আর্জেন্টিনাকে হারানো কঠিন

বিশ্বমঞ্চে নিজেদের শিরোপা ধরে রাখার মিশন শুরুর আগে প্রতিপক্ষদের যেন কিছুটা নড়েচড়ে বসতে বললেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক লিওনেল মেসি। সাফ জানিয়ে দিলেন, এই শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ আর্জেন্টিনাকে হারানো যেকোনো প্রতিপক্ষের জন্যই এবার বেশ কঠিন হবে। অধিনায়কের এমন আত্মবিশ্বাসী বার্তার আগে গতকাল বুধবার মাঠের পারফরম্যান্সেও তার প্রমাণ দিয়েছে বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। আলবামার জর্ডান-হেয়ার স্টেডিয়ামে ৮৮ হাজারেরও বেশি দর্শকের উপস্থিতিতে আইসল্যান্ডকে ৩-০ ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়েছে লিওনেল স্কালোনির দল। ভ্যালেন্টিন বার্কো, লিওনেল মেসি ও থিয়াগো আলমাদার করা তিনটি গোল যেমন আর্জেন্টাইন ভক্তদের আনন্দ দিয়েছে, তেমনি এই ম্যাচটি দলের জন্য রেখে গেছে অনেক স্বস্তি ও কিছু নতুন সমীকরণ।

ম্যাচের সবচেয়ে বড় আকর্ষণই ছিল অধিনায়ক লিওনেল মেসির মাঠে ফেরা। বাঁ পায়ের হ্যামস্ট্রিংয়ের চোটের কারণে গত ২৪ মে থেকে মাঠের বাইরে থাকা এই মহাতারকা দুই সপ্তাহ পর আজকের ম্যাচে প্রথমার্ধ শেষে হুলিয়ান সিমেওনের বদলি হিসেবে নামেন। মাঠে নেমেই ভক্তদের উল্লাসে ভাসিয়ে ম্যাচের ৭২ মিনিটে পেনাল্টি থেকে আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজের ১১৭তম গোলটি করেন এলএমটেন। এই গোলের মাধ্যমে আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে দীর্ঘ ৬৯ বছরের পুরনো এক রেকর্ড ভেঙে এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন তিনি।

আইসল্যান্ডের বিপক্ষে গোল করার দিনে মেসির বয়স ছিল ৩৮ বছর ১১ মাস ১৪ দিন, যা তাকে নিয়ে গেছে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের ইতিহাসের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ গোলদাতার মর্যাদায়। এর আগে ১৯৫৭ সালের ৭ জুলাই ব্রাজিলের বিপক্ষে গোল করে এই রেকর্ড নিজের দখলে রেখেছিলেন কিংবদন্তি অ্যাঞ্জেল ল্যাব্রুনা, তখন তার বয়স ছিল ৩৮ বছর ৯ মাস ৮ দিন।

ম্যাচ শেষে ক্যানসাস সিটির চার্টার ফ্লাইটের উদ্দেশে টিম বাসে ওঠার আগে বিশ্বকাপে নিজেদের লক্ষ্য নিয়ে কথা বলেন মেসি। সেখানে তিনি বলেন, ‘এই দলটা আজ যে অবস্থানে আছে, তার প্রতিটি ইঞ্চি তারা নিজেদের যোগ্যতায় অর্জন করেছে। আমরা সবসময় নিজেদের সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করি, যেমনটা আমি জাতীয় দলে আসার পর থেকে করে আসছি। কখনো ভাগ্য সহায় হয়, কখনো হয় না। তবে আমরা জয়ের যে অভ্যাস গড়ে তুলেছি, তার পুনরাবৃত্তি করার চেষ্টা করব। দিন শেষে এটা ফুটবল। কিন্তু এটুকু নিশ্চিত থাকুন, আমাদের হারানো যেকোনো প্রতিপক্ষের জন্যই অনেক কঠিন হবে। কারণ, আমরা ভীষণ লড়াকু এক দল।’

নিজের চোট ও রেকর্ড নিয়েও কথা বলেন মেসি। নতুন রেকর্ডের কথা জানতে পেরে এই মহাতারকা বলেন, ‘আমি এইমাত্র এটা দেখলাম, আগে জানতামই না। আমি সবসময় যেমনটা বলি, আমি রেকর্ডের কথা ভাবি না। ব্যক্তিগত কোনো অর্জন নয়, আমার মনোযোগ সবসময় দলের লক্ষ্যের দিকে থাকে।‘

