পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে গত ১৫ বছর একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল মমতা বন্দোপাধ্যয়ের। ২০১১ সালে রাজ্যটিতে ৩৪ বছরের কমিউনিস্ট শাসনের অবসান ঘটে তার হাত ধরেই। সময়ের পরিক্রমায় তিনি তৃণমূল কংগ্রেসকে (টিএমসি) ভারতের সবচেয়ে সফল আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলে পরিণত করেন এবং নিজেও দেশের অন্যতম শক্তিশালী বিরোধী রাজনীতিবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান। তবে চলতি বছরের বিধানসভা নির্বাচনে বিরোধী দল বিজেপির কাছে ভরাডুবি হয়েছে মমতার তৃণমূলের। ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়ার মাত্র এক মাসের মধ্যেই মুদ্রার উল্টো পিঠ দেখছেন মমতা। অধিকাংশ বিধায়কের বিদ্রোহ, সাংসদদের সম্ভাব্য বিভক্তি এবং প্রতিষ্ঠাতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কর্র্তৃত্ব ক্রমবর্ধমান সন্দেহের মুখে পড়েছে। তাতে পূর্ব ভারতের ১০ কোটিরও বেশি মানুষের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল এখন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার পরিস্থিতির মুখোমুখি।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কোনো সাধারণ আঞ্চলিক নেতা নন। ‘টাইম’ সাময়িকী তাকে বিশ্বের ১০০ জন প্রভাবশালী ব্যক্তির একজন হিসেবে বেছে নিয়েছিল। ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ, ধর্মীয় মেরূকরণ এবং ভোটার তালিকা ঘিরে বিতর্কএই তিনের সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসে। তবুও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়নি। সবশেষ নির্বাচনে দলটি ২ কোটি ৬০ লাখ ভোট পেয়েছে, যা বিজেপির চেয়ে মাত্র প্রায় ৩০ লাখ কম। তারা মোট ভোটের প্রায় ৪০ শতাংশ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। রাজ্য বিধানসভায় তাদের এখনো ৮০ জন বিধায়ক এবং সংসদে ২৮ জন সদস্য রয়েছে। প্রচলিত রাজনৈতিক মানদণ্ডে বিচার করলে, পরাজয়ের পর তাদের নতুন করে সংগঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার বদলে দলটি যেন ভেঙে পড়ছে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে বিধানসভার ভেতর থেকে। নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই টিএমসির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ বিধায়ক বিদ্রোহ করেন। বিদ্রোহীরা দলের আইনসভা শাখার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়, নিজেদের বিরোধী দলীয় নেতা নির্বাচিত করে এবং দলীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আইনসভার নথিতে জাল স্বাক্ষর ব্যবহারের অভিযোগ তোলে। প্রথমে যা কেবল রাজ্যপর্যায়ের বিদ্রোহ বলে মনে হয়েছিল, তা এখন দিল্লিতেও ছড়িয়ে পড়েছে। খবর অনুযায়ী, টিএমসির ২৮ জন সাংসদের মধ্যে ২০ জন সংসদের স্পিকারের কাছে চিঠি দিয়ে দলটির সংসদীয় গোষ্ঠী থেকে বেরিয়ে এসে বিজেপি নেতৃত্বাধীন শাসক জোটের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। যদি এই খবর সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে এটি কেবল আইনসভা-সংক্রান্ত বিদ্রোহ নয়; বরং দলীয় নেতৃত্ব ও ঐক্যের অস্তিত্বের জন্যই একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। সংসদীয় বিদ্রোহ আসলে আরও বড় ভাঙনের সবচেয়ে দৃশ্যমান লক্ষণ মাত্র।
প্রায় প্রতিদিনই টিএমসির নেতাদের দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে এবং জনসমক্ষে হাজির করা হচ্ছে। দলীয় কার্যালয়গুলো প্রায় ফাঁকা, সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক ভেঙে ফেলা হচ্ছে এবং যারা একসময় ভয় ও প্রভাবের প্রতীক ছিলেন, তারা নিজেদের ঘাঁটিতেই প্রকাশ্যে আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। রাজনীতি-বিশ্লেষক দ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য বলেন, ‘যা ঘটেছে, তা সত্যিই নজিরবিহীন।’ তার মতে, টিএমসির দ্রুত ভেঙে পড়া আরও গভীর একটি দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। সেটি হল টিএমসি কখনোই এমন একটি শক্তিশালী আদর্শিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি, যা ক্ষমতা হারানোর পরও দলকে টিকিয়ে রাখতে পারে। দলকে একত্রে ধরে রাখার মূল শক্তি ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এবং ক্ষমতার সঙ্গে আসা পৃষ্ঠপোষকতা। ভট্টাচার্যের ভাষায়, দলটি দুটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল ‘মমতার ব্র্যান্ডমূল্য এবং সরকারি সম্পদ’। এখন সেই দুই স্তম্ভই রাষ্ট্রক্ষমতা এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অপরাজেয় ভাবমূর্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে।
ভট্টাচার্য বলেন, ‘টিএমসি সরকার হারিয়েছে এবং কলকাতায় মমতার ব্যক্তিগত নির্বাচনী পরাজয় তার রাজনৈতিক ব্র্যান্ডকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আর ঠিক এই জায়গাতেই বিজেপি এই কাহিনির ভেতরে প্রবেশ করে।’ দিল্লিভিত্তিক নীতিগত গবেষণা কেন্দ্রের গবেষক রাহুল বর্মা মনে করেন, জাতীয়পর্যায়ে বিজেপির প্রভাবশালী অবস্থান আঞ্চলিক রাজনীতিকদের জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। তিনি বলেন, আগে দলত্যাগ সাধারণত ব্যক্তিগত পর্যায়ে হতো। এখন পুরো গোষ্ঠী বিদ্রোহ করতে পারে কারণ বিজেপি তাদের জন্য বিকল্প ক্ষমতা, সম্পদ ও রাজনৈতিক সুরক্ষার কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে। বর্মার মতে, টিএমসির সংকট আসলে ভারতীয় রাজনীতির একটি বৃহত্তর পরিবর্তনের অংশ। তিনি বলেন, একজন প্রতিষ্ঠাতার নেতৃত্ব উচ্চাকাক্সক্ষী সহযোগীরা মেনে নিতে পারেন, কিন্তু নেতৃত্ব যখন পরিবারের উত্তরসূরির হাতে তুলে দেওয়া হয়, তখন অনেকেই তা মেনে নিতে চান না। উদ্ধব ঠাকরে তার ছেলে আদিত্যকে সামনে আনার পর শিবসেনায় যে বিভক্তি দেখা দেয়, সেটি এর একটি উদাহরণ।