বিশ্বরাজনীতি ও বাংলাদেশ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বৈশ্বিক পরিসরে এত যুদ্ধময় পরিস্থিতি কখনো বিরাজ করেনি। গত প্রায় সাড়ে চার বছর সময় ধরে রাশিয়া এবং ইউক্রেনের মধ্যকার যুদ্ধকে এক অর্থে রাশিয়ার সঙ্গে ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে পরিণত করেছে। এর বাইরে আড়াই বছরের বেশি সময় ধরে হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধ একপর্যায়ে হামাসের সঙ্গে ইসরায়েল এবং আমেরিকার যুদ্ধে রূপ লাভ করার পর কথিত যুদ্ধবিরতি বিরাজ করছে। থেমে থেমে গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসন এবং হত্যাযজ্ঞও চলমান রয়েছে। মূলত এই যুদ্ধের পথ ধরেই বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের কঠিনতম সময়টি কাটছে। ভবিষ্যতে ইরানের দিক থেকে নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলায় ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, মধ্যপ্রাচ্যের ইরান সমর্থিত প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে ধ্বংস করতে এবং ইরানকে যেকোনো মূল্যে পরমাণু শক্তিধর দেশ হওয়া থেকে ঠেকাতে গত ১ বছর ধরে দফায় দফায় হামলা বর্তমানে খোদ যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের জন্য অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিকভাবে তাদের গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একটি শান্তিচুক্তির মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধের অবসান টানতে আপাতত যুদ্ধবিরতি চললেও থেকে থেকে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই তাদের শক্তি প্রদর্শন করে যাচ্ছে। যুদ্ধরত পক্ষগুলোর জন্য যুদ্ধের বৈধতা, মানবিক সংকট, আর্থিক বিপর্যয়, শরণার্থী সংকট এবং বিশ্বব্যাপী জ্বালানি নিরাপত্তায় যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এর সপক্ষ্যে যুক্তি প্রদর্শনের কোনো পথই অবশিষ্ট রাখেনি।

গোটা আন্তর্জাতিক কাঠামো আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। আন্তর্জাতিক এবং আঞ্চলিক সংস্থাগুলো আজ বৃহৎ শক্তিগুলোর ইচ্ছা-অনিচ্ছার ক্রীড়নকে পরিণত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তরকাল থেকে শুরু হওয়া শক্তির প্রতিযোগিতা একপর্যায়ে এক ধরনের শক্তিসাম্যের নিশ্চয়তা দিলেও নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে একটি একমেরুকেন্দ্রিক এবং স্বেচ্ছাচারী বিশ্বব্যবস্থার জন্ম দেয়, যার জের ধরে ছোট-বড় কিছু যুদ্ধ এবং গৃহযুদ্ধের পথ ধরে আন্তর্জাতিক এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে ভীষণরকম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক করে তোলে। এক সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্ভাব্য আগ্রাসন মোকাবিলায় ১৯৪৯ সালে সৃষ্টি হওয়া ন্যাটোর মতো সামরিক জোট সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই কেবল ব্যবহার হয়ে এসেছে। বৈশ্বিক আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের এহেন তৎপরতাগুলো বৈশ্বিক ক্ষমতা ভারসাম্যের জায়গায় পরিবর্তনের তাগিদ সৃষ্টি করে। এরই জের ধরে নতুন নিরাপত্তা শঙ্কা থেকে রাশিয়া এবং চীনের উত্থান ও মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের ক্রমবিস্তৃতিশীল ক্রিয়ার ফলে ইরানের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম থেকে আজকের বিশ্বব্যবস্থা এক ভয়াবহ অবস্থায় এসে পতিত হয়েছে।

সম্প্রতি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া ৪০ দিনের যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রথমত ইরানের বর্তমান নেতৃত্বকে ক্ষমতাচ্যুত করা এবং তার স্থলে যুক্তরাষ্ট্রের অনুগত শাসনব্যবস্থা চালু করে ইরানের পরমাণু সক্ষমতাকে সম্পূর্ণ ছেঁটে ফেলার নিমিত্তে তাদের সমৃদ্ধ ৪০০ কেজির বেশি ইউরেনিয়ামকে নিজেদের কব্জায় নিয়ে আসা। বলা যায়, ইরানের প্রবল লড়াকু মানসিকতার পাশাপাশি তাদের সক্ষমতাকে বেশ খাটো করেই দেখেছিল প্রতিপক্ষদ্বয়। যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে মূল দাবি হচ্ছে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ সম্পূর্ণভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করতে হবে, যা ইরান সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়ে পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে হরমুজ প্রণালির পুরো নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছে নিয়ে সেখান দিয়ে আন্তর্জাতিক জ¦ালানি পরিবহনকে নিয়ন্ত্রণ করছে।

