনি, সেখানেও বিজিবিকে উচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।

পঞ্চগড় : বিএসএফের পুশইন চেষ্টার অংশ হিসেবে নারী-শিশুসহ দুই পরিবারের ১০ জনকে গত বৃহস্পতিবার থেকে সীমান্তের শূন্য রেখায় এনে রাখা হয়। অবশেষে রবিবার রাত ২টার দিকে বিএসএফ তাদের ফেরত নিয়ে গেছে। গতকাল সোমবার সকালে নীলফামারীর ৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সিরাজুল ইসলামের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

ঠাকুরগাঁও : হরিপুর উপজেলার মশালগাঁও সীমান্তের শূন্যরেখার কাছাকাছি পুশইনের জন্য বিএসএফ এনেছিল নারী-শিশুসহ ১১ জনকে। গতকাল রবিবার রাত সাড়ে ৩টার দিকে সীমান্তবাতি নিভিয়ে বিএসএফই তাদের সরিয়ে নিয়েছে। দিনাজপুর ৪২ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবদুল্লাহ আল মঈন হাসান এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

আনসার-ভিডিপির এক প্রেস বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ প্রতিরোধে সীমান্তের ১১ জেলায় বিজিবির সঙ্গে আনসার-ভিডিপির সদস্যদের যুক্ত করা হয়েছে। জেলাগুলো হলো চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, জয়পুরহাট, যশোর, ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, সিলেট, জামালপুর ও খাগড়াছড়ি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত