২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপকে সামনে রেখে আবারও আলোচনায় এসেছেন মাগুরার ফুটবলপ্রেমী কৃষক আমজাদ হোসেন (৭০)। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ধরে রেখে এবার তিনি তৈরি করেছেন সাড়ে সাত কিলোমিটার দীর্ঘ জার্মানির জাতীয় পতাকা, যা স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আগ্রহ ও উৎসাহের সৃষ্টি করেছে।
বুধবার (১০ জুন) সকালে মাগুরা সদর উপজেলার নিশ্চিন্তপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে আনুষ্ঠানিকভাবে পতাকাটি প্রদর্শন করা হয়। অনুষ্ঠানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ও ফুটবলপ্রেমীরা উপস্থিত ছিলেন।
মাগুরা পৌরসভার ঘোড়ামারা গ্রামের বাসিন্দা আমজাদ হোসেন পেশায় একজন কৃষক। প্রায় দুই দশক ধরে তিনি বিশ্বকাপ ফুটবলকে ঘিরে জার্মানির প্রতি নিজের ভালোবাসার প্রকাশ হিসেবে বিশাল আকারের পতাকা তৈরি করে আসছেন।
জানা যায়, ২০০৬ সালে তিনি প্রথম দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ জার্মানির পতাকা তৈরি করেন। এরপর ২০১০ সালে আড়াই কিলোমিটার, ২০১৪ সালে সাড়ে তিন কিলোমিটার এবং ২০১৮ সালে সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ পতাকা নির্মাণ করেন। এবার সেই ধারাবাহিকতায় নতুন করে আরও দুই কিলোমিটার পতাকা যুক্ত করে এর মোট দৈর্ঘ্য দাঁড় করিয়েছেন সাড়ে সাত কিলোমিটারে।
পাঁচ ছেলে ও পাঁচ মেয়ের জনক আমজাদ হোসেন জানান, নতুন অংশের পতাকা তৈরি করতে প্রায় ৯০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭০ হাজার টাকা কাপড় কেনায় এবং বাকি অর্থ পরিবহন ও সেলাই খাতে ব্যয় করা হয়েছে। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চারজন দরজি পতাকাটি সেলাইয়ের কাজ করেন।
আমজাদ হোসেন বলেন, “একসময় পরিবারের অনেকেই পতাকা তৈরির বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু এবার আমার বড় ছেলে খরচের টাকা দিয়েছে। তারা জানে, জার্মানির প্রতি আমার এই ভালোবাসা কোনো বাধায় থামবে না।”
তিনি জানান, ২০১৪ সালে পতাকা তৈরির জন্য প্রায় ২০ শতক জমি বিক্রি করেছিলেন। সে সময় তার মোট ব্যয় হয়েছিল প্রায় পাঁচ লাখ টাকা। জার্মানি বিশ্বকাপ জয়ের পর তিনি গরু জবাই করে মেজবানের আয়োজনও করেছিলেন। ২০১৮ সালেও পতাকা নির্মাণে কয়েক লাখ টাকা ব্যয় করেন এবং জমি বিক্রি করতে হয়েছিল।
আমজাদের জার্মানিপ্রীতির পেছনেও রয়েছে একটি বিশেষ গল্প। তিনি জানান, ২০০৫ সালে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ার পর জার্মানিতে তৈরি একটি হোমিওপ্যাথিক ওষুধ সেবন করে সুস্থতা ফিরে পান। এরপর থেকেই দেশটির প্রতি তার গভীর অনুরাগ জন্ম নেয়। সেই ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ২০০৬ সালের বিশ্বকাপ থেকে নিয়মিত জার্মানির পতাকা তৈরি করে আসছেন।
তিনি বলেন, এটা শুধু একটা পতাকা নয়, আমার আবেগ ও ভালোবাসার প্রতীক। আমি চাই এই পতাকাটি একদিন জার্মান দূতাবাসের মাধ্যমে সংরক্ষিত হোক, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এটি দেখতে পারে।
উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে তৎকালীন জার্মান রাষ্ট্রদূত মাগুরায় এসে আমজাদ হোসেনের তৈরি পতাকা উদ্বোধন করেন এবং তাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তিনি জার্মান ফুটবল দলের ফ্যান ক্লাবের আজীবন সদস্যপদ লাভ করেন। পরবর্তীতেও জার্মান দূতাবাসের কর্মকর্তারা তার উদ্যোগের প্রশংসা করেন। ২০২৬ বিশ্বকাপকে ঘিরে আমজাদ হোসেনের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ইতোমধ্যে মাগুরাসহ দেশের ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।