ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য একটি শান্তিচুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ক্রমশ আশাবাদী হয়ে উঠছিলেন, ঠিক তখনই আবার সংঘাতের কালো ছায়া নেমেছে উপসাগরীয় অঞ্চলে। গত রবিবার রাতে ইসরায়েলে ইরানের হামলার মধ্য দিয়ে আবারও সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছে। ইরানের অভিজাত ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) বলেছে, ইসরায়েলে চালানো এই হামলা আরও ব্যাপক জবাবের একটি পূর্ব সতর্কবার্তা। এক বিবৃতিতে আইআরজিসির মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাকারি বলেন, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীকে দক্ষিণ লেবানন ও বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলের উপশহরগুলোতে হামলা বন্ধ করতে হবে। ইসরায়েল জানিয়েছে, এর জবাবে ইরানের পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলে হামলা চালিয়েছে তারা। ইরানের রাজধানী তেহরান, ছাড়াও তাবরিজ, ইস্পাহান ও কারাজের কাছে বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। তেহরানের ফায়ার সার্ভিসের বরাতে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, গতকাল সোমবার ভোরে রাজধানীর পশ্চিমাংশে অন্তত দুটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। তবে এসব বিস্ফোরণের ঘটনায় হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির কোনো তথ্য প্রাথমিকভাবে জানা যায়নি। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হিজবুল্লাহর পক্ষে প্রথমবারের মতো ইরানি সামরিক বাহিনীর সরাসরি হস্তক্ষেপে এই সংঘাত এখন নতুন একপর্যায়ে পৌঁছেছে। উত্তেজনা প্রশনে উভয় পক্ষকে অবিলম্বে হামলা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ট্রাম্পের আহ্বানের পর সোমবার বিকেলেই হামলা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে ইরান। দেশটির শীর্ষ সামরিক কমান্ড খাতাম আল-আনবিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের বিবৃতিতে বলা হয়, সশস্ত্র বাহিনীর চলমান অভিযান সমাপ্তির ঘোষণা দেওয়া হলো। পাশাপাশি বিবৃতিতে সতর্ক করে দিয়ে বলা হয়েছে, ইসরায়েল যদি ইরান ও লেবাননে হামলা চালাতে থাকে তেহরান ‘আগের চেয়ে আরও কঠোর এবং শক্তিশালী’ জবাব দেবে। এর মধ্য দিয়ে তেহরান একটি পরিষ্কার বার্তা দিচ্ছে : ‘তোমরা যদি বৈরুতে হামলা কর, তবে আমরা ইসরায়েলে আঘাত হানব।’ ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত বক্তৃতায় ইব্রাহিম জোলফাকারি বলেন, যুদ্ধবিরতি বারবার লঙ্ঘন করে জায়নবাদী উগ্র শাসনব্যবস্থা (ইসরায়েল) অপরাধী যুক্তরাষ্ট্রের সবুজসংকেতসমর্থনে লেবাননের নিপীড়িত জনগণের ওপর দিন দিন নৃশংসতা বাড়িয়ে চলছে। জায়নবাদী সেনাবাহিনীকে দক্ষিণ লেবানন ও বৈরুতের উপশহরগুলোতে হামলা বন্ধ করতে হবে। তারা যদি ওই অঞ্চলে হামলা আরও বিস্তৃত করে বা ইরানের পদক্ষেপের জবাব দেয়, তাহলে তাদের আরও কঠোর ও অনুশোচনীয় আঘাতের মুখোমুখি হতে হবে। তখন ওই শাসনব্যবস্থা ও তার সমর্থকদের বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক হামলা শুরু হবে।
গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের যুদ্ধ বন্ধ হলেও, লেবাননে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েই যাচ্ছে ইসরায়েল। দখলদার রাষ্ট্রটি হিজবুল্লাহকে দমনের নামে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে একের পর এক প্রাণঘাতী হামলা চালাচ্ছে। আলোচনার টেবিলে মুখে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের কথা বললেও, প্রতিদিনই লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় প্রাণ হারাচ্ছেন বেসামরিক নাগরিকরা। মূলত তেহরান এখন লেবানন এবং ইরানের যুদ্ধক্ষেত্রগুলোকে একই সূত্রে বাঁধার চেষ্টা করছে। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কৌশল হলো এই রণক্ষেত্রগুলোকে একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন করা। তেহরান মনে করছে, লেবানন ও ইরানের ফ্রন্ট এক থাকলে ইসরায়েলের ওপর চাপ বজায় রাখা সহজ হবে। এই লক্ষ্যে ওয়াশিংটন সম্প্রতি একটি কূটনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু করেছে, যেখানে কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো লেবানন ও ইসরায়েল সরকার সরাসরি আলোচনায় বসেছে। তবে এই আলোচনায় এখন পর্যন্ত কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। হিজবুল্লাহ শুরু থেকেই এই আলোচনার প্রস্তাব ও প্রক্রিয়া প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
সম্প্রতি ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে জানিয়েছে, আঞ্চলিক এই সংকটের যেকোনো টেকসই সমাধানের জন্য সব ফ্রন্টে একযোগে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে হবে। কোনো একটি নির্দিষ্ট ফ্রন্টকে বাদ দিয়ে সমাধান সম্ভব নয়। ইরানের এই নতুন সমীকরণ‘বৈরুতে হামলা মানেই ইসরায়েলে পাল্টা আঘাত’ অঞ্চলটির যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও সংঘাতময় করে তুলতে পারে। তবে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে চরম বিপাকে পড়েছে লেবানন সরকার। একদিকে হিজবুল্লাহ ও ইরানের অনড় অবস্থান, অন্যদিকে ইসরায়েলের ক্রমাগত হামলা সব মিলিয়ে শান্তিপ্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে লেবানন সরকারকে এক কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
পাল্টাপাল্টি হামলা
ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় খুজেস্তান প্রদেশের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর শহর মাহশহরের কারুন পেট্রোকেমিক্যাল কোম্পানির কারখানায় বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। দেশটির আধা সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, গতকাল সোমবার সকালে বিমান থেকে ছোড়া প্রোজেক্টাইলগুলো কারখানাটির কয়েকটি অংশে আঘাত হানে; এতে স্থাপনাটির কয়েকটি বিভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খুজেস্তানের নিরাপত্তা ও আইন প্রয়োগবিষয়ক ডেপুটি গভর্নর হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এর আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধের প্রথম ৪০ দিনেও মাহশহরের পাঁচটি পেট্রোকেমিক্যাল প্রোডাকশন লাইন আক্রমণকারীদের ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। জবাবে ইসরায়েলের হাইফা শহরের একটি পেট্রোকেমিক্যাল কারখানায় পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে আইআরজিসি। বাহিনীটি সতর্ক করে বলেছে ভবিষ্যতে যদি বেসামরিক বা জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে আরও হামলা চালানো হয়, তাহলে তার প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও পড়তে পারে। আর এর দায়ভার যুক্তরাষ্ট্রকেই বহন করতে হবে। ইরানের এ হামলার বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি ইসরায়েল।
ইসরায়েলের দুটি বিমান ঘাঁটি লক্ষ্য করেও হামলা চালিয়েছে ইরান। দেশটির ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড জানিয়েছে, তারা ইসরাইলের নেভাতিম ও তেল নোফ বিমানঘাঁটি নিশানা করে হামলা চালিয়েছে। আইআরজিসি বলছে, ইরানের তিনটি অঞ্চলে রাডার স্থাপনায় হামলার জবাবে তারা এই হামলা চালিয়েছে। ইরানের হামলার পর নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার জরুরি বৈঠক ডেকেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম বলছে, ইরানের সঙ্গে সংঘাতের মধ্যে স্থানীয় সময় বেলা ১১টায় নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার বৈঠকটি সীমিত পরিসরে অনুষ্ঠিত হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তার বরাতে টাইমস অব ইসরায়েল বলেছে, বৈঠকটিতে কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী অংশ নেন।
উভয় পক্ষই যুদ্ধবিরতি চায় : ট্রাম্প
ইরান ও ইসরায়েলের পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যেই আশার কথা শুনিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি জানিয়েছেন, দুই দেশই বর্তমান সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে এবং শান্তির প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। গতকাল নিজের সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি জানান, ইসরায়েল এবং ইরান উভয় পক্ষই চূড়ান্ত আলোচনার মাধ্যমে অবিলম্বে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে চাইছে। যদি অজ্ঞতা বা বোকামি এই পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, তবে শান্তির প্রক্রিয়া যথাযথভাবেই এগোচ্ছে। সংঘাত নিরসনে আলোচনার কথা উল্লেখ করলেও এখনই কড়াকড়ি শিথিল করছেন না ট্রাম্প। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, চূড়ান্ত কোনো সমঝোতায় না পৌঁছানো পর্যন্ত অবরোধ বহাল থাকবে। ট্রাম্প বলেন, একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে না পৌঁছানো পর্যন্ত অবরোধ পূর্ণ শক্তিতে কার্যকর থাকবে। সবকিছু দ্রুত গতিতে এগিয়ে নেওয়া উচিত। এই বিষয়ে আপনাদের মনোযোগের জন্য ধন্যবাদ।