সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরে করহার না বাড়িয়ে কর আহরণের আওতা বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক করতে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে। শুধু নতুন অর্থবছর নয়, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে শুরু করে ২০৩০-৩১ অর্থবছর পর্যন্ত ৫ বছর বিদ্যমান করপোরেট করহার অপরিবর্তিত রাখার প্রস্তুতি নিয়েছে। এমনকি এ সময়ের মধ্যে তুলনামূলক বেশি করের আওতায় থাকা খাতের করহার পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনার পরিকল্পনার কথা জানা যাচ্ছে।
তবে রাজস্ব আয় বাড়াতে দেশের সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাটের জালের আওতায় আনা হচ্ছে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে সরকার ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ও কৃষিপণ্যে কর ছাড়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে উৎসে কর হ্রাসের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগামীকাল ১১ জুন জাতীয় সংসদে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী তার বাজেট বক্তব্যে এসব বিষয় তুলে ধরবেন। বাজেট প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, সীমিত সম্পদের তুলনায় বাজেটে সবার সুখ-দুঃখের কথা বিবেচনা করা হয়েছে।
জানা গেছে, নতুন অর্থবছরে সরকারের ব্যয়ের আকার হতে পারে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। বিশাল এ ব্যয়ের বিপরীতে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এতে আয়ের ঘাটতি থাকবে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোট টাকা। এ ঘাটতি মেটাতে সরকারকে ব্যাংক ও বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ করতে হবে।
অর্থমন্ত্রীর মতে, করের হার বৃদ্ধি নয় বরং করের ভিত্তি সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এ বিষয়ে এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, করভিত্তি সম্প্রসারণের জন্য সরকার খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহের ওপর শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ অগ্রিম কর সংগ্রহের প্রস্তাব করবে। খুচরা বিক্রেতাদের নিকট থেকে সংগৃহীত এ এগ্রিম করের পরিমাণ হবে যৎসামান্য, যা প্রতি হাজারে ২ টাকা। তবে সংগৃহীত এ আয়কর করদাতার প্রদেয় করের সঙ্গে সমন্বয় হবে। এর মাধ্যমে করভিত্তি সম্প্রসারণ হবে বলে সরকার আশা করছে।
রাজস্ব আহরণ বাড়াতে সরকার শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাব, নো-ফ্রিলস অ্যাকাউন্ট ও বোর্ড কর্তৃক গেজেট দ্বারা টিআইএন গ্রহণের বাধ্যবাধকতা হতে অব্যাহতিপ্রাপ্ত ব্যক্তি ব্যতীত, অন্য যেকোনো ব্যক্তির, ব্যাংক হিসাব খোলার সময় টিআইএন সনদ দাখিল করার বিধান প্রস্তাব করা হবে।
বিশেষ করে কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার (সেন্ট্রাল ডাটা ইন্টিগ্রেশন) গঠনের মাধ্যমে এনবিআরের তথ্যভা-ারকে জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক, ইউটিলিটি সেবা, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযুক্ত করে তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা করা হবে।
করপোরেট করের বিষয়ে এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, বাজেটে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে আগের মতোই ৫ শতাংশ বহাল রেখে করপোরেট করহার প্রস্তাব করবেন অর্থমন্ত্রী। তবে এবারের প্রস্তাবে শেয়ারবাজার থেকে পুঁজি উত্তোলনে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর পাশাপাশি সরাসরি তালিকাভুক্ত (ডিরেক্ট লিস্টিং) হয়ে পরিশোধিত মূলধনের ন্যূনতম ১০ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করলে করহার ২২ দশমিক ৫০ শতাংশের প্রস্তাব থাকবে। তবে এ ধরনের কোম্পানির সব আয় ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন হলে করহার হবে ২০ শতাংশ। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানি বা অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার হবে ২৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। তবে এই শ্রেণির কোম্পানিও সব লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে করলে করহার হবে ২৫ শতাংশ। তবে ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হলে সেসব প্রতিষ্ঠানের করহার সাড়ে ৩৭ শতাংশ এবং অ-তালিকাভুক্ত হলে করহার হবে আগের মতো ৪০ শতাংশ।
এ ছাড়া সিগারেট, বিড়ি, জর্দা, গুলসহ সব ধরনের তামাকজাত পণ্য প্রস্তুতকারী কোম্পানির জন্য আগের মতোই সর্বোচ্চ ৪৫ শতাংশ করহার থাকছে, সঙ্গে অতিরিক্ত আড়াই শতাংশ সারচার্জ যুক্ত থাকবে। মোবাইল অপারেটরদের জন্য সাধারণ করহার ৪৫ শতাংশই থাকছে। তবে কোনো কোম্পানি পরিশোধিত মূলধনের ন্যূনতম ১০ শতাংশ শেয়ার স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত হলে করহার হবে ৪০ শতাংশ।