এদিকে বিশ্বকাপের ঠিক এক সপ্তাহ আগে এমন দুর্দান্ত জয় এবং চোট কাটিয়ে ক্রিস্টিয়ান রোমেরো, নিকোলাস গঞ্জালেস, গনজালো মন্তিয়েল ও মেসির মতো তারকাদের মাঠে ফেরা কোচ লিওনেল স্কালোনির কপালে চিন্তার ভাঁজ অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে। তবে এই স্বস্তির মধ্যেও কোচের মাথায় ঘুরছে স্কোয়াড নিয়ে এক নতুন ভাবনা। চোটের কারণে রক্ষণভাগের অন্যতম ভরসা লিওনার্দো বালের্দি ছিটকে যাওয়ায় তার জায়গায় কাকে দলে নেওয়া হবে, তা নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি স্কালোনি। তিনি জানিয়েছেন, বালের্দির বিকল্প হিসেবে তার হাতে দুটি চমৎকার অপশন রয়েছে। এখনই তাড়াহুড়া না করে আগামী এক-দুই দিনের মধ্যে চোটাক্রান্ত লিয়ান্দ্রো পারেদেসের দলের ফেরার পরিস্থিতি এবং পুরো স্কোয়াডের সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত স্কোয়াডে বালের্দির বিকল্প নাম ঘোষণা করবেন তিনি। একই সঙ্গে দলে নিকোলাস পাজ, ভ্যালেন্টিন বার্কো কিংবা জুলিয়ানো সিমিওনের মতো তরুণদের উপস্থিতি এবং ওটামেন্ডি বা লিসান্দ্রো মার্টিনেজের মতো অভিজ্ঞদের নিয়ে দলের ট্যাকটিক্যাল পজিশন সাজাতে পেরে বেশ সন্তুষ্ট তিনি।

তবে দলের টানা জয়ে সন্তুষ্ট হলেও এখনই শিরোপা নিয়ে মাতামাতি করছেন না স্কালোনি  ভক্ত ও সমর্থকদের উদ্দেশে এক দুর্দান্ত অনুপ্রেরণামূলক বার্তা দিয়ে তিনি বলেন, ‘তারা শুধু চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কথা ভেবে মাঠে নামবেন না, বরং লক্ষ্য থাকবে দেশের মানুষকে এই দলের পারফরম্যান্সের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখা।’ পরে ফুটবলারদের শতভাগ উজাড় করে দেওয়ার মানসিকতার প্রশংসা করে স্কালোনি মনে করিয়ে দেন, ‘শুধু সেরা ফুটবল খেললেই সবসময় বিশ্বকাপ জেতা যায় না, এর পেছনে ভাগ্যের ছোঁয়া ও আরও অনেক নিয়ামক কাজ করে।’ তবে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স ও লড়াকু মনোভাব দেখে তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে, আলবিসেলেস্তেরা বিশ্বমঞ্চে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে।

ম্যাচ শেষে সতীর্থ রদ্রিগো ডি পলও দলের লক্ষ্য ও ভক্তদের উদ্দেশে বার্তা দিয়েছেন। বিগত দিনের কথা ভুলে এখন পুরো মনোযোগ বিশ্বকাপে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আগের সবকিছু এখন অতীত এবং বিশ্বকাপে তারা কেমন খেলবেন তা দিয়েই তাদের বিচার করা হবে।’ একদম প্রথম দিন থেকে টুর্নামেন্টের শেষ দিন পর্যন্ত লড়াই করার ঘোষণা দিয়ে ডি পল বলেন, ‘কাতার বিশ্বকাপের মতো এবারও যেন বুয়েনস আইরেসের ওবেলিস্কে লাখো আর্জেন্টাইন এক হয়ে বিজয় উল্লাস করার সুযোগ পায়।’

হন্ডুরাস এবং আইসল্যান্ডকে হারিয়ে টানা দুটি প্রস্তুতি ম্যাচেই দাপুটে জয় পেয়ে ফুরফুরে মেজাজেই বিশ্বজয়ের মিশনে যাচ্ছে স্কালোনির দল।