‘লজ্জা’র আড়ালে নির্ভার অপরাধী

দশ বছর আগে রহিমা বেগমের (ছদ্মনাম) বিয়ে হয়েছে, তার স্বামী প্রবাসী। সুখেই কাটছিল তার সংসার। কিন্তু দুই লাখ টাকা ও একটি টেলিভিশন যৌতুক দিতে না পারায় তার ওপর চালানো হয় নির্যাতন। সংসার টিকিয়ে রাখতে মুখ বুঝে সব সহ্য করেন তিনি; থানায় অভিযোগ করেননি। একই ঘটনা ঘটে একটি বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রীর বেলায়ও। প্রেমের অভিনয় করে তার সর্বনাশ করেছে এক বখাটে। সবকিছু সহ্য করেছেন তিনিও, ওই বখাটের বিরুদ্ধে আইনি কোনো ব্যবস্থা নেননি।  

এ দুটি ঘটনার মতোই সারা দেশে নারী ও পুরুষ নানা কায়দায় নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। চক্ষুলজ্জার কারণে ভুক্তভোগীরা কোনো অভিযোগ করছেন না। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে অভিযোগ দিলেও উল্টো ভুক্তভোগী সামাজিকভাবে সাজা পাচ্ছে। কখনো মামলা হলেও আইনের দীর্ঘসূত্রতার কারণে পার পেয়ে যাচ্ছে আসামিরা।

অপরাধ-বিশ্লেষকদের মতে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি কেবল আইনি দুর্বলতার কারণে তৈরি হয় না, সমাজের আরোপিত ‘লজ্জার সংস্কৃতি’ও বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। অনলাইন প্রতারণার ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা দ্রুত প্রতিকার চান। কিন্তু যখন তারা সাধারণ ডায়েরি বা মামলা করতে গিয়ে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হন তখন তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। সাইবার অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়া আরও সহজ ও ভুক্তভোগীবান্ধব করা জরুরি। প্রতিটি থানায় সাইবার অপরাধের জন্য হেল্প ডেস্ক এবং জনবল বাড়ানো দরকার। সাম্প্রতিক সময়ে ই-কমার্স স্ক্যাম, ভিউ বা লাইক দিয়ে আয়ের প্রলোভন, ভুয়া লোন অ্যাপ, বিকাশ বা নগদ অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্ল্যাকমেইলিংয়ের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটছে।

লোকলজ্জার আড়ালে ঢাকা পড়ছে অপরাধ : সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, যখন মানুষের স্বাভবিক লজ্জাবোধকে অস্ত্র বানিয়ে অপরাধকে চাপা দেওয়া হয়, তখন তা রূপ নেয় সামাজিক ব্যাধিতে। বর্তমান সমাজে বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় প্রেক্ষাপটে ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন, পারিবারিক সহিংসতা এবং সাইবার বুলিংয়ের মতো গুরুতর অপরাধ প্রায়ই ‘লোকলজ্জার’ আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। অপরাধীর বদলে ভুক্তভোগী নিজেই যখন লোকলজ্জার ভয়ে নীরবতা বেছে নেন, তখন অপরাধী দায়মুক্তির এক অলিখিত ছাড়পত্র পেয়ে যায়। সমাজে অপরাধীর চেয়ে ভুক্তভোগীর চরিত্র, পোশাক ও আচরণ নিয়ে বেশি ব্যবচ্ছেদ করা হয়। কোনো নারী যৌন হয়রানির শিকার হলে প্রথমেই প্রশ্ন ওঠে, তিনি সেখানে কেন গিয়েছিলেন? এ ধরনের ভিকটিম-ব্লেইমিং বা ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করার প্রবণতা ভিকটিমের মনে তীব্র লজ্জাবোধ তৈরি করে। ফলে ঘটনা চেপে যেতে বাধ্য হন তারা। আবার পরিবারের ইজ্জত যাবে এমন কথাও বাংলাদেশে অপরাধকে অনালোচিত-অবিবেচ্য রেখে দিতে সহায়তা করে।

গ্রামাঞ্চলে অপরাধ বেশি হয় : বিশেষ করে গ্রামীণ ও রক্ষণশীল পরিবারগুলোতে কোনো সদস্য যদি পরিবারের কারোর দ্বারা কিংবা বাইরের কারোর দ্বারা নির্যাতিত হন, তখন পরিবার নিজ উদ্যোগেই তা চেপে যাওয়ার চেষ্টা করে। জানাজানি হলে মেয়ের বিয়ে হবে না, সমাজে মুখ দেখানো যাবে না এমন মনস্তাত্ত্বিক চাপ অপরাধকে আড়াল করে রাখে। অপরাধের বিচার পেতে বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় ঘুরতে হয়। এটাও ভুক্তভোগীকে ট্রমার মধ্যে রাখে। প্রযুক্তির যুগে অপরাধের ধরন বদলেছে। ইন্টারনেটে ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে নারীদের ব্ল্যাকমেইল করা হয়। লোকলজ্জার ভয়ে ভুক্তভোগীরা আত্মহত্যার পথও বেছে নেয়। পুলিশের দ্বারস্থ হতেও ভয় পায় অনেকে।

৮৮ শতাংশ ভুক্তভোগী আইনের আশ্রয় নেন না : বিভিন্ন গবেষণা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সাইবার অপরাধের শিকার প্রায় ৮৮ শতাংশ ভুক্তভোগী কোনো আইনি ব্যবস্থা নেন না। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে অনলাইনে প্রতারিত ব্যক্তিদের মাত্র ১২ শতাংশ আনুষ্ঠানিকভাবে থানায় বা সিআইডির সাইবার সেলে অভিযোগ দায়ের করেছেন। সাইবার অপরাধের ঘটনায় মাত্র চার শতাংশ নিয়মিত মামলা করছে। অনলাইনে হয়রানির শিকার ৮৯ শতাংশ কিশোরী ও তরুণী সামাজিক লজ্জা, ভয় ও পরিবারের চাপে মামলা করে না। আবার যেসব মামলা হয় তার ৭২ শতাংশ শেষ পর্যন্ত খারিজ হয়ে যায়। প্রতি পাঁচজন কিশোরী ও তরুণীর মধ্যে তিনজনই কোনো না কোনোভাবে সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন।

৩,৭১২টি আর্থিক প্রতারণার অভিযোগ : সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, গত ১১ মাসে ৩,৭১২টি আর্থিক প্রতারণার অভিযোগ পেয়েছে তারা। অনলাইনে পোস্ট, মেসেজ, ছবি ও ভিডিও প্রচার করে হয়রানির অভিযোগ এসেছে ১,৫৮৪টি। সামাজিক মাধ্যম হ্যাকিংয়ের অভিযোগ এসেছে ৪৯১টি। তার মধ্যে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়েছে ২৪৭টি ও ই-মেইল হ্যাক হয়েছে ১০৩টি। জিম্মিকরণ ও হুমকিসংক্রান্ত ৪৩৮টি ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে জিম্মির ঘটনা ঘটছে ৩৪৮টি। মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসে প্রতারণা ও হ্যাকের ঘটনা ঘটেছে ২২৮টি। পর্নোগ্রাফির ৩৯টি অভিযোগের মধ্যে ২৩টিতে ভুক্তভোগীর আসল ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও আছে। অনলাইন জুয়াসংক্রান্ত ৮৩টি, ব্যাংক হিসাব ও কার্ডসংক্রান্ত ৪২টি এবং অন্যান্য বিষয়ে ৪১৫টি অভিযোগের তদন্ত করছে সিআইডি।

ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কেউ প্রতারণার শিকার হলে পুলিশের শরণাপন্ন হবেন। পুলিশ সহায়তা করবে। অভিযোগ আসার পর সাইবার সাপোর্ট সেন্টার তদন্ত করে। এ বিষয়ে পুলিশ খুব কঠোর।’