গত বছর জুন মাসে ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য কয়েক দফা আলোচনা, আবার আলোচনা অসমাপ্ত রেখেই নতুন করে ইরানে হামলা, ৪০ দিনের যুদ্ধের পর আবারও যুদ্ধবিরতি দিয়ে আলোচনার মাধ্যমে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের চেষ্টা  এসব কিছুর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত তাদের মধ্যপ্রাচ্য নীতির মাধ্যমে কি অর্জন করতে চাচ্ছে তা খোদ ডোনাল্ড ট্রাম্প জানেন কিনা, এটা নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। এই ৪০ দিনের যুদ্ধ শুরুর সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প দৃঢ়ভাবে জানিয়েছিলেন ইরানে সরকার পরিবর্তন করাই তাদের মূল লক্ষ্য। যুদ্ধের মাঝ পথে যখন দেখা গেল যে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সম্মিলিত শক্তির তুলনায় যথেষ্ট দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও ইরান তাদের লড়াকু মনোভাব, কৌশল ও সুসমন্বয়ের মধ্য দিয়ে পাল্টা জবাব দিয়ে যাচ্ছে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখ থেকে তখন শোনা গেল যে, তারা ইরানের আকাশ ও নৌ সক্ষমতাকে ধ্বংস করে ফেলেছে এবং আলী খামেনিসহ শীর্ষ পর্যায়ের কমান্ডারদের হত্যার মধ্য দিয়ে ইতিমধ্যে নেতৃত্ব পরিবর্তনে তাদের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। এ ধরনের কথার মধ্য দিয়ে কার্যত একজন পরাজিত মানুষের আত্মপক্ষ সমর্থনের দিকটিই ফুটে ওঠে। অবশ্য এই যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি, বিরতিতে রয়েছে এবং বর্তমান বাস্তবতায় এর জয়-পরাজয় নির্ধারণ করার মতো অবস্থাও সৃষ্টি হয়নি। তবে ট্রাম্পের অস্থিরতা, মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি, অন্যায়ভাবে হুমকির পর হুমকি এবং আলোচনার মাঝপথে শর্ত বেঁধে দেওয়া এসব কিছুই এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থানকে যথেষ্টভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয় পরিস্থিতি, এই সমীকরণ জটিল।

যুদ্ধের প্রভাব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও পড়ছে, তবে সেটা আমাদের জন্য তেমন উদ্বেগের বিষয় নয় এই কারণে যে, এর সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত না হওয়ার পরও সারা বিশ্বকেই খেসারত দিয়ে যেতে হচ্ছে। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের অস্থিরতাজনিত কারণে আমদানি-রপ্তানিসহ বহির্বাণিজ্যে যেভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এ মুহূর্তে এই যুদ্ধ শেষ হলেও এর ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে অনেক সময় লাগবে। যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরান পাল্টা হামলা করেছে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোকে উদ্দেশ করে। অসংখ্য ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন নিক্ষেপ করেছে তারা। সেখানে নিহত হয়েছেন কয়েকজন বাংলাদেশিও, যারা তাদের কষ্টার্জিত অর্থে এদেশে তাদের পরিবারকে ভরণপোষণ করে আসছিলেন। হরমুজ প্রণালি ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকায় বাংলাদেশে জ্বালানি আমদানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশের চাহিদার জ্বালানির ৯৫ শতাংশই আমদানিনির্ভর, যার বেশিরভাগই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। এলএনজি আমদানির শতকরা ৫০ থেকে ৭৫ ভাগ আসে কাতার থেকে। জ্বালানি ছাড়াও আমাদের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স প্রবাহেও ভাটা পড়ছে। ইতিমধ্যে যুদ্ধের কারণে একটা বড় সংখ্যক মানুষকে দেশে ফিরে আসতে হয়েছে। গালফ কো-অপারেটিভ কাউন্সিলভুক্ত (জিসিসি) ৬টি দেশে (সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন এবং ওমান) বাংলাদেশের ৪৫ লাখের অধিক শ্রমিক কর্মরত। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক হিসাব অনুযায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট প্রবাসী আয়ের ৪৫ শতাংশের বেশি এসেছে এ দেশগুলো থেকে। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মী ফেরত আসা ছাড়াও এ দেশগুলোতে নতুন কর্মী পাঠানো নিয়েও সৃষ্টি হয়েছে অচলাবস্থা, যা আগামী দিনে দেশের অর্থনীতির জন্য আরও বড় ধাক্কা হিসেবে সামনে আসবে।

বিশ্বরাজনীতি ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিদ্যমান মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি যে বহুমাত্রিক সংকটের সৃষ্টি করেছে এর নিরসন কীভাবে হবে তা সহজ কথায় বলে দেওয়া কঠিন। বিদ্যমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল আরও অনেক দেশের জন্যই বহুমাত্রিক সংকট ঘনীভূত করেছে। ট্রাম্পসহ তার মিত্ররা যে আগ্রাসন নীতি লালন করে চলেছেন এর ভবিষ্যৎ পরিণতি আরও যে জটিল হবে তা বলা যায়।

আমাদের মতো দেশের জন্য আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে আমাদের সাহায্যনির্ভরতা। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ার ওপর নতুন করে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার কারণে তুলনামূলক সস্তা হলেও তাদের কাছ থেকে আমরা তেল ক্রয় করতে বা নতুন করে কোনো বাণিজ্যিক সম্পর্কে জড়াতে পারছি না। ভারত বা চীনের মতো দেশ যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাকে অমান্য করতে পারে, চাইলেও আমাদের পক্ষ্যে সেটা সম্ভব নয়। এর বাইরে জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অংশীদারত্বের সম্পর্ক। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সামর্থ্য বা সক্ষমতা দিয়ে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি থেকে বিশেষ সুবিধা আদায় করতে চাইলে বাধা আসতে পারে জিসিসির কাছ থেকে। বিদ্যমান সংকট দীর্ঘমেয়াদি, যার উত্তরণে এই মুহূর্ত থেকেই আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনায় অভ্যন্তরীণ সামর্থ্যকে ঝালাই করতে হবে। কর্মক্ষম মানুষকে উন্নত প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র এবং মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠায় বিশেষ প্রণোদনা দিয়ে দেশের অভ্যন্তরেই আমরা কর্মসংস্থানের পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারি। এক্ষেত্রে প্রয়োজন বিভিন্ন অংশীজনদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপের মাধ্যমে বিকল্প উপায় অন্বেষণ করা।

লেখক : কূটনীতি-রাজনীতি বিশ্লেষক। অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

mfulka@yahoo.com