জ্ঞান সংরক্ষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যে জাতি তার জ্ঞান, ইতিহাস ও অভিজ্ঞতাকে সংরক্ষণ করতে পারে, সেই জাতিই যুগের পর যুগ টিকে থাকে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পথ দেখায়। ইসলাম এমন একটি ধর্ম, যার সূচনালগ্ন থেকেই জ্ঞানার্জন, লিখন ও সংরক্ষণের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শুধু ধর্মীয় জ্ঞান নয়, মানবকল্যাণে প্রয়োজনীয় সব ধরনের জ্ঞান সংরক্ষণ ও প্রচারের ক্ষেত্রেও মুসলমানরা ইতিহাসে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
ইসলামের সূচনা হয়েছে জ্ঞানের আহ্বানের মাধ্যমে। মহানবী (সা.)-এর প্রতি অবতীর্ণ প্রথম ওহিতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘পড়ো তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা আলাক ১) একই সুরায় আরও বলা হয়েছে, ‘যিনি কলমের মাধ্যমে শিক্ষা দিয়েছেন।’ (সুরা আলাক ৪)
এ দুটি আয়াত ইসলামের জ্ঞানদর্শনের ভিত্তি নির্মাণ করেছে। এখানে যেমন পড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তেমনি কলমের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ জ্ঞান অর্জন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তা লিখে সংরক্ষণ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
মানবজাতির ইতিহাসে কোনো ধর্মগ্রন্থ এত সুসংগঠিতভাবে সংরক্ষিত হয়েছে কি না, তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে বিস্তর আলোচনা রয়েছে। তবে কোরআন সংরক্ষণের প্রক্রিয়া নিঃসন্দেহে ইতিহাসের এক বিস্ময়।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর ওহি নাজিল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাহাবায়ে কেরাম তা মুখস্থ করতেন এবং লিখেও রাখতেন। খেজুরপাতা, চামড়া, পাথরের পাত ও হাড়সহ বিভিন্ন উপকরণে কোরআনের আয়াত লিপিবদ্ধ করা হতো।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর হজরত আবু বকর (রা.)-এর যুগে কোরআন একত্রে সংকলনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে হজরত ওসমান (রা.)-এর খেলাফতকালে কোরআনের প্রামাণ্য কপি প্রস্তুত করে বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়। এভাবে কোরআনের পাঠ, লিখন ও সংরক্ষণের একটি সুসংহত ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, যা আজও অবিকৃতভাবে টিকে আছে।
ইসলাম শুধু ধর্মীয় জ্ঞান নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক দলিল সংরক্ষণের প্রতিও গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কোরআনের সবচেয়ে দীর্ঘ আয়াত ঋণসংক্রান্ত। সেখানে ঋণ লেনদেন লিখে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা, যখন তোমরা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পরস্পর ঋণের লেনদেন করবে, তখন তা লিখে রাখবে...। (সুরা বাকারা ২৮২)
এই আয়াত প্রমাণ করে, ইসলামে লিখিত দলিল, তথ্য সংরক্ষণ ও প্রামাণ্য নথির গুরুত্ব কতটা গভীর।
মহানবী (সা.)-এর বাণী, কর্ম ও অনুমোদন সংরক্ষণের জন্য মুসলিম মনীষীরা যে শ্রম দিয়েছেন, তা ইতিহাসে বিরল। হাদিস সংগ্রহের জন্য মুহাদ্দিসরা হাজার হাজার কিলোমিটার সফর করেছেন। একজন বর্ণনাকারীর চরিত্র, স্মৃতিশক্তি ও সততা যাচাই করে তারপর হাদিস গ্রহণ করেছেন। এভাবে গড়ে ওঠে ‘ইলমুল আসমাউর রিজাল’ বা বর্ণনাকারী বিশ্লেষণের বিজ্ঞান।
ইমাম বুখারি (রহ.) প্রায় ছয় লাখ হাদিস থেকে যাচাই-বাছাই করে প্রায় সাত হাজারের কিছু বেশি হাদিস তার সংকলনে অন্তর্ভুক্ত করেন। একইভাবে ইমাম মুসলিম, ইমাম আবু দাউদ, ইমাম তিরমিজি ও অন্য মুহাদ্দিসরাও হাদিস সংরক্ষণে অসামান্য অবদান রাখেন। এটি শুধু ধর্মীয় অনুরাগের বিষয় ছিল না, বরং জ্ঞান সংরক্ষণের একটি সুসংগঠিত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির উদাহরণ।
ইসলামের স্বর্ণযুগে মুসলিম বিশ্বে অসংখ্য গ্রন্থাগার ও গবেষণাকেন্দ্র গড়ে ওঠে। আব্বাসীয় খেলাফতের সময় বাগদাদের বায়তুল হিকমা ছিল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্ঞানকেন্দ্র। সেখানে বিভিন্ন ভাষার বই অনুবাদ, গবেষণা ও সংরক্ষণ করা হতো। জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান, দর্শন, গণিত ও ভূগোলসহ নানা বিষয়ে বিপুলসংখ্যক গ্রন্থ রচিত ও সংরক্ষিত হয়।
কায়রো, কর্ডোভা, দামেস্ক, নিশাপুর ও সমরকন্দের গ্রন্থাগারগুলোও জ্ঞানচর্চার উজ্জ্বল কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। এসব প্রতিষ্ঠানে লাখ লাখ পা-ুলিপি সংরক্ষিত থাকত, যা পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় রেনেসাঁর ভিত্তি নির্মাণেও ভূমিকা রাখে।
মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কারের আগে মুসলিম বিশ্বে জ্ঞান সংরক্ষণের প্রধান মাধ্যম ছিল হাতে লেখা পা-ুলিপি। কোরআন, হাদিস, ফিকহ, তাফসির, ইতিহাস, সাহিত্য ও বিজ্ঞানবিষয়ক অসংখ্য গ্রন্থ হাতে লিখে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
আজও বিশ্বের বিভিন্ন গ্রন্থাগার, জাদুঘর ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষিত এসব পা-ুলিপি মুসলিম সভ্যতার ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করছে।
তবে ইতিহাসের নানা পর্যায়ে যুদ্ধ, আগ্রাসন ও অবহেলার কারণে অসংখ্য মূল্যবান গ্রন্থ ও নথি হারিয়ে গেছে। বিশেষ করে ১২৫৮ সালে মঙ্গলদের হাতে বাগদাদ ধ্বংসের ঘটনা জ্ঞানভাণ্ডারের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত হয়।
লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও ইসলামি গবেষক