তবে মোবাইল ফোন অপারেটর কোম্পানিগুলোকে আরও বেশি পরিমাণ শেয়ার ছাড়তে উৎসাহিত করতে কর রেয়াতের জন্য অর্থমন্ত্রী প্রস্তাব করবেন বলে জানা গেছে। অর্থাৎ, কোনো মোবাইল কোম্পানি কমপক্ষে ২০ শতাংশ শেয়ার আইপিওর মাধ্যমে বিক্রি করলে সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বছরে প্রযোজ্য আয়করের ওপর ১০ শতাংশ হারে রেয়াত দেওয়া হবে।
অনিবাসী বাংলাদেশি ব্যতীত অন্যান্য সব করদাতার ক্ষেত্রে রেয়াত ব্যতিত করহার হতে পারে ৩০ শতাংশ, ট্রাস্ট, ফার্ম, ব্যক্তিসংঘ এবং অন্যান্য করারোপযোগ্য সত্তার করহার হতে পারে সাড়ে ২৭ শতাংশ; সমবায় সমিতির কর হার ২০ শতাংশ; এ ছাড়া বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়, বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ, বেসরকারি ডেন্টাল কলেজ, বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ বা শুধুমাত্র তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে শিক্ষাদানে নিয়োজিত বেসরকারি কলেজের করহার হতে পারে ১০ শতাংশ।
এদিকে রাজস্ব আয়েরও বিরাট লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এবারের বাজেটে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট খাতে বড় ধরনের পরিকল্পনা করেছে সরকার। এ লক্ষ্যে দেশের সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ভ্যাটের জালের আওতায় আনা হচ্ছে বলে জানা যাচ্ছে। কোনো ব্যবসাই আর ভ্যাট নিবন্ধন ছাড়া চালানো যাবে না। শুধু তাই নয়, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, ঋণ নেওয়া, ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া থেকে শুরু করে জরুরি সাত সেবায়ও নতুন অর্থবছর থেকে ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক হচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে দেশে বর্তমানে অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা (অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪ অনুযায়ী) ১ কোটি ১৭ লাখ, যা ২০১৩ সালে ছিল ৭৮ লাখ। এর মধ্যে ৯৯ শতাংশের বেশি কুটির, অতি ক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র ব্যবসা, যার ৭৪ শতাংশ গ্রামে।
এনবিআরের হিসাবে, বর্তমানে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৭ লাখ ৭৫ হাজারের মতো। ৫ লাখের কিছু বেশি প্রতিষ্ঠান নিয়মিত রিটার্ন দেয়। এ সংখ্যা বৃদ্ধি করতে সরকার ভ্যাট জাল বাড়াতে বাধ্যতামূলক নিবন্ধনের বার্ষিক টার্নওভারের সীমা ৩ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ৫০ লাখ টাকায় নামিয়ে এনেছে। ফলে ক্ষুদ্র-মাঝারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন দ্রুত বাড়ছে। এ ছাড়া ভ্যাট নিবন্ধন বাড়াতে দেশের ৪৬৫টি বণিক সমিতিকে সদস্য তালিকা জমা দিতে বলা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রীর এ পরিকল্পনার পেছনে বিনিয়োগে গতি আনা, অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করে কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং একটি ন্যায্যতাভিত্তিক, আধুনিক, স্বচ্ছ ও অটোমেটেড করব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করাকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে যোগদানের প্রাক্কালে বলেছেন দেশের প্রত্যেকটি মানুষের কথা মাথায় রেখে এবারের বাজেট দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, আমাদের সীমিত সম্পদের মধ্যেও দেশের প্রত্যেক নাগরিককে বিবেচনায় রাখা হয়েছে। কাউকে বাইরে রাখা হবে না। তাদের সুবিধা-অসুবিধা এবং জীবনযাত্রার মানের বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখেই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। মূল্যস্ফীতির বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, সীমিত সম্পদের তুলনায় বাজেটে সবার সুখ-দুঃখের কথা বিবেচনা করা হয়েছে।
বাজেট প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, দেশের অর্থনৈতিক পরিবর্তনে সরকারের এই যাত্রা কোনো গোষ্ঠীর বিশেষ সুবিধার ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং দেশের প্রতিটি নাগরিকের উৎপাদনশীল শক্তির ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা হবে। আমাদের এ ভিশনের কেন্দ্রে রয়েছে অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ণ, যেখানে অর্থনীতি হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, অংগ্রহণমূলক এবং সরবার জন্য উন্মুক্ত। তিনি বলেন, সরকারের পরিকল্পনা হচ্ছে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার; স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়া।