পুলিশের একটি জরিপে বলা হয়েছে, দেশে যে পরিমাণ নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটে, তার মাত্র একটি ক্ষুদ্র অংশ থানায় মামলা পর্যন্ত গড়ায়। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা নির্যাতিতা নারীদের প্রায় ৭০ শতাংশ প্রথম দিকে ঘটনাটি গোপন রাখতে চান সামাজিক লজ্জার কারণে। পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারীদের প্রায় ৮০ শতাংশ কখনোই কারও কাছে অভিযোগ করেন না। তার প্রধান কারণ পারিবারিক মর্যাদা রক্ষা ও ‘লোকলজ্জা’।

ব্লেইমিয়ের বিরুদ্ধে লড়াই : পুলিশ সদর দপ্তরে কর্মরত ডিআইজি পদ মর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘লজ্জার দেয়াল ভেঙে অপরাধকে আলোতে নিয়ে আসতে হলে রাষ্ট্র, সমাজ এবং পরিবার এ তিন স্তরেই আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। সমাজকে সবার আগে বুঝতে হবে, অপরাধের জন্য কেবল অপরাধীই দায়ী। ভুক্তভোগীর পোশাক, সময় বা অবস্থান অপরাধের অজুহাত হতে পারে না। সামাজিক মাধ্যমে এবং গণমাধ্যমে ভিকটিম ব্লেইমিংয়ের বিরুদ্ধে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করতে হবে। যেকোনো বিপদে পরিবারকে হতে হবে প্রথম আশ্রয়স্থল। সন্তান বা পরিবারের কোনো সদস্য অপ্রীতিকর ঘটনার কথা শেয়ার করলে তাকে ধমক দেওয়া বা ‘লজ্জার কথা’ বলে চুপ করিয়ে দেওয়ার মানসিকতা বর্জন করতে হবে। পরিবারের বিশ্বাস অর্জন করতে পারলে ভুক্তভোগীরা অপরাধ লুকিয়ে রাখবে না। নির্যাতনের শিকার হলে প্রতিবাদ করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নিতে হবে। পুলিশের কোনো সদস্য সহযোগিতা না করলে ঊর্ধ্বতনদের কাছে অভিযোগ করতে হবে।’

আইনে আছে যেসব শাস্তি : পুলিশ সূত্র জানায়, অনলাইন প্রতারণার শিকার লোকজন আইনের জটিলতার ভয়ে পিছিয়ে গেলেও দেশের প্রচলিত আইনে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী, ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যম ব্যবহার করে জালিয়াতি বা প্রতারণার মাধ্যমে আর্থিক ক্ষতি কেউ করলে তিনি অপরাধী হিসেবে গণ্য হবেন। এ অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড, কিংবা উভয় দণ্ড। কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে অন্য কোনো ব্যক্তির পরিচয় ধারণ করে বা অন্য কারও ছবি, আইডি বা তথ্য ব্যবহার করে অনলাইনে আর্থিক সুবিধা নেন বা প্রতারণা করেন, তবে তিনি সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকার অর্থদন্ডে দন্ডিত হবেন।

সাক্ষীদের সুরক্ষায় কঠোর আইনের দাবি : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘অনলাইনে প্রতারিত লোকজন অভিযোগ করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি গভীরে গিয়ে তদন্ত করতে হবে। ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের সুরক্ষায় কঠোর আইন প্রণয়ন করতে হবে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ভুক্তভোগীর জেরাপ্রক্রিয়া যেন মর্যাদাপূর্ণ এবং মানসিক ট্রমামুক্ত হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। ভুক্তভোগীর নাম ও পরিচয় প্রকাশ করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ এ নিয়মের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘প্রতিটি থানা, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে ভুক্তভোগী আশ^স্ত হতে পারেন। অপরাধ লুকানোর চেষ্টা করলে সমাজকে আরও কলুষিত হয়। লোকলজ্জার ভয় আরও বড় অপরাধের জন্ম দেবে। লোকলজ্জার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার সময় এখনই। অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।’