অপরের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহনশীলতা

মানুষ সামাজিক জীব। একা বেঁচে থাকা তার পক্ষে সম্ভব নয়। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের অসংখ্য মানুষের সঙ্গে প্রতিনিয়ত তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই সম্পর্ককে সুন্দর, স্থিতিশীল ও কল্যাণময় করে তোলার জন্য প্রয়োজন পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতা। ইসলাম মানুষের ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বত্র এই দুটি গুণের চর্চাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। কারণ শ্রদ্ধা মানুষের মর্যাদা রক্ষা করে, আর সহনশীলতা বিরোধ ও সংঘাত কমিয়ে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করে।

ইসলামের দৃষ্টিতে প্রত্যেক মানুষ সম্মানিত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি আদম সন্তানকে সম্মানিত করেছি।’ (সুরা ইসরা ৭০) এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শন কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়, বরং এটি আল্লাহ প্রদত্ত মানবিক মর্যাদার স্বীকৃতি। মানুষ ধর্ম, বর্ণ, ভাষা বা জাতিগত পরিচয়ে ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু তার মানবিক মর্যাদা অক্ষুণœ থাকে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন শ্রদ্ধা ও সহনশীলতার সর্বোত্তম আদর্শ। তিনি ছোটদের স্নেহ করতেন, বড়দের সম্মান করতেন এবং ভিন্নমতের মানুষের প্রতি সদাচরণ করতেন। একবার এক ইহুদি ব্যক্তির জানাজা (খাটিয়ার ওপর রক্ষিত মৃতদেহ) তার সামনে দিয়ে নিয়ে যাওয়া হলে তিনি সম্মানসূচকভাবে দাঁড়িয়ে যান। তখন সাহাবিরা বললেন, এটি তো একজন ইহুদির জানাজা। উত্তরে তিনি বলেন, ‘সে কি একজন মানুষ নয়?’ (সহিহ বুখারি) এই ঘটনা ইসলামের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

অপরের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের অন্যতম ক্ষেত্র হলো পারিবারিক জীবন। ইসলাম পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ ও সম্মানকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমার রব আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণ করবে।’ (সুরা ইসরা ২৩) শুধু পিতা-মাতাই নন, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, শিক্ষক, বয়োজ্যেষ্ঠ এবং সমাজের সব মানুষের প্রতিও সম্মান প্রদর্শন ইসলামের শিক্ষা।

সহনশীলতা ইসলামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক গুণ। মানুষের চিন্তা, রুচি ও মতামতের পার্থক্য স্বাভাবিক। এই ভিন্নতাকে কেন্দ্র করে যদি সবাই অসহিষ্ণু আচরণ করে, তবে সমাজে অশান্তি ও বিভেদ সৃষ্টি হবে। ইসলাম মানুষকে ধৈর্য, সংযম ও ক্ষমাশীলতার শিক্ষা দেয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তুমি ক্ষমা প্রদর্শন করো এবং ভালো কাজের আদেশ দাও। আর মূর্খদের থেকে বিমুখ থাকো।’ (সুরা আরাফ ১৯৯)

মতভেদ ও বিরোধের ক্ষেত্রেও ইসলাম সংযত আচরণের শিক্ষা দেয়। কোরআন মাজিদে বলা হয়েছে, ‘তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করো প্রজ্ঞা ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সঙ্গে উত্তম পন্থায় বিতর্ক করো।’ (সুরা নাহল ১২৫) অর্থাৎ ভিন্নমত পোষণকারী মানুষের সঙ্গে শিষ্টাচার ও সৌজন্য বজায় রেখে কথা বলা ইসলামের নির্দেশ।

বর্তমান বিশ্বে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রাজনৈতিক বিভাজন ও মতাদর্শিক সংঘাতের কারণে অসহিষ্ণুতা দিন দিন বাড়ছে। মানুষ সহজেই অন্যকে অপমান করছে, বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে এবং মতের অমিলকে শত্রুতার কারণ বানাচ্ছে। অথচ একজন মুসলমানের পরিচয় হওয়া উচিত ভিন্ন। তার কথা ও আচরণে থাকবে নম্রতা, সৌজন্য ও সহনশীলতা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রকৃত শক্তিশালী ব্যক্তি সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে। বরং প্রকৃত শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ (সহিহ বুখারি)

শ্রদ্ধা ও সহনশীলতা সুস্থ সমাজ নির্মাণের ভিত্তি। যেখানে মানুষ একে অপরকে সম্মান করবে, মতভেদকে সহনীয়ভাবে গ্রহণ করবে এবং ক্ষমা ও উদারতার চর্চা করবে, সেখানে শান্তি, সম্প্রীতি ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত হবে। ইসলামের শিক্ষা হলো, মানুষের মর্যাদা রক্ষা করা, হৃদয়ের দূরত্ব কমানো এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য গড়ে তোলা।

লেখক : ইসলামি গবেষক