নবীজির মূল্যবান ৫ উপদেশ

আপডেট : ১০ জুন ২০২৬, ০৭:০৪ এএম

মানুষের জীবনের সফলতা ও কল্যাণের জন্য ইসলামে এমন কিছু মৌলিক নীতি রয়েছে, যা অনুসরণ করলে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক। তিনি অল্প কথায় গভীর অর্থপূর্ণ শিক্ষা প্রদান করতেন। তিরমিজিসহ একাধিক হাদিসের কিতাবে বর্ণিত আছে, একদিন তিনি সাহাবায়ে কেরামকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমার কাছ থেকে পাঁচটি কথা কে গ্রহণ করবে, মুখস্থ রাখবে এবং অন্যদের কাছে পৌঁছে দেবে?’ তখন আবু হুরায়রা (রা.) এ দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর নবীজি (সা.) এমন পাঁচটি অমূল্য উপদেশ প্রদান করেন, যা একজন মানুষের ইমান, আমল, চরিত্র ও আত্মশুদ্ধির পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা বহন করে।

এক. নবীজি (সা.) বলেন, ‘হারাম ও গুনাহ থেকে বেঁচে থাকো, তাহলে তুমি মানুষের মধ্যে সর্বাধিক ইবাদতকারী হিসেবে গণ্য হবে।’ অনেক মানুষ বেশি বেশি নফল নামাজ, রোজা ও অন্যান্য ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করেন। কিন্তু নবীজি (সা.) আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা অনেক সময় অধিক ইবাদতের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গুনাহ মানুষের আমলকে নষ্ট করে দেয় এবং আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

দুই. নবীজি (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তোমার জন্য যা নির্ধারণ করেছেন, তাতে সন্তুষ্ট থাকো। তাহলে তুমি সবচেয়ে অমুখাপেক্ষী ও ধনী মানুষ হবে।’ মানুষের অধিকাংশ অশান্তির মূল কারণ হলো লোভ ও অসন্তুষ্টি। মানুষ সব সময় ভাবে, ‘আরও পেলে ভালো হতো, আরও সম্পদ থাকলে সুখী হতাম।’ কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, বিপুল সম্পদের অধিকারী অনেক মানুষও মানসিক শান্তি থেকে বঞ্চিত। কারণ তাদের চাহিদার কোনো শেষ নেই।

তিন. নবীজি (সা.) বলেন, ‘তোমার প্রতিবেশীর সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো, তাহলে তুমি প্রকৃত মুমিন হবে।’ ইসলাম প্রতিবেশীর অধিকারের প্রতি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। এমনকি রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জিবরাইল (আ.) প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কে এত বেশি উপদেশ দিয়েছেন যে, তিনি মনে করেছিলেন প্রতিবেশীকে হয়তো উত্তরাধিকারীও বানিয়ে দেওয়া হবে।

বর্তমান সমাজে অনেক সময় আত্মীয়-স্বজনের চেয়েও প্রতিবেশীর প্রয়োজন বেশি দেখা দেয়। সুখে-দুখে, বিপদে-আপদে, অসুস্থতায় কিংবা দৈনন্দিন জীবনের নানা প্রয়োজনে প্রতিবেশীর সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই একজন মুমিনের কর্তব্য হলো প্রতিবেশীর খোঁজখবর নেওয়া, তার কষ্টে পাশে দাঁড়ানো, তাকে কষ্ট না দেওয়া এবং সর্বদা উত্তম আচরণ করা।

চার. নবীজি (সা.) বলেন, ‘নিজের জন্য যা পছন্দ করো, মানুষের জন্যও তা পছন্দ করো। তাহলে তুমি প্রকৃত মুসলিম হবে।’ এটি নৈতিকতার অন্যতম মৌলিক নীতি। একজন মুসলমান শুধু নিজের কল্যাণের কথা চিন্তা করবে না, বরং অন্যদের জন্যও সেই কল্যাণ কামনা করবে। আমরা প্রত্যেকে চাই, কেউ আমাদের গালি না দিক, আমাদের সম্মান নষ্ট না করুক, আমাদের গিবত না করুক এবং আমাদের বিরুদ্ধে মন্দ ধারণা না পোষণ করুক। সুতরাং আমাদেরও উচিত অন্যের প্রতি একই আচরণ করা।

পাঁচ. নবীজি (সা.) বলেন, ‘অধিক হাসাহাসি কোরো না। কারণ অতিরিক্ত হাসি অন্তরকে মেরে ফেলে।’ ইসলাম আনন্দ ও হাসিকে নিষিদ্ধ করেনি। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও হাসতেন এবং সাহাবিদের সঙ্গে আনন্দঘন মুহূর্ত কাটাতেন। তবে তিনি অতিরিক্ত হাসি-তামাশা ও বিনোদনের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যখন মানুষ সব সময় হাসি-ঠাট্টা, বিনোদন ও দুনিয়াবি আনন্দে মগ্ন থাকে, তখন তার অন্তর ধীরে ধীরে আখেরাতের চিন্তা থেকে গাফেল হয়ে যায়।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই পাঁচটি উপদেশ মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক জীবনের জন্য এক অনন্য জীবনবিধান। আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে এ মহামূল্যবান শিক্ষাগুলো জীবনে বাস্তবায়নের তওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : মুহাদ্দিস ও শিক্ষা সচিব, জামিয়া দারুল হিকমাহ, কেওয়া, শ্রীপুর, গাজীপুর

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত